সুস্থ খাদ্যাভ্যাস ও থাইরয়েড স্বাস্থ্যের উপকারিতা
থাইরয়েড গ্রন্থি একটি ছোট প্রজাপতির মতো আকৃতির অঙ্গ, যা গলার সামনে অবস্থিত এবং এটি আমাদের শরীরের বিপাক, শক্তি উৎপাদন এবং হরমোনের ভারসাম্য রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে একাধিক শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। থাইরয়েডের মাত্রা আপনার শরীরে বেড়ে গেলে কিংবা কমে গেলে, অসুবিধা রয়েছে দুই ক্ষেত্রেই। হাইপোথাইরয়েডিজম (হরমোনের ঘাটতি), হাইপারথাইরয়েডিজম (হরমোনের অতিরিক্ততা), এবং অটোইমিউন রোগ যেমন হাশিমোটো থাইরয়েডাইটিস বা গ্রেভস ডিজিজ—সবই থাইরয়েডকে প্রভাবিত করে। হাইপোথাইরয়েডিজমের লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে: · স্বাভাবিকের চেয়ে ধীর হৃদস্পন্দন। · ক্লান্ত বোধ (ক্লান্তি)। · অব্যক্ত ওজন বৃদ্ধি। · ঠান্ডার প্রতি সংবেদনশীল বোধ। · শুষ্ক ত্বক এবং শুষ্ক ও রুক্ষ চুল। · বিষণ্ণ মেজাজ। · ভারী মাসিক (মেনোরেজিয়া)। হাইপারথাইরয়েডিজমের লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে: · স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত হৃদস্পন্দন (ট্যাকিকার্ডিয়া)। · ঘুমাতে অসুবিধা। · অব্যক্ত ওজন হ্রাস। · তাপের প্রতি সংবেদনশীল বোধ। · ত্বকে ঘাম বা ঘামে ভেজা ভাব। · উদ্বিগ্ন, খিটখিটে বা নার্ভাস বোধ। · অনিয়মিত মাসিক চক্র বা মাসিকের অভাব (অ্যামেনোরিয়া)
এইসব সমস্যার প্রকোপ কমাতে এবং থাইরয়েডকে কার্যকরভাবে রক্ষা করতে একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১। থাইরয়েড হরমোন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান থাইরয়েড হরমোন তৈরি ও কার্যকর রাখতে নির্দিষ্ট কিছু ভিটামিন ও খনিজ উপাদান অপরিহার্য। সঠিক খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে শরীর এইসব পুষ্টি উপাদান পেতে পারে—
- আয়োডিন : থাইরয়েড হরমোন (T3 ও T4) তৈরির জন্য আয়োডিন অপরিহার্য। আয়োডিনের ঘাটতি হলে গলগণ্ড বা হাইপোথাইরয়েডিজম দেখা দিতে পারে। আয়োডিন সমৃদ্ধ খাবারের মধ্যে রয়েছে আয়োডিনযুক্ত লবণ, সামুদ্রিক শৈবাল, সামুদ্রিক মাছ এবং দুগ্ধজাত পণ্য।
- সেলেনিয়াম : এটি T4 কে T3-তে রূপান্তর করতে সাহায্য করে এবং থাইরয়েডকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে রক্ষা করে। ব্রাজিল নাট, ডিম, সূর্যমুখীর বীজ ও সামুদ্রিক মাছ সেলেনিয়ামের ভালো উৎস।
- জিঙ্ক : জিঙ্ক থাইরয়েড হরমোনের বিপাক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে এবং ইমিউন সিস্টেমকে সজাগ রাখে। এটি গরুর মাংস, কুমড়োর বীজ, ডাল এবং ছোলায় পাওয়া যায়।
- লোহা: লোহার অভাব থাইরয়েড হরমোন তৈরিতে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। পালং শাক, লাল মাংস ও ডাল জাতীয় খাবার লোহার ভালো উৎস।
২। প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ ও ইমিউন সিস্টেমের ভারসাম্য বজায় রাখা হাশিমোটো থাইরয়েডাইটিসের মতো অটোইমিউন রোগে শরীরের ইমিউন সিস্টেম নিজেই থাইরয়েডকে আক্রমণ করে। এই ধরণের প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রদাহনাশক খাদ্য যেমন রঙিন ফলমূল, শাকসবজি, বাদাম, চিয়া বীজ, ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ মাছ, এবং হোল গ্রেইন (সম্পূর্ণ শস্য) অত্যন্ত উপকারী। অপরদিকে, প্রক্রিয়াজাত খাবার, ট্রান্স ফ্যাট, অতিরিক্ত চিনি এবং ফাস্ট ফুড—এগুলো প্রদাহ বাড়িয়ে দিতে পারে এবং থাইরয়েডের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। ৩। ওজন নিয়ন্ত্রণ ও বিপাকক্রিয়া সহায়তা থাইরয়েড হরমোন বিপাক নিয়ন্ত্রণ করে, ফলে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা ওজন বেড়ে যাওয়া বা হ্রাস পাওয়ার কারণ হতে পারে। সুস্থ খাদ্যাভ্যাস যেমন প্রোটিন, কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট (যেমন: ব্রাউন রাইস, ওটস), স্বাস্থ্যকর চর্বি এবং আঁশযুক্ত খাবার শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং রক্তে গ্লুকোজের ভারসাম্য বজায় রাখে। ৪। পরিপাকতন্ত্র (Gut) ও থাইরয়েডের আন্তঃসম্পর্ক গবেষণায় দেখা গেছে, অন্ত্রের স্বাস্থ্যের ওপর থাইরয়েডের কার্যকারিতা নির্ভর করে, বিশেষ করে অটোইমিউন থাইরয়েড রোগে। ভালো ব্যাকটেরিয়া বা প্রোবায়োটিক সমৃদ্ধ খাবার যেমন দই, কেফির, আচার, কিমচি অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য রক্ষা করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। ৫। কিছু নির্দিষ্ট খাবার এড়িয়ে চলা কিছু খাবার থাইরয়েডের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে হরমোন ভারসাম্যহীনতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে।
- গয়ট্রোজেন (Goitrogens): কাঁচা ব্রকলি, বাঁধাকপি, ফুলকপি ইত্যাদি সবজিতে গয়ট্রোজেন থাকে, যা থাইরয়েড হরমোন তৈরিতে বাধা দিতে পারে, বিশেষ করে যদি আয়োডিনের ঘাটতি থাকে। তবে রান্না করলে এদের ক্ষতিকর প্রভাব অনেকটাই কমে যায়।
- গ্লুটেন (Gluten): হাশিমোটো রোগীদের অনেকেই গ্লুটেন-সংবেদনশীল। গ্লুটেনমুক্ত খাদ্য তাদের জন্য উপকারী হতে পারে।
- সয়া (Soy): সয়াতে থাকা কিছু যৌগ থাইরয়েড হরমোনের শোষণ কমাতে পারে। সয়া গ্রহণের পরিমাণ সীমিত রাখা ভালো, বিশেষ করে যারা হাইপোথাইরয়েড রোগে ভুগছেন।
উপসংহার থাইরয়েড স্বাস্থ্য রক্ষায় একটি সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক পরিমাণে পুষ্টি গ্রহণ, প্রদাহনাশক খাবার খাওয়া, অন্ত্রের স্বাস্থ্য রক্ষা করা এবং কিছু ক্ষতিকর খাবার এড়িয়ে চলা—সবকিছুই থাইরয়েডের সুস্থতা নিশ্চিত করতে সহায়ক। যদিও শুধুমাত্র খাদ্য পরিবর্তনের মাধ্যমে থাইরয়েড রোগ পুরোপুরি নিরাময় সম্ভব নয়, তবে লক্ষণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। -সানজিদা শারমীন সিনিয়র ক্লিনিকাল ডায়েটিশয়ান ল্যাবএইড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, উত্তরা এক্স- ডায়েটিশিয়ান, ইউনাইটেড হাসপাতাল লিমিটেড।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0