পরী:সাহস ও ভালোবাসার আলো
ভালোবাসা, ধৈর্য,সাহস, এবং ক্ষমার শক্তি। চেহারা বা পূর্বধারণার কারণে কাউকে বিচার করা ভুল। একজন মায়ের ভালোবাসা ও শিক্ষা সন্তানকে শক্তিশালী ও স্বনির্ভর করে। ভুল বোঝা ও দূরত্ব থাকলেও ক্ষমা ও বোঝাপাড়া সম্পর্ককে মজবুত করে। সত্যিকারের শক্তি আসে সাহস , প্রেরণা এবং ভালোবাসা থেকে।
তিশা আর তন্ময় সেই ছোটবেলা থেকে একে অপরকে খুব ভালোবাসে। তন্ময় কলেজের প্রভাষক। আর তিশা প্রাইমারী শিক্ষিকা। দুজনে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে। কারণ তাঁদের এই সম্পর্কটা পরিবারের কেউ মেনে নেয়নি। তাদের সংসার ছিল সরল, আনন্দময় এবং ভালোবাসায় ভরা।
তিশা তন্ময়ের ওপর অভিমান করে থাকলে। তন্ময় নিজ হাতে তিশাকে খাইয়ে দিতেন। দুজন- দুজনকে খুব বিশ্বাস করতো। তাদের ভিতর ভালোবাসার বন্ধন ছিল খুব বেশি। তিশার রান্নার কাজে মাঝেমধ্যে তন্ময় সাহায্য করে দিতো। হাসি একটু দুষ্টুমি আর মিষ্টি অভিমানে ভরা ছিল তাদের সংসার।
দীর্ঘ তিন বছর পর তিশার কোল আলো করে এক নতুন অতিথি এলো। তাদের মিষ্টি মেয়ে পরী। তিশা তো মেয়ের মুখ দেখে ভীষণ খুশি। পরীর চেহারা ছিল বিদেশীদের মতো চোখ হাসি সবই ভিন্ন। তন্ময় তাঁর নিষ্পাপ মেয়ের মুখ দেখার সঙ্গে সঙ্গে মুখটা মলিন করে রাখে। তন্ময় তিশা কে বলে! আমি কি সত্যিই এই সন্তানের বাবা ? তিশা কথাটা শুনে অনেক কষ্ট পাই।
তন্ময় তিশা আর তাঁর নিষ্পাপ সন্তান কে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। তিশা একা হয়ে পড়ে , ছোট্ট পরীকে নিয়ে। সে জানত তাঁর একমাত্র শক্তি, তাঁর কারণ জীবন চালিয়ে যাওয়ার। তিশা হাল ছাড়েনি। পরীকে শুধু বড় করেননি, বরং শেখালো স্বাধীনতা, সাহস ও আত্মবিশ্বাস। প্রতিদিন গল্প, শিক্ষা, খেলা, প্রেরণামূলক কথায় তিশা পরীর মন তৈরি করলেন নিজের পথে চলার জন্য।
বছর কেটে গেল। পরী বড় হয়ে নামকরা ডাক্তার হলো। তাঁর সফলতা শুধু তাঁর নয়, তিশার নিরলস ত্যাগের ও ফল। কিন্তু তন্ময়ের মন আজ ও ঠান্ডা ছিল। সে কখনো পুরোপুরি মেয়েটিকে মেনে নিতে পারেনি। একদিন দূর্ঘটনা ঘটে।তন্ময় একটি দূর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন। চিকিৎসার জন্য জরুরি রক্তের প্রয়োজন। পরী নিজেই রক্ত দান করতে এগিয়ে আসে।সেই মুহূর্তে তন্ময় বুঝতে পারেন - পরী শুধুই তাঁর মেয়ে, চেহারা বা অন্যান্য কিছু নয়।
পরী তাঁর অসুস্থ বাবার পাশে অনেকক্ষণ বসে রইল। তন্ময় বেডে শুয়ে অঝোরে চোখের জল ফেলছে। পরী তাঁর বাবার সেবা করছে। তন্ময় পরীকে বলল, আমাকে তুই ক্ষমা করিস!আমি তোর চেহারার জন্য কখনো তোকে মেনে নিতে পারিনি।তোর মাকে ও অনেক কষ্ট দিয়েছি। কিন্তু জানিস তোদের কে তাড়িয়ে দিয়ে আমি সুখী হয়নি।
আমি এক মাসের ভিতর আমার চাকরিটা হারালাম। চাকরির জন্য বিভিন্ন জায়গায় দরখাস্ত দিয়েছি। কোথাও চাকরি পাইনি।কখনো কখনো পেটের ক্ষুধায় টিউবওয়েলর জল খেয়েছি। আমি আমার পাপের শাস্তি পেয়েছি। পরী তাঁর বাবার কথা শুনে হালকা হেসে বলে, বাবা তুমি হয়তো আমাকে ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করেছো। আমার থেকে দূরে থেকেছো। কিন্তু আমি আজ একজন ডাক্তার। আমার কাজ রোগীদের সেবা করা।
তুমি আমাকে অবহেলা করতে পারো। কিন্তু আমি পারিনা বাবা।একটা সন্তান কখনো তাঁর বাবা - মায়ের বিপদ দেখলে দূরে থাকতে পারেনা। তুমি আমাকে মেনে না নিলেও আমি সন্তান হয়ে তোমার বিপদে পাশে থাকতে পেরেছি। এটাই আমার কাছে অনেক বড় প্রাপ্তি। তন্ময় পরীকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদল। পরী তাঁর বাবাকে মায়ের কাছে নিয়ে যায়। তিশার কাছে ক্ষমা চাই।
তিশা তন্ময় কে বলে তুমি যে তোমার ভুলটা বুঝতে পেয়েছো তাতেই আমি খুশি। তাদের ঘরে আনন্দ ফিরে আসে।তিশা ,পরী তন্ময় একসাথে আবার থাকতে লাগল।
What's Your Reaction?
Like
3
Dislike
0
Love
3
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
3