মায়ের অসুখ থেকে জন্ম এক চিকিৎসকের

জুলাই 18, 2025 - 17:32
নভেম্বর 16, 2025 - 14:25
 0  5
মায়ের অসুখ থেকে জন্ম এক চিকিৎসকের

খলিশাকুন্ডির বুকে গড়ে ওঠা ছোট্ট এক পাড়া বড় বাড়িয়া, পুরাতন হাটপাড়া। সেই গ্রামের পরিশ্রমী বিশ্বাস পরিবার এর কর্তা ছহির‌উদ্দিন বিশ্বাস ছিলেন চাটাই ব্যবসায়ী। সৎ ও পরিশ্রমী, নিঃস্বার্থ এক জীবন যাপন করতেন তিনি। স্ত্রী সবুরন নেছা ছিলেন ধর্মভীরু, নিরহংকার গ্রামের সবার শ্রদ্ধার পাত্রী। এই পরিবারেই জন্ম নেন আনিছুর রহমান, ছয় ভাই-বোনের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। শৈশব কেটেছে গরু-ছাগল চরানো, পুরোনো জামা কাটাকুটি করে খেলনা বানাতো। কিন্তু সেই সরল জীবনের ছায়ায় ছিল অভাবের কঠিন বাস্তবতা। এক শুভাকাঙ্ক্ষীর কথায় তাঁর জীবন নিল এক মোড়। আপনার ছেলে দর্জির কাজ শিখলে ভালো পারবে। প্রথমে এক আত্মীয়র দোকানে হাতেখড়ি, পরে কাজ শুরু করেন খ্যাতিমান দর্জি আতিয়ার রহমান-এর কাছে। তিনি আনিছুরকে ভাইয়ের মতো স্নেহ করতেন। অল্পদিনেই তাঁর তৈরি পোশাক হয়ে ওঠে সবার পছন্দ। এসএসসি পাস করে নিজের একটি সেলাই মেশিনে ছোট্ট দোকান খুলে ফেলেন। মানুষ আসতো শুধু জামা সেলাই নয়, তাঁর হাসিমাখা মুখ আর শ্রদ্ধেয় ব্যবহার উপভোগ করতে। ঠিক তখনই এক ঘটনার পর জীবনের পথ পাল্টে যায়। ধান শুকাতে গিয়ে মারাত্মকভাবে পড়ে যান মা সবুরন নেছা। নানা জায়গায় চিকিৎসা করেও কোনো উন্নতি হয়নি। এক আত্মীয়ের কথায় যান ঝিনাইদহের হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক ডা. সালাউদ্দিন-এর কাছে। তিনি লক্ষণ শুনেই ওষুধ দিলেন। বিস্ময়করভাবে কিছুদিনের মধ্যেই সুস্থ হয়ে ওঠেন মা। এই ঘটনার পর আনিছুরের মনে জন্ম নেয় এক অটুট সংকল্প আমি হোমিও ডাক্তার হবো। আমি চাই অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে। গ্রামের ডাক্তার হাসিবুলের উৎসাহে ভর্তি হন গাংনীর L.H.M.P কোর্সে, পরিচালনায় ছিলেন ডা. মাহফুজুর রহমান সেন্টু। শুক্রবার ক্লাস, সপ্তাহের বাকি দিন দোকান, আর পাশে ছিল স্ত্রী শিরিনা আক্তারের অনুপ্রেরণা। কোর্স শেষ করে খুলে ফেলেন ছোট্ট এক চেম্বার। পুরনো ক্রেতারাই নতুন রোগী হয়ে ফিরে আসেন। বন্ধ্যাত্ব, কিডনির পাথর, টিউমার অনেক রোগেই সাফল্য পান তিনি। পরে D.H.M.S কোর্সে ভর্তি হন কুষ্টিয়া থেকে, যদিও শারীরিক অসুস্থতায় শেষ করা সম্ভব হয়নি। বাবার বিদায় ছেলের হাত ধরে: একদিন হঠাৎ মাঠে কাজ করার সময় বুকে ব্যথা অনুভব করেন বাবা ছহির‌উদ্দিন বিশ্বাস। আনিছুর নিজেই প্রেসার মেপে ওষুধ দেন। দুপুর পর্যন্ত স্বাভাবিক থাকলেও বিকেলে অবস্থার অবনতি হয়। স্ত্রী শিরিনা যখন নিজ হাতে সুজি খাওয়াতে যান, ছহির‌উদ্দিন বলেন, আমি নিজেই খেতে চাই। সুজির বাটি হাতে নিয়েই হঠাৎ ছেলের হাতের উপর ঢলে পড়েন। ১৫ অক্টোবর ২০১৫ ছেলের হাত ধরেই চিরবিদায় নেন বাবা। এই মৃত্যু আনিছুরের হৃদয়ে এক শোক নয়, অসহায়তা ও ব্যর্থতার ঘোর কষ্ট হয়ে রয়ে যায়। তিনি নিজেই চিকিৎসক, তবুও বাবাকে বাঁচাতে পারলেন না।এই অনুশোচনায় ক্ষত বয়ে বেড়ান আজো। মায়ের অসুস্থতা এবং নীরব ভালোবাসা: এর কিছুদিন পর স্ট্রোক করেন মা। এক বছর ধরে বিছানায়। রাতে ঘুমাতেন না, সবাই জেগে থাকত পাহারায়। প্রতিদিন খাওয়ার সময় আনিছুর জিজ্ঞেস করতেন: “মা, খেয়েছো? মা শুধু হেসে বলতেন, “হ্যাঁ, খেয়েছি। এটাই ছিল মায়ের প্রতি ছেলের নিঃশব্দ ভালোবাসা। এসময়ে একমাত্র নাতনি দিশা হয়ে ওঠে দাদির ছায়া সেবিকা। নিজ হাতে খাওয়ানো, গোসল করানো, এমনকি পায়খানায় নিয়ে যাওয়া সবই করত সে নির্ভরতায়। একদিন দাদী তাকে বললেন, আমি মারা গেলে কাকে দাদী বলে ডাকবি? দিশা শুধু চুপচাপ মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল নীরব ভালোবাসায়। মা সবুরন নেছা ডিম বা গরুর মাংস ছুঁতেন না, খেতেন কবুতরের মাংস। কিন্তু অসুস্থতার সময় সব নিয়ম ভুলে যান। ৭ জুলাই ২০২১, প্রবল বর্ষণের রাতে একেবারে নিস্তেজ হয়ে পড়েন মা। প্রেসার এত লো ছিল যে শরীরে যম ফোস্কার দাগ পড়ে যায়। সেদিনই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। আনিছুর রহমান এতটাই অসুস্থ ছিলেন, নিজের মায়ের দাফনেও মাটি দিতে যেতে পারেননি। মা বলতেন: “আমি মারা গেলে আমার ছেলে পাগল হয়ে যাবে। কাকে মা বলে ডাকবে? সেই কথাই যেন শেষ পর্যন্ত সত্যি হয়ে যায়। মায়ের শেষ ইচ্ছা ছিল তার পাঁচ ছেলের বাড়ি দেখবে। মায়ের কষ্ট ছিল সেই বড় ছেলের কথায়। তিনি চোখের পানি নিরবে ফেলতেন, তার সন্তানের মুখে এমন কথা শুনে মন ভেঙে যেত। ছয় ছেলের মধ্যে পঞ্চম ছেলে মাকে ভালোবাসতেন। মায়ের জন্য পছন্দের খাবার—পাউরুটি, কলা, মিষ্টি নিয়ে আসতেন। বাড়িতে ভালো রান্না হলে নিয়ে আসতেন। তাঁর স্ত্রী রওশনা বেগম ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু মনের মানুষ, শাশুড়ির যত্নে নিঃস্বার্থ।কিন্তু একটা ছেলেও রাজি হয়নি। বরং বড় ছেলে বলেছেন মা তোমাকে নিয়ে গেলে আমার ছেলে-মেয়েরা কেউ ভাত খেতে পারবেনা। মা সবুরন নেছা বড়ো ছেলের কথাই খুব কষ্ট পেয়েছিলেন নিরবে চোখের পানি ফেলেছেন। নিজের সন্তানের মুখে এমন কথাই তো মনটা ভেঙে যায়। ছয় ছেলের ভিতর ৫ম ছেলে ও ছোট ছেলে মাকে ভালোবাসতেন। মায়ের জন্য পছন্দের খাবার পাউরুটি কলা মিষ্টি নিয়ে আসতেন। বাড়িতে ভালো রান্না হলে নিয়ে আসতেন। শেষ সময়ে পাশে ছিল শুধু ছোট ছেলে আনিছুর, পুত্রবধূ শিরিনা, আর নাতনি দিশা। যাদের জন্য জীবনভর ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তারা কেউ ছুঁয়েও দেখেনি কফিন। আনিছুর রহমান আজও বলেন । “ আমি একটা পাকা ছাদের ঘর বানিয়েছি, অথচ সেই ঘরে আমার মা থাকতে পারেনি। শুধু সেই ঘরের ডাইনিং টেবিলে তার মরদেহ ধোয়া হয়েছিল।মৃত্যুর কিছুদিন আগে মা বলেছিলেন, “আমি মারা গেলে আমার লাশটা ধোয়াবে আমার দিশা, আমার দুই মেয়ে । দিশার মা এবং দিশা। ঠিক তেমনটাই হয়েছিল।

What's Your Reaction?

Like Like 4
Dislike Dislike 0
Love Love 4
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 4
@zerin609 Zerin Jahan Disha Disha