বিয়ে কোন প্রাকৃতিক সত্য নয়, সমাজের তৈরি এক শক্তিশালী ক্ষমতার কাঠামো
মানুষ যখন বিবাহের কথা ভাবে তখন বেশিরভাগ সময়ই মনে পড়ে রোমান্টিক দৃশ্য। দুই মানুষের ভালোবাসা। পরস্পরের প্রতি প্রতিশ্রুতি। পরিবার গঠনের স্বপ্ন। কিন্তু সমাজবিজ্ঞান এবং নৃবিজ্ঞানের আলোচনায় বিয়ে একেবারেই অন্য রূপে হাজির হয়। সেখানে বিয়ে কোন স্বভাবজাত মানবিক প্রয়োজন নয়। কোন ধর্মীয় বিধান থেকে জন্ম নেওয়া চিরন্তন নিয়মও নয়। বরং বিয়ে একটি নির্মিত প্রতিষ্ঠান। সমাজের অর্থনীতি। ক্ষমতার সম্পর্ক। উত্তরাধিকার নির্ধারণ। সম্পত্তির বণ্টন। এসব কাঠামোর ভেতরে গড়ে ওঠা একটি গভীর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা।
মানুষ যখন বিবাহের কথা ভাবে তখন বেশিরভাগ সময়ই মনে পড়ে রোমান্টিক দৃশ্য। দুই মানুষের ভালোবাসা। পরস্পরের প্রতি প্রতিশ্রুতি। পরিবার গঠনের স্বপ্ন। কিন্তু সমাজবিজ্ঞান এবং নৃবিজ্ঞানের আলোচনায় বিয়ে একেবারেই অন্য রূপে হাজির হয়। সেখানে বিয়ে কোন স্বভাবজাত মানবিক প্রয়োজন নয়। কোন ধর্মীয় বিধান থেকে জন্ম নেওয়া চিরন্তন নিয়মও নয়। বরং বিয়ে একটি নির্মিত প্রতিষ্ঠান। সমাজের অর্থনীতি। ক্ষমতার সম্পর্ক। উত্তরাধিকার নির্ধারণ। সম্পত্তির বণ্টন। এসব কাঠামোর ভেতরে গড়ে ওঠা একটি গভীর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা।
বিয়ের এই নির্মিত চরিত্র বুঝতে গেলে প্রথমেই চোখ পড়ে ইতিহাসের দিকে। নানা সভ্যতায় পরিবারের কাঠামো কিভাবে বদলেছে তা বোঝা যায়। প্রাগৈতিহাসিক মানবসমাজে পরিবার ছিল বেশ ঢিলেঢালা। যৌথ জীবনযাপনে সন্তানকে পুরো গোষ্ঠীই লালন করত। উত্তরাধিকার বা স্থায়ী সম্পত্তির কোন কঠোর ধারণা ছিল না। ফলে কার সন্তান কাকে যাবে। কে কার বৈধ উত্তরাধিকারী হবে। এসব প্রশ্ন সমাজের কেন্দ্রে ছিল না। এই সময়ের পরিবার বেশিরভাগ anthropologist এর মতে ছিল মাতৃতান্ত্রিক। কারণ সন্তানের বংশনির্ণয় করা সম্ভব ছিল মায়ের সূত্রে। পিতার পরিচয় সামাজিকভাবে ততটা দৃঢ় ছিল না।
ব্যক্তিগত সম্পত্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর দৃশ্যপট বদলে যায়। মানুষ জমি। গবাদি পশু। কৃষিকাজ। উৎপাদন। এসবকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেয়। সম্পত্তির মালিকানা এবং ক্ষমতার বিস্তার তৈরি করে নতুন লড়াই। এঙ্গেলস তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থে ব্যাখ্যা করেছেন এই পরিবর্তন কেন ইতিহাসে এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাঁর মতে ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে পুরুষ নিজ সন্তানকে চিহ্নিত করা জরুরি মনে করে। কারণ সম্পত্তি উত্তরাধিকার সূত্রে সন্তানের কাছেই যাবে। আর সেই সন্তান যেন তারই জৈবিক সন্তান হয় তা নিশ্চিত করতে দরকার পড়েছিল এমন একটি প্রতিষ্ঠান যেখানে নারীকে যৌনভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। এখান থেকেই জন্ম নেয় পিতৃতান্ত্রিক পরিবার এবং বিবাহ ব্যবস্থা। এই বিশ্লেষণ আমাদের সামনে বিয়ের একেবারে ভিন্ন ছবি তুলে ধরে। সেখানে ভালোবাসা বা ব্যক্তিগত পছন্দ নয়। অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং ক্ষমতার গঠনই বিয়েকে সংজ্ঞায়িত করেছে।
এঙ্গেলসের বক্তব্য শুধুই তাত্ত্বিক নয়। প্রাচীন সভ্যতার আইনি দলিলগুলোর দিকে তাকালেই দেখা যায় বিয়েকে কেন্দ্র করে কঠোর বিধিনিষেধ ছিল। বিভিন্ন অঞ্চলে নারীকে সম্পত্তির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। নারীকে বিয়ে দিয়ে পরিবারগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জোট গড়ে ওঠত। পুরুষের উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতে নারীর চলাফেরা। যৌন স্বাধীনতা। এমনকি খাদ্যাভ্যাস পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করা হতো। ফলে বিবাহ এক ধরনের সামাজিক চুক্তিতে পরিণত হয়। যেখানে দুই ব্যক্তির চেয়ে বড় ছিল পরিবারের স্বার্থ।
ফরাসি নৃতাত্ত্বিক ক্লডে লেভি স্ট্রস এই দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও গভীরভাবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর বিশ্লেষণ বলে বিয়ে হল বিনিময়। কিন্তু এই বিনিময়ের বস্তু অনেক সময় নারী নিজেই। তিনি দেখান। অনেক সমাজে বিয়ে কেবল একজন নারীর পছন্দ। আত্মনির্ভরতা বা ইচ্ছার ভিত্তিতে গড়ে ওঠেনি। বরং দুটি পরিবারের মধ্যে জোট গঠনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এক গোত্র থেকে আরেক গোত্রে নারীকে আদানপ্রদান করা মানে যোগাযোগ বাড়া। সম্পর্ক স্থিতিশীল হওয়া। ক্ষমতা বণ্টন সহজ হওয়া। এই বিনিময় দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক কাঠামোকে স্থিতিশীল করেছে। ফলে নারী শুধু ব্যক্তি নয়। তিনি ছিলেন একটি সামাজিক সম্পদ। আর পুরুষের ক্ষেত্রেও বিয়ে ছিল সামাজিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যম।
এই বিনিময় তত্ত্ব আজকের আধুনিক সমাজে একটু অস্বস্তিকর মনে হতে পারে। কিন্তু ফলাফল এখনও বহু স্থানে স্পষ্টভাবে দেখা যায়। অনেক পরিবার এখনও কন্যাদানকে গর্বের বিষয় মনে করে। অনেক সমাজে বিয়ের দাওয়াত বা দেন মোহর বা যৌতুক। এগুলো সবই মূলত অর্থনৈতিক লেনদেনের পরোক্ষ প্রকাশ। লেভি স্ট্রসের উপলব্ধি তাই আজও সমাজ বিশ্লেষণে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
বিয়েকে শুধু প্রতীকী কাঠামো মনে করলে ভুল হবে। আধুনিক রাষ্ট্রের কাঠামোতেও বিয়ের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ভূমিকা আছে। মিশেল ফুকো যৌনতা এবং ক্ষমতার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন আধুনিক রাষ্ট্র বিয়ে এবং পরিবারকে ব্যবহার করেছে জনগোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে। এটি শুধু দুই মানুষের সম্পর্ক নয়। এটি প্রজনন নিয়ন্ত্রণের কৌশল। রাষ্ট্র তার জনসংখ্যা। শ্রমবাজার। নাগরিক কাঠামো। এসব পরিচালনার জন্য পরিবারকে কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে তৈরি করেছে। বিবাহ আইনের মাধ্যমে নাগরিকের যৌনতা। সন্তান জন্ম। পরিবার গঠন। সম্পত্তি বণ্টন। এসব বিষয়ের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা সম্ভব হয়েছে। ফলে আধুনিক রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে বিয়ে এক ধরনের সামাজিক শৃঙ্খলা। যা ছাড়া রাষ্ট্রের ক্ষমতার প্রয়োগ শিথিল হয়ে যেত।
এই বিশ্লেষণগুলো একসঙ্গে আমাদের সামনে যে চিত্র তুলে ধরে তা হল বিয়ে একটি পরিবর্তনশীল প্রতিষ্ঠান। কোন চিরন্তন সত্য নয়। কোন স্বাভাবিক মানবিক প্রয়োজন নয়। বরং ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতা। অর্থনীতি এবং সামাজিক কাঠামোর ভিত্তিতে বিবাহের রূপ বদলেছে। প্রাচীন কৃষিভিত্তিক সমাজে বিয়ে ছিল সম্পত্তি রক্ষার উপায়। সামন্ততান্ত্রিক যুগে ছিল রাজনৈতিক জোটের মাধ্যম। শিল্পবিপ্লবের পর পুরো ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে পারিবারিক শ্রমবণ্টন। যেখানে পুরুষ আয় উপার্জন করবে। নারী ঘর সামলাবে। আর আজকের পুঁজিবাদী সমাজে বিয়ে নতুন এক বাজার তৈরি করেছে। ওয়েডিং ইন্ডাস্ট্রি। ফ্যাশন। ডেকোরেশন। রেস্টুরেন্ট। হোটেল। ফটোগ্রাফি। এসব ক্ষেত্রে বিপুল বাণিজ্যিক প্রবৃদ্ধি তৈরি করেছে। ফলে বিয়ে আবারও পণ্যায়িত কাঠামো হয়ে উঠেছে।
একই সঙ্গে সমাজের মূল্যবোধও বদলেছে। আধুনিক মানুষ ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। নারীশিক্ষা। নারীর অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা। সামাজিক সচেতনতা। এগুলো বিয়েকে নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করেছে। অনেক দেশে একক মাতৃত্ব। লিভ ইন সম্পর্ক। সমলিঙ্গ বিবাহ। এসব এখন আইনি স্বীকৃতি পাচ্ছে। ফলে বিয়ের প্রচলিত ধারণা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। পরিবার এখন আগের মতো স্থায়ী প্রতিষ্ঠান নয়। বরং সম্পর্কের বহুমাত্রিক কাঠামো সমাজে দিন দিন বৈচিত্র্য পাচ্ছে।
এত পরিবর্তনের পরও বিয়ের কিছু উপাদান এখনও সমাজকে শক্তভাবে প্রভাবিত করে। পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা এখনও দৃশ্যমান। নারীকে এখনও অনেক জায়গায় সম্পত্তি বা সম্মানের প্রতীক মনে করা হয়। যৌতুক। গার্হস্থ্য নির্যাতন। বাল্যবিবাহ। এসব সমস্যা এখনও সামাজিক বাস্তবতা। তাই বিয়ে যতই আধুনিক হোক। এর ভেতরে পুরনো ক্ষমতার সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যমান।
এই বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল। ভবিষ্যতে বিয়ে কি রূপ নেবে। সমাজ কি এই প্রতিষ্ঠানকে আগের মতোই গুরুত্ব দেবে। নাকি বিয়ের ধারণা ধীরে ধীরে ভেঙে আরও নমনীয় সম্পর্কের কাঠামো তৈরি করবে। বিশ্বের বহু উন্নত দেশে বিয়ে কমে যাচ্ছে। মানুষ একা থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে বেশি মূল্য দিচ্ছে। পরিবার পরিকল্পনা বদলাচ্ছে। কর্মক্ষেত্রের চাপ বাড়ছে। ফলে বিয়ে অনেকের কাছে প্রয়োজনীয়তা হারিয়েছে। আবার অনেকে বিয়েকে নতুন অর্থে পুনঃসংজ্ঞায়িত করছে। সমমানের অংশীদারিত্ব। পারস্পরিক স্বাধীনতা। আর্থিক ভাগাভাগি। এসব মূল্যবোধ বিয়েকে নতুন রূপ দিচ্ছে।
তবে সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিয়ে এখনও মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে বিয়ে শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়। এটি সামাজিক দায়িত্ব। পারিবারিক মর্যাদা। সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। তাই এই অঞ্চলে বিয়ের কাঠামোকে পরিবর্তন করতে চাইলে প্রয়োজন শিক্ষা এবং সামাজিক সচেতনতার বিস্তার। বিয়ের ভেতরের পুরনো ক্ষমতার সম্পর্ক ভাঙতে হলে নারীকে স্বনির্ভর হতে হবে। পরিবারকে নারী এবং পুরুষের সমান ভূমিকা স্বীকৃতি দিতে হবে।
বিয়ের ভবিষ্যৎ তাই কোন একটি সরল উত্তরে সীমাবদ্ধ নয়। এটি সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলাবে। অর্থনীতি। প্রযুক্তি। রাজনীতি। সামাজিক মূল্যবোধ। এসবের সঙ্গে বিবাহের রূপও বদলাবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট। বিয়ে কখনোই চিরন্তন সত্য ছিল না। এটি সমাজ বানিয়েছে। সমাজই আবার নতুন করে গড়ে তুলবে।
বিয়েকে তাই শুধু একটি রোমান্টিক সম্পর্ক বা ধর্মীয় বিধান হিসেবে দেখলে পুরো সত্য ধরা পড়ে না। এটি একটি ইতিহাস। একটি ক্ষমতার সম্পর্ক। একটি অর্থনৈতিক কাঠামো। আর সেই সঙ্গে মানুষের আবেগ। স্বপ্ন। আকাঙ্ক্ষারও প্রকাশ। এই দুই ছবির সমন্বয়েই বিয়ে নামের প্রতিষ্ঠান আজও টিকে আছে।
What's Your Reaction?
Like
1
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
1