মনুষ্যত্ব বনাম মেশিনত্ব: বিবর্তনের এক নতুন যুদ্ধ।

প্রযুক্তি কি আমাদের অজান্তেই যন্ত্র বানিয়ে দিচ্ছে? 'মনুষ্যত্ব বনাম মেশিনত্ব' প্রবন্ধে আলী এইচ শাওন তুলে ধরেছেন যান্ত্রিক সভ্যতায় মানুষের আবেগহীন হয়ে পড়ার বাস্তব চিত্র। কেন আমাদের আবার মানুষ হওয়া জরুরি, তা জানতে পড়ুন।

জানুয়ারী 22, 2026 - 16:37
 0  6
মনুষ্যত্ব বনাম মেশিনত্ব: বিবর্তনের এক নতুন যুদ্ধ।
প্রযুক্তি ও জীবন

সকালে ঘুম ভাঙে মোবাইলের অ্যালার্মে। চোখ খোলার আগেই হাত চলে যায় মোবাইলের কাছে। কয়টা নোটিফিকেশন এসেছে, কে কী লিখেছে, কোথায় কী ঘটেছে। বিছানা ছাড়ার আগেই ঘুমঘুম চোখে মাথার ভেতর শুরু হয়ে যায় একপ্রকার দৌড়ঝাপ। অফিসে যেতে হবে, সময় নেই, দেরি হয়ে যাচ্ছে। 

বাসে উঠলে ভিড়। কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছে না। সবার চোখ নিজের ফোনের স্ক্রীনে। পাশে হয়তো একজন বয়স্ক মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। তার চোখে মুখে ক্লান্তি। আমরা দেখি। আবার দেখি না। কারণ দেখলে উঠতে হতে পারে। এরকম এড়িয়ে যাওয়াটাই আমাদের জন্য স্বাভাবিক হয়ে গেছে।

কিন্তু মানুষ তো এমন হওয়ার কথা ছিল না। মানুষ মানে শুধু কাজ করা নয়। মানুষ মানে অনুভব করা। অন্যের কষ্ট বুঝতে পারা। ভুল করা। থেমে যাওয়া। ঘুরে  দাঁড়ানো। কিন্তু আমরা এমনই এক জীবনে ঢুকে পড়েছি, যেখানে একটুখানি থেমে যাওয়া মানে পিছিয়ে পড়া। অনুভূতি প্রকাশ করা মানে দুর্বল হওয়া। নির্দয় হওয়াকে আমরা বলি প্রোফেশনালিজম। অনুভূতিহীনতাকে বলি স্ট্রেন্থ। কিন্তু আমরা কেউই লক্ষ্য করছি না, যখন আমরা ‘মেশিন লার্নিং’ কথাটি বার বার বলছি, মুদ্রার উল্টো পিঠে তখন ‘হিউম্যান রোবোটিং’ বা মানুষের যন্ত্র হওয়ার প্রক্রিয়াটিও নীরবে শুরু হয়ে গেছে।

আগে কেউ অ্যাক্সিডেন্ট করলে বা অসুস্থ হয়ে পড়লে মানুষ কাজ ফেলে ছুটে আসতো। সাহায্য করতো। এখন দিন বদলে গেছে। যুগ পালটে গেছে। এখনও হয়তো অনেকেই ছুটে আসে। কিন্তু আগের মতো সাহায্য করে না। অনেকেই আগে মোবাইল বের করে। সাহায্য করার পরিবর্তে শুরু হয়ে যায় ছবি তোলা, ভিডিও করা। পরে হয়তো আকর্ষণীয় ক্যাপশনও লেখা হয়। মানুষের জীবনটাই তখন একটা কনটেন্ট হয়ে যায়। রিচ বাড়ে, লাইক বাড়ে, ভাইরাল হয়। কিন্তু বিপদগ্রস্থ মানুষটাই কেবল পড়ে থাকে।

প্রশ্ন হলো, এটাই কি স্বাভাবিক হওয়ার কথা ছিল?

আমরা বলি, সময় খারাপ। সমাজ খারাপ। কিন্তু সমাজ তো আমরা নিজেরাই। আমরা যখন কেবলই টার্গেট বুঝি, ফলাফল বুঝি, তখন মানুষের জায়গায় জায়গায় একটা ফাঁক তৈরি হয়। সেই ফাঁকেই মনুষ্যত্ব হারিয়ে যায়।

কথা ছিলো, প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করে দেবে। সময় বাঁচাবে। যেন বেঁচে যাওয়া সময়টা আমরা পরিবারকে দিতে পারি। মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, পরিবারের সঙ্গে বসেও আমরা ফোন দেখি। বন্ধুর পাশে বসেও মন থাকে অন্যখানে। কথা বলি কম, স্ক্রল করি বেশি। যেটুকু সময় বাঁচাই, সেটুকু আবার স্ক্রীনকেই বিলিয়ে দেই। আমরা সময় বাঁচাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু মনুষ্যত্ব হারাচ্ছি।

এই অবস্থায় প্রশ্নটা আর দর্শনের থাকে না। এটা হয়ে যায় বাস্তব জীবনের প্রশ্ন। আমরা কী ধরনের মানুষ হতে চাই? যে মানুষ শুধুই কাজ করতে জানে? নাকি যে মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াতে জানে?

পৃথিবীর ইতিহাসে প্রতিটা আবিষ্কারেরই ভালো আর মন্দ দুই দিক থাকে। আগুন মানুষকে রান্না শিখিয়েছে, আবার অসতর্কতায় ঘরও পুড়িয়েছে। চাকা আমাদের গতি দিয়েছে, আবার সেই চাকাই বহু মানুষের প্রাণও কেড়ে নিয়েছে। তাই যন্ত্রকে শেখানো দোষের কিছু নয়। সমস্যা হয় তখনই, যখন যন্ত্রের মতো হওয়াটাকে আমরা সাফল্য ভাবতে শুরু করি।

উন্নয়ন দরকার। প্রযুক্তি দরকার। গতিও দরকার। কিন্তু সবার আগে মানুষটাকে বাঁচিয়ে রাখা বেশী দরকার। নয়তো বড় বড় ভবন হবে। দ্রুতগতির ইন্টারনেট হবে। স্মার্ট সিটি হবে। তবে মানুষ যদি ভেতরে ভেতরে একা হয়ে যায়, সেই উন্নয়ন টিকবে না।

মনুষ্যত্ব হলো মানুষের সেই মানবিক ও নৈতিক গুণাবলি যা তাকে আর দশটা প্রাণী থেকে আলাদা করেছে। যেমন- দয়া, মায়া, মমতা, পরোপকার এবং অন্যের দুঃখকে নিজের হৃদয়ে অনুভব করার ক্ষমতা। মানুষের সৌন্দর্য তার ভুল করার ক্ষমতায়, ক্লান্তিতে এবং ক্ষমা করার মহত্ত্বের মাঝে। অপরদিকে যন্ত্রের কোনো ক্লান্তি নেই। সে থামে না। প্রশ্ন করে না। তাকে যা বলা হয়, সেটাই করে। বিরামহীনভাবে। নির্ভুলভাবে। এই যান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলোকেই আমরা মেশিনত্ব বলতে পারি। একসময় এই গুণগুলো আমাদের ভালো লেগেছিলো। এখনও লাগে। আমরা বলেছি, মানুষকেও এমন হতে হবে। দ্রুত, নির্ভুল, আবেগহীন। ধীরে ধীরে আমরা নিজেরাও সেই ছাঁচে ঢুকে পড়েছি। একবারও ভাবিনি, যন্ত্র কেবল তাই করতে পারে যা তাকে শেখানো হয়; কিন্তু মানুষ এমন কিছু করতে পারে যা আগে কেউ কখনও কল্পনা করেনি।

মানুষকে নিয়েই সমাজ হয়। সভ্যতা হয়। ইতিহাস লেখা হয় মানুষের সিদ্ধান্ত, ভুল আর সাহসে। কোনো যন্ত্র কখনো সমাজ গড়তে পারে না। কোনো কোড কখনো সভ্যতার আত্মা হতে পারে না। সমাজ ও সভ্যতা বেঁচে থাকে মানুষের দয়া, মায়া, ভুল আর ভালোবাসার কারণে। কোনো সার্কিট, কোনো কোড, কোনো অ্যালগরিদম সেটা দিতে পারে না। প্রযুক্তি হয়তো আমাদের আকাশ ছোঁয়ার সিঁড়ি বানিয়ে দিতে পারে, কিন্তু সেই নীল আকাশ ছুঁয়ে রোমাঞ্চ অনুভব করার মতো হৃদয় কেবল মানুষেরই আছে। তাই দিনশেষে জয়টা যেন নির্জীব যন্ত্রের না হয়ে রক্ত-মাংসে গড়া মানুষেরই হয়। 

কারন, মানুষের জন্ম যন্ত্র হওয়ার জন্য নয়। বরং যন্ত্রের জন্ম হয়েছে মানুষের সুবিধার জন্য। এই সহজ কথাটা আমরা যত ভুলে যাব, ততই আমরা নিজেরা যন্ত্র হয়ে যাব। 

প্রশ্নটা এখন খুব সহজ। আমরা কি যন্ত্রকে শেখাচ্ছি, নাকি নিজেরাই যন্ত্র হয়ে যাচ্ছি? এই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গেলে একদিন হয়তো দেখবো, চারপাশে সব ঠিকঠাক আছে। স্মার্ট সিটি, দ্রুত গতির ইন্টারনেট সবই আছে। মানুষের মত দেখতে অনেক প্রাণীও আছে। শুধু মানুষ নেই।

What's Your Reaction?

Like Like 1
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0
alihshawon আলী এইচ শাওন প্রযুক্তিবিদ ও সমাজকর্মী