মুখোশ
রাত যত গভীর হয়, গাঁয়ের কিছু লোকের চরিত্র যত পরিষ্কার দেখা যায়।আসলে তাদের চরিত্র অতোটা পরিষ্কার নয়। চর কালিগঞ্জের শেষ মাথায় এক ছোট্ট কুঁড়েঘর, সেখানে থাকে রিতা। মা-বাবা নেই, ভাইটা ও হারিয়ে গেছে যুদ্ধের সময়। অভাব, ক্ষুধা, আর পুরুষের লোভ তাকে ঠেলে দিয়েছে এক অন্ধকার পথে। গাঁয়ের মানুষ তাকে বলে ‘পতিতা’। তবে একবারও ভাবে না, কেন সে এই পথে নেমেছে। রিতা দু মুঠো ভাতের জন্য মানুষ এর দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে। সবাই তাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছে। গাঁয়ের মোড়ল হাশেম সাহেব, দিনে যিনি মসজিদে প্রথম কাতারে নামাজ পড়েন, রাতে ঠিকই এসে হাজির হন রিতার ঘরে। দরজা বন্ধ হয়, বাতি নেভে, ভেতরে নীরবতা আর শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ। রাতের শেষে বেরিয়ে যান তিনি, মুখে মিসওয়াকের গন্ধ আর কপালে নামাজের দাগ নিয়ে। গাঁয়ে আতরের গন্ধে চারিদিকে সুবাস ছড়ায়। সকালে বাজারে বসে বলেন। এই মেয়ে গাঁয়ের কলঙ্ক! ওর মতো মেয়ে থাকলে আল্লাহ্র গজব পড়বে। আমাদের গাঁয়ের দূর্নাম হবে। লোকজন তার কথায় মাথা নাড়ে, কেউ প্রতিবাদ করে না। লোকজন তো জানে না মোড়লের চরিত্র ভালো না। তাই সবাই মোড়লের কথাতে সাই দেয়। একদিন ভোরে পুলিশ এসে রিতাকে ধরে। অভিযোগ অসামাজিক কার্যকলাপ। গাঁয়ের মানুষ ভিড় করে দেখতে আসে, কেউ মুখ খোলে না। তখন রিতা এক পা এগিয়ে দাঁড়িয়ে বলে, “হ্যাঁ, আমি দোষী। তবে রাতের অন্ধকারে যারা আমার ঘরে ঢুকে, তারা কি নির্দোষ? হাশেম মোড়ল, আপনি সত্য বলবেন? আপনি কোথায় রাত কাটান। রিতার কথা শুনে হাশেম মোড়ল রেগে যায়।বলে তোমার এতো বড় স্পর্ধা আমি গাঁয়ের একজন সম্মানিত ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি। তুমি আমার সম্পর্কে খারাপ কুৎসা রটাচ্ছো। তোমার কাছে কি প্রমাণ আছে । তখন রিতা মুচকি হাসি দিয়ে বলে । প্রমাণ ছাড়া রিতা কাউকে দোষী করে না। রিতা ঘর থেকে মোড়ল সাহেবের হাজী গামছা আর টুপি নিয়ে আসে। বলে দেখুন তো মোড়ল সাহেব এটা চিনতে পারেন কিনা। মোড়ল সাহেব থতমত খেয়ে বলে এটা তুমি কোথায় পেলে?রিতা বলে রাতে যখন আপনি আমার ঘরে আসলেন। যাওয়ার সময় এটা ফেলে রেখে যান। রিতার কথা শুনে চারপাশে নিস্তব্ধতা। হাশেম সাহেবের মুখ শুকিয়ে যায়। একজন বৃদ্ধ ফিসফিস করে বলে, এই গাঁয়ে আসল পাপী তো মোড়লেরাই।ওরা ওপরে ফিটফাট দেখায় ভিতরে সদরঘাট। ধীরে ধীরে ভিড়ের মধ্যে কানা ঘোরা শুরু হয়। কারো চোখে রাগ, কারো চোখে ঘৃণা। ছিঃ ছিঃ মোড়ল সাহেব, আপনি এমন ছিলেন! আপনি তো আমাদের সন্তানদের সামনে ধর্মের কথা বলেন! এমন লোকের মুখ আর দেখতে চাই না! মোড়ল সাহেবের মুখ ঢেকে যায় নিজের পাঞ্জাবির কলারে। তখন ইন্সপেক্টর বললেন,এই আপনাদের মতো কিছু টুপি ওয়ালা লোক সমাজ নষ্ট করেন।আর দোষ দেন অসহায় মেয়েদের ওপর। কারণ তারা তো কিছু বলতে পারবে না।আর বললেও সমাজের মানুষ জন তার কথা বিশ্বাস করবেনা।বলবে ঔই মেয়ের দোষ। গাঁয়ের সবাই পুলিশ কে বলে।মোড়ল সাহেব কে গ্রেফতার করুন। পুলিশ তখন মোড়ল কে নিয়ে যায়। রিতা ও গাঁ ছেড়ে যায়। যায় বটে, তবে রেখে যায় এক চিরন্তন প্রশ্ন পতিতা কে? যে বেঁচে থাকার জন্য বিক্রি হয়, না যে মানুষ হয়ে লুকিয়ে শিকার করে? গাঁয়ের মানুষ ধীরে ধীরে চুপচাপ হয়ে যায়। কেউ মুখে কিছু বলে না, কিন্তু ভিতরে ভিতরে রিতার কথাগুলো ঘুরপাক খায়। যেই মোড়লকে এতদিন তারা সম্মানের চোখে দেখেছে, সেই লোকটাই যে এতটা নিচ হতে পারে, তা কেউ কল্পনাও করেনি। সেই ঘটনার পর আর কেউ রিতার ঘরের সামনে হৈচৈ করতে যায়নি। মোড়ল সাহেব নিজে ও আর মসজিদে যায় না। লোকজন বলে তিনি নাকি শহরে ভাইয়ের বাসায় চলে গেছেন। গাঁয়ের বাজারে কেউ তার নাম মুখেও আনে না। কিন্তু রিতা? সে চলে গেলেও তার সাহসী কণ্ঠস্বর যেন বাতাসে রয়ে গেছে। অনেকদিন পর কেউ একজন রিতার ঘরের পাশে ছোট্ট একটা বাক্স পায়। সেখানে লেখা, আমি গ্লানি নিয়ে বাঁচতে চাইনি। মুখোশ খুলে দিয়েছি, এখন বাঁচবে সত্য। গাঁয়ের কিছু তরুণ তখন বুঝতে শেখে, শুধু পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আর মুখে ধর্মের বুলি নয় একজন মানুষের আসল পরিচয় তার কর্মে। আর কিছু নারী, যারা আগে রিতাকে ঘৃণা করত, তারা চোখে জল এনে বলে, হয়তো রিতাই সবচেয়ে সাহসী মেয়ে ছিল এই গাঁয়ে। রিতা নেই, কিন্তু তার প্রতিবাদী কণ্ঠে জন্ম নেয় নতুন এক আলো। যেখানে সত্য মুখোশ ছিঁড়ে সামনে আসে। আর মানুষ বোঝে সব মুখোশের পেছনে ধর্ম থাকে না, কখনো কখনো লুকিয়ে থাকে অমানবিকতা।
What's Your Reaction?
Like
1
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
1