রক্তাক্ত প্রতিশোধ

একটা রহস্যময় খুন, সন্দেহের তীর জাকিয়ার দিকে। সে কি সত্যিই খুনী? নাকি তাকে তুর্পের তাস বানিয়ে আসলে খেলা খেলছে অন্য কেউ?

ফেব্রুয়ারী 4, 2026 - 19:01
 0  2
রক্তাক্ত প্রতিশোধ
একটা রহস্যময় খুন, সন্দেহের তীর জাকিয়ার দিকে। সে কি সত্যিই খুনী? নাকি তাকে তুর্পের তাস বানিয়ে আসলে খেলা খেলছে অন্য কেউ?

রক্তাক্ত প্রতিশোধ
খাদিজা আরুশি আরু
পর্বঃ৪


"হাসিব" জাকিয়ার পরিবারের কাছ থেকে এ নামটাই জেনে এসেছে কুঞ্জ... তন্ময়ের মনে হচ্ছে তারা কিছু একটা মিস করছে, তাই কুঞ্জকে বললো,

-কুঞ্জ, মিস জাকিয়া বাড়ি ছাড়ার পর থেকেই কি এই ফ্লাটে থাকছে?
-না স্যার, এই ফ্লাটে তো গত দেড় বছর যাবত থাকছে কিন্তু মেয়েটা বাড়ি ছেড়েছে সাত বছর। 
-স্ট্রেঞ্জ, সেভেন ইয়ারস! তাহলে মাঝে সাড়ে চারবছর কোথায় ছিলো? আর ফ্লাটটা কি করে কিনেছে কোনো আপডেট পেয়েছো?
-স্যার, জাকিয়াকে ঘর থেকে বের করে দিলেও তাকে সম্পত্তি থেকে বেদখল করে নি তার পরিবার। তার প্রাপ্য সম্পত্তি তাকে উকিলের মারফত বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। আর সেখান থেকে কিছু সম্পত্তি বিক্রি করে সে এ ফ্লাটটা কিনেছে। লইয়ারের সঙ্গে আমি নিজে দেখা করে সব পেপারস এর ফটোকপি এনেছি স্যার।
-গ্রেট, তাহলে এ ফ্লাটে শিফ্ট হবার আগে মিস জাকিয়া কোথায় থাকতেন, কি কাজ করতেন তার খোঁজ নাও... হতে পারে তার পূর্বের কোনো ক্রিমিনাল হিস্ট্রি আছে। আর তার ফেয়ন্সে, মি. হাসিব সম্পর্কেও খোঁজ নিও। যতোদূর মনে হয় লোকটার খোঁজ তাদের ভার্সিটি থেকে পাওয়া যাবে যেহেতু প্রেম ঘটিত সম্পর্ক।
-ওকে স্যার, আমি খোঁজ নিয়ে আপনাকে আপডেট দিচ্ছি।

তন্ময় বেশ কিছুক্ষণ শান্ত হয়ে বসে থেকে জাকিয়ার এপার্টমেন্টের দিকে রওনা হলো... ত্রিশ মিনিটের মাথায় এপার্টমেন্টে পৌঁছে জাকিয়ার পাশের ফ্লাটে গেলো, ফ্লাটের মালিক শিহাব সাহেব তাকে দেখে সৌজন্যমূলক হাসি দিলেন তারপর বললেন,

-আপনি প্লিজ বসুন, আমি আসলে সাওয়ার নিচ্ছিলাম। শেষ করে আপনার সঙ্গে কথা বলছি...

তন্ময় হালকা হেসে বললো,

-জ্বী নিশ্চয়ই।

তন্ময় এ ঘরটায় তল্যাশী করতে চাইছিলো, এতো সহজে সুযোগটা পেয়ে যাবে ভাবে নি। তাই শিহাব ওয়াশরুমে ঢোকা অবধি অপেক্ষা করলো তারপর তার ঘরটায় তল্যাশী শুরু করলো। একটা জিনিস তন্ময় ভেবে পাচ্ছে না, এতো সুদর্শন অবিবাহিত লোকের কোনো গার্লফ্রেন্ড নেই... তার উপর জাকিয়ার মতো নেশায় আসক্ত কাউকে সে বিয়ে করতে চেয়েছিলো! 

হিসাবটা মেলাতে পারছে না তন্ময়, শিহাব বের হবার পর দু'মগ কফি বানিয়ে সোফায় আরাম করে বসলো। তন্ময়ের দিকে এক মগ কফি এগিয়ে দিয়ে বললো,

-আমার ঘরটা তল্যাশী করা শেষ?

তন্ময় আড়চোখে সামনে বসা লোকটাকে দেখলো তারপর নিজের মধ্যকার বিব্রত ভাবটা কাটিয়ে বললো,

-আপনার ঘর তল্যাশী করতে আমি আসি নি, তবে কিছু জানার ছিলো।
-জ্বী বলুন।
-আপনি মিস জাকিয়াকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন?
-জ্বী।

তন্ময় কৌতুকের সুরে বললো,

-আপনার মতো একজন সুদর্শন পুরুষ সিঙ্গেল ব্যাপারটা হাস্যকর।
-সিঙ্গেল ছিলাম না, জাকিয়া ম্যাডামকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়ার এক মাস আগে ব্রেকআপ হয়েছিলো।
-বর্তমানে আপনি সিঙ্গেল?
-না, জাকিয়া না করে দেবার এক সপ্তাহের মাথায় নতুন সম্পর্কে গেছি। আসলে জাকিয়ার করা অপমান ভুলতে এক সপ্তাহ সময় লেগেছে। নতুবা আরও আগে নিউ রিলেশনে যেতাম। 
-কি ধরনের অপমান?
-আর বলবেন না, রেস্টুরেন্টে সবার সামনে চড় দিয়ে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করলো...
-হুঁ... আচ্ছা যেদিন বাচ্চাটা মারা গেলো সেদিন আপনাকে দেখেছিলাম কিন্তু আপনার সঙ্গে কি বাসায় আপনার কোনো বন্ধু বা কলিগ ছিলো তার আগের রাতে?

শিহাবকে কেমন অপ্রস্তুত দেখালো, সে কপালে জমা বিন্দু বিন্দু ঘাম মুছে মুচকি হেসে বললো,

-সে রাতে আমার প্রচন্ড মাথাব্যাথা করছিলো, তাই টাফনিল খেয়ে ঘুমাচ্ছিলাম। আমার বাসায় সে রাতে কেউ ছিলো না, চাইলে আপনি দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করতে পারেন।

তন্ময় আর কথা বাড়ালো না, সে দারোয়ানকে আগেই জিজ্ঞেস করেছে... দারোয়ান বলেছে সে রাতে শিহাব একা ছিলো, কিন্তু তবুও তন্ময়ের মনে হচ্ছে এ কেইসের সঙ্গে জড়িত প্রতিটি ব্যক্তি মিথ্যে বলছে... সবাই'ই কিছু একটা আড়াল করে যাচ্ছে, হয়তো নিজের দোষ লুকানোর জন্যই করছে তারা কাজগুলো... সবাই স্বার্থপরের মতো নিজেদের কথা ভাবছে, কেউ একবারের জন্য ভাবছে না যে তাদের জন্য একজন নিষ্পাপ মানুষ শাস্তি পেতে পারে, একটা নিষ্পাপ বাচ্চা ন্যায় পাবার অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারে... হায়, এ পৃথিবীতে বসবাসকারীরা বড্ড বেশিই স্বার্থপর!

বাচ্চাটা মারা যাবার পর আজ একুশ দিনের দিন জাকিয়াকে থানায় ডাকা হলো... প্রথম থেকেই জাকিয়া অবাক হচ্ছিলো এই ভেবে যে, তাকে যেহেতু সন্দেহের তালিকার প্রথমে রাখা হয়েছে তাহলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয় নি কেনো! 

অফিস থেকে ফেরার পথে জাকিয়া থানায় এসেছে, তাকে একটা খালি ঘরে বসানো হয়েছে... মাথার উপর ক্যাচক্যাচ শব্দ করে ফ্যান ঘুরছে অথচ তবুও ঘরটায় ভ্যাপসা গরম অনুভূত হচ্ছে জাকিয়ার। অন্যদিকে তার কপাল বেয়ে দরদর করে ঘাম ঝরছে, দশ মিনিটের মাথায় তন্ময় এবং কুঞ্জ ঘরটায় ঢুকলো। জাকিয়া তাদের দেখে উঠে দাঁড়ালে তন্ময় হাতের ইশারায় তাকে বসতে বললো...

চেয়ার টেনে জাকিয়ার সামনে বসতে বসতে তন্ময় তার পকেট থেকে টিস্যু এগিয়ে দিয়ে বললো,

-ঘামটা মুছে নিন...

জাকিয়া কাঁপা হাতে রুমালটা নিলো তারপর কপালের ঘাম মুছে টেবিলের উপরের বোতল থেকে ঢকঢক করে পানি খেলো। তন্ময় কোনো প্রকার ভূমিকা ছাড়াই জিজ্ঞেস করলো,

-আপনার বিয়ের আগের দিন রাতে আপনি পালিয়ে যাবার পর রাতে বাড়ির কাজের লোক মিতু আত্নহত্যা করেছিলো... এর সঙ্গে আপনার হবু স্বামী মি. হাসিব কোনোভাবে জড়িত নয় তো?

চকিতে তন্ময়ের দিকে তাকালো জাকিয়া, তার হাত থেকে পানির বোতলটা মুহূর্তেই মেঝেতে পড়ে এক অদ্ভুত বিশ্রী শব্দ করলো... তন্ময়ের ঠোঁটের কোনে মুচকি হাসি... সে হাসিটি বজায় রেখেই তন্ময় আবার জিজ্ঞেস করলো,

-মি. হাসিব, আপনার দুই ব্যাচ সিনিয়র ছিলো তো... তিন বছরের প্রণয় তারপর পরিণয়? হঠাৎ আপনি পালিয়ে গেলেন কেনো?

কপালে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘাম মুছে জাকিয়া বললো,

-শেষ মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিলো আমি ভুল মানুষকে পছন্দ করেছি।
-এমনটা মনে হবার কারন কি?
-আসলে আমার ওকে ভালো লাগছিলো না।
-যাকে তিনটা বছর ভালো লাগলো সে মানুষটা হঠাৎ এতোটা ভালো না লাগার হয়ে গেলো কি করে?
-এসব আমার ব্যক্তিগত প্রশ্ন, তাছাড়া এসব এ কেইসের সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত নয়।
-অবশ্যই যুক্ত... যুক্ত না হলে পুরোনো কাসুন্দি ঘাটার লোক এস.আই. তন্ময় নয়।

টেবিলের উপর দু'হাতে জোরে ছাপড় দিয়ে চিৎকার করে কথাটা বললো তন্ময়। জাকিয়া কেঁপে উঠলো, তার খুব কান্না পাচ্ছে তবুও নিজের কান্নাটাকে চেপে রেখে দম ধরে বসে রইলো... তন্ময় নিজেকে শান্ত করে জিজ্ঞেস করলো,

-কেনো পালিয়েছিলেন?
-হাসিব আমার সঙ্গে বিয়ের আগেই অন্তরঙ্গ হতে চাইছিলো, যে ব্যাপারটার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। তাই...
-মিথ্যে বলছেন আপনি...
-ন...না, সত্যি হাসিব এটা চাইছিলো। আমাকে সে জন্য জোর করায় আমি তাকে থাপ্পড়ও দিয়েছিলাম।
-এটা কবেকার ঘটনা?
-বিয়ের পাঁচদিন আগের।
-তাহলে তখন না পালিয়ে বিয়ের আগের দিন অবধি অপেক্ষা কেনো করলেন?
-আমি কনফিউশনে ভুগছিলাম...
-মিথ্যে বলছেন আপনি...
-এটাই সত্যি।
-সত্যিটা আমি জানি মিস জাকিয়া, ব্যস আপনার মুখ থেকে শুনতে চাই।

চকিতে সামনে বসে থাকা মানুষটার দিকে তাকালো জাকিয়া, তন্ময়ের দৃষ্টি স্থির... দেখে বুঝা যাচ্ছে সে মিথ্যে বলছে না। জাকিয়া সে দৃষ্টিতে বেশিক্ষণ নিজের দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখতে পারলো না। চোখ সরিয়ে মুখে ওড়না চেপে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো... তন্ময় পানির গ্লাস তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,

-সত্যি ঘটনাটা আপনার মতো করে খুলে বলুন। কারন আমরা যা জেনেছি তাতে আপনি অনেক কিছু জানেন যা আপনি এতোগুলো বছর লুকিয়ে গেছেন।

জাকিয়া পানিটা খেয়ে কিছুক্ষণ ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে রইলো, তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলতে শুরু করলো,

-আমি তখন ভার্সিটির সেকেন্ড ইয়ারে, আর হাসিব ফোর্থ ইয়ারে... আমার পড়াশুনায় সাহায্য লাগতো মূলত সে জন্যই মূলত ওর স্বরণাপন্ন হয়েছিলাম। গ্রুপ স্ট্যাডি করতে করতে কখন যেনো ভালো লাগতে লাগলো ওকে... ও হঠাৎ একদিন বলে বসলো ও আমাকে ভালোবাসে। আমি না করতে পারিনি, এমন সাদামাটা ভাবেই আমাদের সম্পর্কের শুরু হয়েছিলো। আমাদের সম্পর্ক হবার পর থেকে হাসিব কেমন যেনো পাল্টে যেতে লাগলো, সবসময় তার আমার সান্নিধ্য চাই, আমার সঙ্গে অন্তরঙ্গ হবার সুযোগ খুঁজতে লাগলো সে। তবে আমার দিক থেকে কোনো প্রকার সায় না পেয়ে অনেকটা জোর করেই সে নিজেকে দমিয়ে নিলো। আমাদের তিন বছরের সম্পর্কে সে কখনো আমাকে জোর করে নি এসবের জন্য। কিন্তু...
-কিন্তু?
-একটু পানি দেয়া যাবে?

তন্ময় পানির গ্লাসটায় পানি নিয়ে জাকিয়ার দিকে এগিয়ে দিলো। মেয়েটাকে কেমন নির্লিপ্ত দেখাচ্ছে, এতোটা শান্ত যেনো শরীরে প্রান নেই... বেঁচে আছে এই যেনো অনেক কিছু! কুঞ্জ পাশে মুর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে, তার হাতে একটা ডায়েরী। জাকিয়ার বয়ান থেকে জরুরি তথ্যগুলো সে ডায়েরীতে নোট করছে। জাকিয়া আবার বলতে শুরু করলো,

-আমার দিক থেকে সায় না পেয়ে হাসিব আমার সঙ্গে সম্পর্ক থাকাকালীন আরও দুটো রিলেশনে ছিলো। এ কথাটা যখন আমি জানতে পারি তখন হাসিব আমার কাছে ক্ষমা চায়, আমি ওকে এতোটা ভালোবাসতাম যে ওকে ক্ষমা না করে থাকতে পারি না কিন্তু ওকে শর্ত হিসেবে ওই মেয়েদের ছেড়ে আমাকে বিয়ে করতে বলি।
-রাজি হয়েছিলেন উনি?
-হ্যাঁ, ও আমাকে সত্যিই ভালোবাসতো। তাই ও আমার সামনে ওই মেয়েগুলোর সঙ্গে ব্রেকআপ করে এবং নিজের বাবা মাকে সঙ্গে করে আমার বাড়িতে যায়। বিয়েও ঠিক করে আসে, দেড় মাস পর বিয়ের ডেট ফাইনাল হয়। যেদিন বিয়ে ঠিক হয় সে রাতে ও ছাদে আমাকে দেখা করতে বলে, আমি গেলে সে বার প্রথম ও আমার সঙ্গে জোর করে অন্তরঙ্গ হবার চেষ্টা করে। ওর কথা ছিলো, "বিয়ে তো হবেই তাহলে অন্তরঙ্গ হতে ক্ষতি কি"! আমি কোনোমতে নিজেকে বাঁচিয়ে ঘরে ফিরেছিলাম। তারপরের দিন ওরা ঢাকায় ফিরে যায়, আমিও ওর রাতের করা অন্যায়টাকে ভুল ভেবে ক্ষমা করে বিয়ের স্বপ্নে বিভোর হয়ে পড়ি... সবই ঠিক ছিলো, কিন্তু বিয়ের দুইদিন আগে আমি যা শুনলাম তাতে আমার সমস্ত শরীর অসাড় হয়ে পড়েছিলো। আমি বাঁচার ইচ্ছে বা শক্তি কিছুই পারছিলাম না... হাসিব আমার সঙ্গে এটা কি করে করলো ভেবে পাচ্ছিলাম না!
-কি করেছিলো হাসিব?

চলবে...

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0
Khadiza Arushi Aru সখের বশে লেখালেখি শুরু করলেও বর্তমানে তা আর সখ নেই, নেশা হয়ে গেছে। নিজের অনুভূতি, চিন্তাধারা, অভিজ্ঞতাকে অন্যের দ্বারপ্রান্তে সুকৌশলে পৌঁছে দেয়াই হয়তো আমার লিখে যাবার অনুপ্রেরণা! আমার প্রথম সম্পাদিত বই, "নবধারা জল" এবং প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস, "সূর্যপ্রভা"