ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু - বাংলাদেশের ইন্দো-প্যাসিফিক দৃষ্টিভঙ্গি

বাংলাদেশের ইন্দো-প্যাসিফিক দৃষ্টিভঙ্গি হলো একবিংশ শতাব্দীর ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতি একটি বিচক্ষণ এবং অপরিহার্য প্রতিক্রিয়া। এটি শুধু একটি নীতি নয়, বরং এক কৌশল, যার লক্ষ্য হলো এই অঞ্চলের শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতাকে নিজের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুযোগে রূপান্তর করা। এই কৌশল যদি সফলতা পায়, তবে বাংলাদেশ অদূর ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম স্থিতিশীল ও প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হবে। তবে এর সাফল্যের জন্য প্রয়োজন দৃঢ় সংকল্প, দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া।

ডিসেম্বর 9, 2025 - 14:15
ডিসেম্বর 9, 2025 - 14:17
 0  6
ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু - বাংলাদেশের ইন্দো-প্যাসিফিক দৃষ্টিভঙ্গি

ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু - বাংলাদেশের ইন্দো-প্যাসিফিক দৃষ্টিভঙ্গি

ভূ-রাজনীতির বর্তমান বিতর্কে সবচেয়ে আলোচিত এবং গুরুত্বপূর্ণ ধারণার কেন্দ্রে রয়েছে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু এবং কৌশলগত ক্ষমতার মঞ্চ হিসেবে এই অঞ্চলের উত্থান ঘটেছে। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশ নিজস্ব ইন্দো-প্যাসিফিক দৃষ্টিভঙ্গি (IPS) ঘোষণা করেছে, যা দেশের পররাষ্ট্রনীতি এবং অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই বিশ্লেষণাত্মক নিবন্ধে আমরা বাংলাদেশের এই কৌশলের ঐতিহাসিক পটভূমি, বর্তমান অবস্থান, জড়িত আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর স্বার্থ এবং এর সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট - নিরপেক্ষতার পথে যাত্রা

বাংলাদেশের ইন্দো-প্যাসিফিক দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তি প্রোথিত রয়েছে দেশের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে অনুসৃত পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্রে: "সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে শত্রুতা নয়।" শীতল যুদ্ধের দ্বিমেরু বিশ্বে বাংলাদেশ কোনো নির্দিষ্ট সামরিক ব্লকে যুক্ত না হয়ে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন (NAM)-এর অংশ হয়েছিল। এটিই ছিল বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্যের নীতির প্রথম উদাহরণ। বহু দশক ধরে, বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতি মূলত দক্ষিণ এশিয়া (সার্ক) এবং জাতিসংঘের কাঠামোতেই সীমাবদ্ধ ছিল, যেখানে অর্থনৈতিক কূটনীতি ছিল প্রধান ফোকাস। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধির কারণে, বাংলাদেশকে এক কঠিন ভূ-রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হয়। এই চাপই দেশকে বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক ধারণার প্রতি একটি সুস্পষ্ট, নিজস্ব অবস্থান নিতে বাধ্য করে।  

বাংলাদেশের 'ইন্দো-প্যাসিফিক দৃষ্টিভঙ্গি' (IPS): মূল মন্ত্র কী?

২০২৩ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তার ইন্দো-প্যাসিফিক দৃষ্টিভঙ্গি ঘোষণা করে। এটি মূলত কোনো সামরিক জোটের অংশ না হয়ে অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং শান্তি বজায় রাখার উপর জোর দেয়। এই কৌশলের মূল উদ্দেশ্য হলো সকলের জন্য সমৃদ্ধি (Prosperity for All) এবং একটি মুক্ত, উন্মুক্ত, শান্তিপূর্ণ, সুরক্ষিত এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের IPS চারটি প্রধান নীতিগত ক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে গঠিত: আন্তর্জাতিক আইন মেনে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা; বাণিজ্য, সংযোগ ও বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন; স্থল, জল ও ডিজিটাল সংযোগকে শক্তিশালী করা; এবং জলবায়ু পরিবর্তনসহ অ-ঐতিহ্যবাহী নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহযোগিতা করা। গুরুত্বপূর্ণ হলো, বাংলাদেশের IPS সরাসরি কোনো পরাশক্তির কৌশলকে অনুসরণ না করে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে রচিত, যেখানে অর্থনৈতিক প্রগতিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

জড়িত আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর স্বার্থ ও বাংলাদেশের ভূমিকা

বাংলাদেশের IPS ঘোষণার পর বিশ্বশক্তিগুলোর মধ্যে আগ্রহ এবং তৎপরতা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রত্যেকেরই নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। চীন এই অঞ্চলে তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI) সম্প্রসারণের মাধ্যমে ভারত মহাসাগরে কৌশলগত অবস্থান সুসংহত করতে আগ্রহী। তারা বাংলাদেশের অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রধান বিনিয়োগকারী হিসেবে নিজেদের অবস্থান বজায় রাখতে চায়। অন্যদিকে, ভারত আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। বিশেষত বঙ্গোপসাগরে চীনা প্রভাব সীমিত রাখা এবং আঞ্চলিক সংযোগ শক্তিশালী করার মাধ্যমে তারা একটি বিশ্বস্ত আঞ্চলিক অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশকে পাশে রাখতে চায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে একটি মুক্ত ও উন্মুক্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করার নীতিতে বিশ্বাসী। তারা বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে যুক্ত করতে এবং চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে আগ্রহী। তবে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বিষয়ে তারা নিয়মিত চাপ বজায় রাখে। এছাড়া, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো স্থিতিশীল সরবরাহ শৃঙ্খল বজায় রাখতে এবং আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী। ফলস্বরূপ, বাংলাদেশকে এই সমস্ত বিপরীতমুখী শক্তিগুলোর নিজস্ব স্বার্থের মধ্যে একটি কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রেখে সাবধানে এগিয়ে যেতে হচ্ছে।

কৌশলগত গুরুত্ব: বাংলাদেশ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানই এটিকে ভূ-রাজনীতির ক্ষেত্রে এক অপরিহার্য খেলোয়াড় (Indispensable Player) করে তুলেছে। বাংলাদেশ কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত, যা দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভারত মহাসাগরকে সংযুক্ত করে এবং বিশ্বের বিপুল পরিমাণ বাণিজ্য এই পথেই সম্পন্ন হয়। এছাড়া, বাংলাদেশ ভারত, নেপাল এবং ভুটানের স্থলবেষ্টিত অঞ্চলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে কাজ করে। এটি আঞ্চলিক সংযোগের (BIMSTEC, BBIN) কেন্দ্রবিন্দু। একটি দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য।

ভবিষ্যতের প্রভাব ও চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের IPS-এর ভবিষ্যৎ প্রভাব সুদূরপ্রসারী, তবে পথটি চ্যালেঞ্জমুক্ত নয়। ইতিবাচক প্রভাব হিসেবে, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার কারণে বাংলাদেশ অবকাঠামো, বাণিজ্য এবং প্রযুক্তিতে বড় ধরনের বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হবে। ভারসাম্যের নীতি বজায় রেখে বাংলাদেশ তার কূটনৈতিক স্বাধীনতা আরও সুসংহত করতে এবং কোনো নির্দিষ্ট শক্তির উপর নির্ভরশীলতা এড়াতে পারবে। তবে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো, চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে নিখুঁত ভারসাম্য বজায় রাখা। এক পক্ষের দিকে সামান্য ঝুঁকে পড়া অন্য পক্ষের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে পারে। এছাড়া, রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হলে তা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির উপর চাপ সৃষ্টি করবে।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0
Niloy66 MD Sabbir Hossen