অজু শরীরে ময়লা মনে

শরীর পরিষ্কার হয় অজুতে , কিন্তু মন যদি অশুদ্ধ থাকে ধর্ম শুধু বাহ্যিক চেহারা । সত্যিকারের ঈমান মানে মিথ্যা ও অন্যায়ের কাছে লজ্জা পাওয়া , ন্যায় মানা । ধর্ম প্রদর্শনী নয় , চরিত্র ও বিবেকের আয়না ; মুখে কালিমা সব ঠিক করে না । ভেতরের মুসলমান হ‌ওয়াই আসল , বাহ্যিক রূপ কেবল অভ্যাস।

জানুয়ারী 28, 2026 - 20:35
 0  4
অজু শরীরে ময়লা মনে

ধর্ম শরীরের অজু ,না মনের ? আপনি যদি দিনে পাঁচবার নামাজ পড়েন , কিন্তু একবারও মিথ্যা কথা বলতে লজ্জা না পান - তাহলে আপনার ধর্ম কোথায় থাকে ? ধর্ম কি শুধু  নামাজ  , রোযা , তসবিহ , দোয়া ? নাকি ধর্ম মানে যা মানুষ নিজের ভেতর ধারণ করে , যা তার চরিত্রে দেখা যায় ?

নামাজের আগে আমরা অজু করি । হাত ধুই , মুখ ধুই , পা ধুই। শরীর পরিষ্কার হয় । কিন্তু একটা প্রশ্ন আমরা খুব কমই করি -মনের ময়লা পরিষ্কার হয় কোন অজুতে ? হিংসা , অহংকার , লোভ , মিথ্যা , সুদ ঘুষ - এগুলো কি পানিতে ধুয়ে যায় ? মনের অজু হয় সততায় , ন্যায়ে ,ক্ষমায় ,  নিজের ভুল স্বীকার করার সাহসে ।

আজ আমরা কী দেখি ? বাহ্যিক ধার্মিকতার চিহ্ন আছে । তসবিহ আছে । মুখে "আস্তাগফিরুল্লাহ" আছে । কিন্তু সেই বাহ্যিকতার আড়ালেই লুকিয়ে থাকে সুদ , ঘুষ , অন্যায় , মানুষের হক নষ্ট করা । আমি কাউকে ছোট করছি না । কার‌ও দিকে আঙুল তুলছি না । আমি শুধু নিজের চোখে দেখা বাস্তব বলছি  ।

সমস্যা ব্যাহ্যিক চিহ্নে না । সমস্যা নামাজে না । সমস্যা হলো -আমরা ধর্মকে বানিয়েছি প্রদর্শনী । বাহ্যিক রূপ যদি থাকে , কিন্তু বিবেক না থাকে - তাহলে সেই রূপ শুধু অভ্যাস । ধর্ম না।আচার পালন সহজ । কারণ সেটা দেখা যায় । কিন্তু চরিত্র গঠন কঠিন । কারণ সেটা লুকিয়ে থাকে । এই কারণেই যে মানুষ সবচেয়ে বেশি তাক‌ওয়ার কথা বলে , সে-ই অনেক সময় ধর্মের চাদরে অন্যায় ঢেকে রাখে ।

অথচ ধর্ম কোনো ঢাল না । ধর্ম হলো আয়না  । যে ধর্ম মানুষকে ভালো মানুষ বানায় না , সে ধর্ম ধারণ করা হয়নি - শুধু মুখে উচ্চারণ হয়েছে । সত্যিকারের ধর্মচর্চা তখনই শুরু হয় , যখন নামাজ শেষে মানুষটা মিথ্যা বলতে লজ্জা পায় , ঘুষ নিতে ভয় পায় ,কার‌ও অধিকার নষ্ট করতে হাত কাঁপে । শরীরের অজুর সঙ্গে যদি চরিত্রের অজু না থাকে , তাহলে ইবাদাত শুধু অভ্যাস - ঈমান নয় ।

ধর্ম মানে দেখানো না । ধর্ম মানে হ‌ওয়া । ধর্ম নিয়ে কথা বললেই আমরা ভয় পাই । কারণ সত্য বললে কেউ না কেউ কষ্ট পায় । কিন্তু সত্য চাপা দিলে সমাজ শুদ্ধ হয় না । হিন্দু সমাজে মূর্তি পূজা আছে -মুসলমানদের বিশ্বাস অনুযায়ী তা সঠিক নয় । কিন্তু একটা বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না -ওদের ভিতরে ভক্তি আর শ্রদ্ধাবোধ গভীরভাবে চর্চা করা হয় । তারা বড়দের পায়ে হাত দেয় । ওটা অসম্মান না - ওটা বিনয় ।

আর আমরা কী বলি ? "শিরক !" কিন্তু প্রশ্ন হলো বিনয় কি শিরক ? শ্রদ্ধা কি ঈমান নষ্ট করে ? যদি বাবা -মাকে সম্মান করা ইবাদাত হয় , তাহলে সেই সম্মান প্রকাশের ভাষা বদলালেই কি তা হারাম হয়ে যায় ? খাবারের দিকে তাকান । আমরা প্লেটে ভাত নিই , খেয়ে উঠি । খাবারের দোয়াটাও অনেকেই বলিনা ।ওরা খাবার পাচটা বাটিতে সুন্দর করে সাজিয়ে মন্ত্র পড়ে খাবার মুখে দেয় ।

ওটা শুধু খাবার না - ওটা শৃঙ্খলা , কৃতজ্ঞতা , মানবিকতা ।আর আমরা ধর্মের নামে সবচেয়ে বেশি ভেদাভেদ করি । এই লোকটা মুসলমান ওই লোকটা মুসলমান না । এদের বংশ ভালো , ওদের বংশ খারাপ । এই ব্যক্তিটা মাযহাব আরো কতো কী ?অথচ আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করার সময় কোন ভেদাভেদ করেননি।কালো -সাদা ধনী -গরিব আরব -অন‌আরব -কোনটাই মাপকাঠি না । মাপকাঠি একটাই কে কতটা মানুষ ।

আল্লাহ আমাদের ধর্মের নয় কর্মের হিসাব নেবে । কিন্তু এই কথাটা আমরা কেউ মানতেই চাইনা । ধর্ম বুঝতে হলে পথপ্রদর্শক লাগে । কেউ তাকে গুরু বলে , কেউ মুর্শিদ , কেউ ওস্তাদ । নাম আলাদা । কাজ একটাই - সঠিক  পথ দেখানো । কিন্তু "গুরু"শব্দটা শুনলেই আমরা ভয় পাই । নাস্তিক , পথভ্রষ্ট, বেদ‌আত - লেবেল লাগাই । অর্থ না বুঝে শব্দকে হারাম বানানো ধর্ম না - অজ্ঞতা । 

নমস্কার মানে বিনয় । কৃতজ্ঞতা । সেজদা মানে শুধু মাটিতে মাথা ঠেকানো না । সেজদা মানে অহংকার ভাঙা , সত্যের সামনে মাথা নত  করা ।আমরা কি বুঝে সেজদা দিই ?নাকি শুধু অভ্যাসে ? আল্লাহকে চোখে দেখা যায় না । কিন্তু ন্যায় দেখা যায় । সত্য দেখা যায় । অন্যায়‌ও  দেখা যায় । অন্যায় দেখেও যদি আমরা মাথা নত করি -সেই সেজদা আল্লাহর হয় না । ওটা ভয়ের । যে পথপ্রদর্শক মানুষকে অন্যায় থেকে ফেরায় , মানুষ হতে শেখায়  ।

সে গুরু কি শিরক  ? না । শিরক তখন‌ই যখন মানুষকে  আল্লাহর জায়গায় বসানো হয় । শ্রদ্ধা আর উপাসনা এক না । ধর্ম মানে প্রশ্ন বন্ধ করা না । ধর্ম মানে প্রশ্ন করে অহংকার ছেড়ে দেওয়া । যে ধর্ম বোঝা ছাড়া পালিত হয় , সে ধর্ম মানুষ বানায় না । ভক্ত সাজায় । মুখে কালিমা পড়লেই সব হয়ে গেলে দুনিয়ায় এত অন্যায় থাকত না । কালিমা শুধু জিহ্বার উচ্চারণ না । কালিমা শুধু ক্বালবের ঘোষণা । কালিমা যখন ক্বালবে ঢোকে , তখন আইন না থাকলেও ভেতরে বিবেক দাঁড়িয়ে থাকে  । 

হাত কাঁপে মন প্রশ্ন করে - "আমি কি এটা করতে পারি" ? সেই প্রশ্নটাই ঈমান । আমরা কালিমা পড়ি , কিন্তু ক্বালবে ঢুকতে দিই না । ঠোঁট পর্যন্ত রাখি , হৃদয় পর্যন্ত নামাই না । এই কারণেই মুখে আল্লাহ , হাতে অন্যায় । ইসলাম মুখের মুসলমান চায়নি । ইসলাম চেয়েছে ভেতরের মুসলমান । যে কালিমা মানুষকে ভালোবাসতে শেখায় না , ন্যায়ে দাঁড়ায় শেখায় না  , অন্যায়ের সামনে "না"বলতে শেখায় না -সে কালিমা শব্দ চাননি । আল্লাহ চেয়েছেন এমন এক ক্বালব -যেখানে মিথ্যা টেকে না , অহংকার বসে না । সেই ক্বালব‌ই ধর্ম বাঁচে সেই ক্বালবেই মানুষ হ‌ওয়া সম্ভব ।

What's Your Reaction?

Like Like 1
Dislike Dislike 0
Love Love 1
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 1
@zerin609 Zerin Jahan Disha Disha