ব‌ইয়ের দেশ আর বাস্তবের দেশ

ব‌ইয়ের পাতায় লেখা স্বপ্নময় বাংলাদেশের সঙ্গে বাস্তবের জীবনের কঠিন পার্থক্য।

নভেম্বর 8, 2025 - 21:28
 1  15
ব‌ইয়ের দেশ আর বাস্তবের দেশ

ব‌ইয়ের দেশ আর বাস্তবের দেশ

জেরিন জাহান দিশা 

 আমরা ব‌ইতে পড়ি । আমাদের দেশের নাম বাংলাদেশ। বাংলাদেশের জাতীয় পাখি দোয়েল।

ভোরবেলায় সে মিষ্টি সুরে ডাকে। কিন্তু আমি কখনো শুনিনি দোয়েলের ডাক। ভোর বেলাতে

ঘুম ভাঙে শালিকের কিচিরমিচির ডাকে, ঘুঘুর 

মৃদু ডাকে। ব‌ইয়ের পাতায় যে দোয়েল ভোরের

আকাশে গান গায়, বাস্তবে সে দূরের এক অতিথি।

ব‌ইতে পড়ি নদীতে নৌকা চলে। মাঝির গলায় ভেসে আসে সুরেলা গান। অথচ নদীর বুক শুকিয়ে 

গেছে, নৌকা চোখেই পড়ে না। চর পড়েছে নদীর মাঝখানে, মানুষ ভুলে গেছে বৈঠা চালানোর শব্দ।

আমরা গর্ব করে বলি। বাংলাদেশ ছয় ঋতুর দেশ।

কিন্তু এখন ঋতুর সঙ্গে প্রকৃতির কোন মিল নেই।

গ্রীষ্মের তাপ ছুঁয়ে থাকে বছরের বেশিরভাগ সময়,

বর্ষা আসে দেরিতে, শরৎ - হেমন্তের রূপ হারিয়ে গেছে বললেই চলে। একসময় যে ঋতু পরিবর্তনে 

প্রকৃতির রঙ বদলাত , এখন সে পরিবর্তন যেন কেবল ব‌ইয়ের পাতাতেই রয়ে গেছে।

 ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ। বাঙালিকে বলা 

হয় মাছে ভাতে বাঙালি। কিন্তু এই ইলিশের দাম 

প্রায় দুই হাজার টাকা কেজি ! সাধারণ মানুষ কি 

করে খাবে ? বড়লোকের পাতে থাকে টাটকা পদ্মার ইলিশ, আর আমরা মধ্যবিত্তরা খাই ঝাটকা

ইলিশ, সেটাকেই তৃপ্তি ভেবে নিই।

আমরা ব‌ইয়ের পাতায় দেখি কৃষক হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু বাস্তবে দেখি ফসলের মাঠে দাঁড়িয়ে আছে ক্লান্ত মানুষ, যার মুখে নেই হাসি, আছে কেবল চিন্তার রেখা। বৃষ্টি না হলে ফসল মরে যায়, আবার বেশি বৃষ্টি হলে সব ফসল নষ্ট 

হয়ে যায়। ব‌ই বলে বাংলা কৃষকের মুখে গান,

বাস্তব বলে তাঁর চোখে ঘুম নেই, বুক ভরা ঋণের 

বোঝা। বিছানায় শুয়ে ভাবতে থাকে। ঔই ফসলটা 

ভালো ধরলে। ভালো দাম দিয়ে বাজারে বেঁচতে 

পারবো। আর যদি ফসল নষ্ট হয়ে যায়। তাহলে আমি আমার পরিবার সহ না খেয়ে থাকব। 

আমরা দেখি ব‌ইতে শিশুরা সকালে স্কুলে যায়,

হাতে ব‌ই , মুখে হাসি। কিন্তু রাস্তায় দেখি শিশুদের 

কাঁধে ব‌ই নয়, পিঠে ইটের বোঝা, কেউ আবার ট্রাফিক সিগন্যালে ফুল বিক্রি করে। ব‌ইয়ের বাংলাদেশ তাঁরা টিকে থাকার লড়াই। ব‌ই বলে,

আমাদের দেশ স্বপ্নের দেশ, সম্ভাবনার দেশ।

আমি বলি হ্যাঁ, সেই সম্ভাবনা আছে, কিন্তু তাঁকে 

সত্যি করত হলে আমাদের বদলাতে হবে। প্রকৃতির 

প্রতি, মানুষের প্রতি, সত্যের প্রতি আমাদের ভালোবাসা ফিরিয়ে আনতে হবে।

বইয়ে পড়ি, আমাদের গ্রাম নাকি শান্তির নীড়। মাঠে দোলে সোনালি ধান, বাতাসে ভেসে আসে পাখির গান। কিন্তু বাস্তবে দেখি গ্রামের মানুষ শহরমুখী। চাষাবাদে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে অনেকেই। কারও জমি নদীতে ভেসে গেছে, কারও জমি বিক্রি হয়েছে টাকার প্রয়োজনে। 

যে গ্রাম একসময় ছিল আত্মনির্ভর, এখন সে শহরের উপর নির্ভরশীল। বইয়ে লেখা শান্তির গ্রাম যেন হারিয়ে গেছে মোবাইলের আলো আর বালুর ট্রাকের শব্দে। অনেকের ঘুম ভাঙতো ঢেঁকির শব্দ।

এখন সেই ঢেঁকি দেখাই যায় না। এখন মিলে 

ধান পিষতে দেয় মানুষ। ঢেঁকি এখন প্রাচীন হয়ে

গেছে।

বই বলে, আমাদের শহর আলোকিত, আধুনিক, সুন্দর। কিন্তু বাস্তবে দেখি ধোঁয়া আর যানজটে ভরা ক্লান্ত শহর। যেখানে শিশুরা খেলার মাঠ পায় না, বৃষ্টির পানিতে ডুবে যায় রাস্তাঘাট, আর আকাশ ঢাকা থাকে ধুলার ধোঁয়ায়। মানুষ ব্যস্ত, তাড়াহুড়োয় ভরা কেউ কার ও খোঁজ রাখে না। বইয়ের শহর আর বাস্তবের শহরের পার্থক্য দিনদিন আরও বেড়ে যাচ্ছে।

বইয়ে লেখা থাকে, বাংলাদেশ একটি দয়ালু ও অতিথিপরায়ণ দেশ। কিন্তু আজকাল সেই মানবিকতা যেন হারিয়ে যাচ্ছে। কেউ রাস্তায় অসহায় মানুষ দেখলে মুখ ফিরিয়ে নেয়। সমাজে বেড়েছে স্বার্থ আর প্রতিযোগিতা। অথচ এই দেশটা গড়ে উঠেছিল ভালোবাসা, সহানুভূতি আর একতার ভিত্তিতে।

তারপরও আমি আশা হারাতে চাই না। কারণ বইয়ের দেশ যতই স্বপ্নময় হোক, বাস্তবের দেশও একদিন সেই স্বপ্নকে ছুঁতে পারবে যদি আমরা সবাই চাই, যদি আমরা প্রকৃতি আর মানুষকে আবার ভালোবাসতে শিখি।

আমি বিশ্বাস করি, একদিন বইয়ের দেশ আর বাস্তবের দেশ এক হয়ে যাবে যেদিন প্রতিটি ভোরে

 দোয়েল সত্যিই গান গাইবে, আর প্রতিটি মানুষের মুখে ফিরবে হাসি।আমি বিশ্বাস করি, বইয়ের পাতায় লেখা সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ একদিন সত্যি হবে। 

মানুষ আবার প্রকৃতিকে ভালোবাসবে, নদী ফিরে পাবে জল, কৃষকের মুখে ফিরবে হাসি। শিশুরা বই হাতে স্কুলে যাবে, আর ভোরের আকাশে দোয়েলের গান শোনা যাবে সেদিন‌ই বাস্তবের দেশ হবে 

 সত্যিকারের বইয়ের দেশ।

What's Your Reaction?

Like Like 9
Dislike Dislike 0
Love Love 7
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 7
@zerin609 Zerin Jahan Disha Disha