ভুতের অ্যাক্সিডেন্ট! এক বিদেহী আত্মার ডায়েরি
কুয়াশা ঘেরা এক শীতের রাতে আধুনিক হওয়ার নেশায় এক ভূতের অদ্ভুত দুর্ঘটনা। হাসির ছলে এক বিদেহী আত্মার একাকীত্ব এবং হারানো মমতার এক অনন্য আখ্যান। পড়ুন এক লক্ষ্যভ্রষ্ট যাত্রার হৃদয়স্পর্শী ছোটগল্প।
শেষ রাত।
কুয়াশা।
চারপাশে শুধু ধূসরতার দেয়াল, যেন পৃথিবী নিজেই চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি এগোতে চায়, পারে না। কুয়াশা তাকে ধরে ফেলে, থামিয়ে দেয়।
এই কুয়াশার ভেতরেই আমি একা।
বিশ বছর আগে, এই মাঠের বুক চিরে ট্রেন ছুটে যেত। আমি তখন মানুষ ছিলাম। রক্ত-মাংসের মানুষ। আজ আমি ছায়া। বিদেহী এক আত্মা। মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ওই জীর্ণ গাছটাই আমার আশ্রয়। দিনের বেলা ওটা শুধু একটা গাছ। রাতে আমার ঘর।
নিঃসঙ্গতা যখন খুব গভীর হয়ে আসে, তখন আমি বাতাসের শব্দ শুনি। দূর থেকে মনে হয় কেউ ডাকছে।
“খোকা, ঘরে আয়।”
মায়ের গলা।
কিন্তু আমার তো আর কোনো ঘর নেই।
রাত ৩টা ১০ মিনিট।
এখনকার মানুষ হাঁটে না। তাদের সময় নেই। তারা যন্ত্রের পিঠে চড়ে উড়ে বেড়ায়। আলো জ্বলে, শব্দ হয়, তারপর মিলিয়ে যায়। আমি ভাবলাম, আমি কেন পিছিয়ে থাকব। আমার তো ডানা নেই, ঠিক। কিন্তু একটা ঝাড়ু আছে। লোকে বলে, ওটা ভূতেদের বাহন।
হাস্যকর কথা।
তবু আজ আমি সেটাতেই উঠব।
গতির নেশা আমাকেও ধরল। আমিও আধুনিক হব। আমি দেখাব, ভূতরাও সময়ের সাথে পাল্লা দিতে জানে।
রাত ৩টা ৪৫ মিনিট।
অপারেশন শুরু।
ঝাড়ুর ওপর সওয়ার হলাম। বাতাস কানে শোঁ শোঁ করে ঢুকছে। গতি বাড়ছে। মাঠের ধারের ঘাসগুলো পেছনে সরে যাচ্ছে, সবুজের একটা ঝাপসা দাগ হয়ে। আমি হাসছি। অশরীরী হাসি। অনেকদিন পর নিজেকে এমন হালকা লাগছে।
ঠিক তখনই কুয়াশা তার আসল রূপটা দেখাল।
সামনে একটা বিশাল ইলেকট্রিক পোল। না ভুল। ওটা পোল নয়। একটা মরা গাছ। কুয়াশার ভেতরে সবই এক হয়ে যায়। আমি ডানে মোড় নিতে চাইলাম। কিন্তু ঝাড়ুটা শুনল না।
ব্রেক ফেল।
হয়তো আমিই বেশি আশা করেছিলাম।
এক সেকেন্ড।
মাত্র এক সেকেন্ড।
ধড়াস।
সব অন্ধকার।
আমি টের পেলাম, আমার হ্যাটটা গাছের কোটরে ঢুকে গেছে। আলখাল্লাটা ডালের সঙ্গে পেঁচিয়ে আছে। আর জুতো পরা পা দুটো শূন্যে লাথি মারছে। বিশ বছর আগে একবার মরেছিলাম। আজ আবার যেন আমার অস্তিত্বটাই মরল।
একটা ভূত গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ঝুলে আছে। এর চেয়ে হাস্যকর দৃশ্য হয়তো এই মাঠে আর কোনোদিন কেউ দেখেনি।
নিজেকে ছাড়াতে চাইলাম। পারলাম না। ডানা ভাঙা পাখির মতো ঝুলে রইলাম। বাতাস বয়, আমি নড়ি। গাছ নড়ে, আমি নড়ি।
ভোর ৫টা ২০ মিনিট।
একটা গাড়ি থামল রাস্তার ধারে।
কাঁচের ওপাশে একজন মানুষ। সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখে ভয় নেই। আছে বিস্ময়। সে দেখছে, একটা ভূত গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে আটকে গেছে। আমি বুঝলাম, আধুনিক হতে গিয়ে আমি নিজেকেই তামাশা বানিয়েছি।
মানুষটা ছবি তুলছে।
কাল হয়তো এটা একটা নিউজ হবে। তা না হোক, অন্তত কেউ আমাকে নিয়ে পোস্ট করবে।
“অদ্ভুত ঘটনা, গাছে ঝুলে থাকা ভূত।”
ভোর ৫টা ৪৫ মিনিট।
কুয়াশা পাতলা হচ্ছে। আলোও আসছে। আমার কান্না পাচ্ছে। ঝুলে থাকা পা দুটো অসাড়। হঠাৎ মাঠের ওপাশ থেকে এক বৃদ্ধার ডাক।
চেনা কণ্ঠ।
মা।
নাকি মায়া।
একজন আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে কাঁদছে। সে জানে না আমি ভূত। সে শুধু জানে, আমি তার হারানো কেউ।
সব হাস্যকর চেষ্টা তখন যেনো অর্থহীন হয়ে গেল। গতির চেয়েও বড় সত্যি আছে। সেটা হলো মায়া। এই করুণ মায়া। মানুষের হাসির পাত্র হওয়ার চেয়ে এই নিস্তব্ধতা যেন অনেক বেশী শান্ত।
আমি এই গাছের সাথেই মিশে যেতে চাই।
কুয়াশার মতো।
শব্দহীন।
নামহীন।
অস্তিত্বহীন।
What's Your Reaction?
Like
1
Dislike
0
Love
1
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
1