পুরুষের চোখে নারীর সৌন্দর্য

জুলাই 6, 2025 - 20:09
নভেম্বর 19, 2025 - 17:41
 15  22
পুরুষের চোখে নারীর সৌন্দর্য

সমাজে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি কাঠামো তৈরি করে রেখেছে যেখানে নারীর মূল্যায়ন নির্ভর করে তার শরীরের উপর। এই দৃষ্টিভঙ্গি এতটাই চেপে বসে আছে যে আমরা বুঝতেই পারি না ভালোবাসা আর শরীরকে কিভাবে এক করে ফেলেছি। যেন ভালোবাসা বললেই বোঝায় দেহের প্রতি টান, আকর্ষণ, কামনা বা ব্যক্তিগত ভোগের অধিকার। অথচ মানুষ হিসেবে আমাদের আকর্ষণের মূল জায়গা হওয়া উচিত মনন, অনুভূতি, চেতনা এবং একে অপরের প্রতি মানবিক দায়িত্ব। কিন্তু সমাজ বারবার আমাদের মনে করিয়ে দেয় নারীর সৌন্দর্যই তার একমাত্র সম্পদ, পুরুষের প্রশংসা পাওয়াটাই যেন তার সফলতা।

এই ভুল ধারণার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো খুব জরুরি, কারণ দেহকেন্দ্রিক ভালোবাসা কখনোই স্থায়ী হয় না। যে ভালোবাসা শুধু শরীর দেখে শুরু হয়, তা শরীর বদলে গেলে ভেঙেও যায়। আর তাই আজকের সমাজে সম্পর্কগুলো কেবল ভঙ্গুরই নয়, অনেক ক্ষেত্রে অন্যায্যও হয়ে উঠেছে। পুরুষেরা সম্পর্কের ভিতরে একটি বিশেষ সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে, যেখানে তাদের অসম্পূর্ণতা, অবহেলা, অগোছালো অবস্থা পর্যন্ত ক্ষমা পেয়ে যায়, কিন্তু নারীদের একই জিনিসের জন্য প্রশ্নবিদ্ধ হতে হয়।

ঠিক এখানেই তোমার ওই কথাগুলো প্রবল সত্য হয়ে ওঠে। পুরুষজাতি শুধু ভোগ করতে চায়, ভালো কিন্তু কেউই বাসেনা। ওটা একটি মোহ, শরীরের টান। মানুষ শুধু চেতনা। তুমি হলে মানুষ। নিজেকে কেন নারী মনে করো। নারী তো অনেক পরের বিষয়, প্রথমে তুমি মানুষ। নারীর ঘামের গন্ধ, চোখের নিচের কালি, মোটা পেট, বেটে শরীর, কালো চামড়া এসব যেনো পুরুষের কাছে অসহ্য। অথচ পুরুষরা সারাদিন পর ঘামে ভেজা, দুর্গন্ধযুক্ত শরীর, কালো, বেটে, মোটা, এমনকি মুখে সিগারেটের গন্ধ নিয়ে বাড়ি ফিরলেও স্ত্রীরা সযত্নে গ্রহণ করে তাদের।

এই অংশটুকু শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার নয়, বরং গবেষণার আলোতেও খুব বাস্তব। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, আমরা এখনো নারীর শরীরকে একটি পণ্য হিসেবে দেখি। বিজ্ঞাপনে, গানে, নাটকে, কবিতায়, এমনকি দৈনন্দিন কথোপকথনে নারীর সৌন্দর্যকে একটি মানদণ্ডে পরিণত করা হয়েছে। অথচ পুরুষ সৌন্দর্য নিয়ে সমাজে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। পুরুষ চাইলে যেভাবে খুশি থাকতে পারে, সমাজ তাকে মেনে নেয়। কিন্তু নারী যদি নিজের প্রাকৃতিক রূপ নিয়ে দাঁড়ায়, তাকে কম আকর্ষণীয় হিসেবে বিচার করা হয়। এই বিচার নারীর আত্মবিশ্বাসকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তাকে নিজের মূল্য নিয়ে সন্দিহান করে তোলে এবং তাকে সমাজের ভোগের সামগ্রী মনে করতে বাধ্য করে।

এই দৃষ্টিভঙ্গির সবচেয়ে ভয়ানক দিক হলো, এটি সম্পর্কের ভেতরে অসমতা তৈরি করে। একজন নারী যখন স্বামীর জন্য সারাদিন সেবা, যত্ন, দায়িত্ব সবকিছু আন্তরিকভাবে পালন করে, তখন তার কাছ থেকেও অন্তত সম্মান এবং সমান মানবিকতা পাওয়াটা কি খুব বেশি দাবি। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, পুরুষেরা নিজেদের দায়িত্বের জায়গায় ব্যর্থ হলেও নারীরা সেগুলোই প্রতিদিন সফলভাবে করে যায়। তারপরও নারীকে দেহ দিয়ে বিচার করা হয়। নারীর বয়স বাড়লে বা শরীর ভারী হলে বলা হয় নারী আকর্ষণ হারিয়েছে, অথচ পুরুষের একই পরিবর্তনে কেউ মন্তব্যও করে না। এই অসাম্যই নারীর ভেতরে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক আঘাতের সৃষ্টি করে।

ভালোবাসার ক্ষেত্রে এই দেহকেন্দ্রিকতা আরও বড় ক্ষতি করে। যে ভালোবাসা চেতনার নয়, শুধু দেহের, তা কখনো গভীর হতে পারে না। কারণ শরীর ক্ষয় হয়, পরিবর্তন হয়, বয়স বাড়ে, চুল সাদা হয়, ত্বকে ভাঁজ পড়ে। যদি ভালোবাসা এই পরিবর্তনের সাথে পাল্টে যায়, তবে সেটি ছিল শরীরের প্রতি মোহ, ভালোবাসা নয়। তাই সত্যিকারের সম্পর্কগুলো টিকে থাকে তখনই, যখন দুইজন মানুষ তাদের ভেতরের মানুষটিকে দেখতে শেখে। বাহিরের রূপ নয়, ভেতরের শক্তি, বোধ, আচরণ এবং মানবিকতাই সম্পর্কের মূল ভিত্তি।

এটাই তো সত্য যে কোনো কবিতায় খুব কমই দেখা যায় নারীর জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা, বোধশক্তির প্রশংসা। কবিতায় নারীর মুখ, চোখ, চুল, ঠোঁট, সৌন্দর্যের বর্ণনা আছে, কিন্তু নারীর চেতনার জন্য বিস্ময় প্রকাশ খুবই কম। সমাজ নারীর বুদ্ধিমত্তাকে তেমন মূল্য দেয় না। অথচ একজন নারীর বোধশক্তি পরিবারকে টিকিয়ে রাখে, সংসারকে পরিচালনা করে এবং সমাজে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেয়। তবুও তাকে দেহ দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা হয়, যেন তার জীবনের সাফল্য পুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারলেই সম্পূর্ণ হয়।

এই একতরফা কাঠামো নারীদের আত্মমর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করে। একজন নারী শিক্ষিত হলে বলা হয় সে পরিবার ভাঙে, আবার অশিক্ষিত হলে বলা হয় তার কোনো মূল্য নেই। একজন নারী কাজ করলে তাকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়, আর ঘরে থাকলে বলা হয় সে সমাজে অবদান রাখছে না। মা না হলে তাকে অসম্পূর্ণ বলা হয়, আর মা হলে শরীরের পরিবর্তনের কারণে আবার সমালোচিত হতে হয়। এই দ্বিমুখী সমাজ কোনো অবস্থানেই নারীকে স্বীকৃতি দিতে চায় না। তখন নারীরই নিজের মূল্য নিজেকে নির্ধারণ করতে হয়।

আজকের সমাজে বিবাহবিচ্ছেদের হার বেড়েছে, এবং অনেকেই বলছে শিক্ষিত নারীদের কারণে এমন হচ্ছে। আসলে সত্যটা উল্টো। শিক্ষিত নারী অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখে, নিজের মর্যাদা নিয়ে সচেতন থাকে, ভোগের বস্তু হতে রাজি থাকে না। আগে নারীরা অনেক কিছু মেনে নিত কারণ তাদের সামনে বিকল্প ছিল না। কিন্তু এখন নারীরা জানে তাদের জীবনের মূল্য তাদের শরীর নয়, তাদের চেতনা। তাই তারা আর অসম্মানকে সম্পর্কের নামে বহন করতে চায় না। এই পরিবর্তন সমাজের জন্য অস্বস্তিকর হলেও এটি প্রয়োজনীয় এবং ইতিবাচক।

এখন প্রশ্ন হলো, কেনো নারীরাই নিজেদের পুতুলের মতো সাজিয়ে রাখবে শুধু পুরুষের সন্তুষ্টির জন্য। সম্পর্ক যখন দুইজন মানুষের, তখন দায়িত্বও দুইজনের। নারীরা যেমন ভালোবাসা পেতে চায়, পুরুষেরাও তেমনই পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, সম্মান, যত্ন এবং মানবিকতা দেখাতে পারে। নারীরা সাজবে, পুরুষ সাজবে না, নারী নিখুঁত থাকবে, পুরুষ যেভাবে খুশি থাকবে, এই ধারণা শুধু পুরোনো নয়, অন্যায্যও।

অথচ বাস্তবতা হলো সুন্দর সম্পর্ক গড়ে ওঠে তখনই, যখন দুইজন মানুষ একে অপরকে সাহায্য করে এবং একে অপরের অসম্পূর্ণতাকে সুন্দরভাবে গ্রহণ করে। এটি তখনই সম্ভব যখন আমরা নারীকে মানুষ হিসেবে দেখব, দেহ হিসেবে নয়। একজন নারীর চামড়া কালো হতে পারে, চোখে ক্লান্তির ছাপ থাকতে পারে, শরীর মোটা হতে পারে, চুল অগোছালো হতে পারে। কিন্তু তার ভেতরের মানুষটি ঠিক ততটাই শক্তিশালী, ততটাই মূল্যবান এবং ততটাই ভালোবাসার যোগ্য।

তাই শেষ কথাটা খুবই স্পষ্ট। তুমি প্রথমে মানুষ। তোমার পরিচয় তোমার চেতনা, তোমার মূল্য তোমার বোধশক্তি, তোমার মানবিকতা। শরীরের সৌন্দর্য সময়ের সাথে বদলাবে, কিন্তু তোমার ভেতরের আলোই তোমাকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে তৈরি করবে। যে ভালোবাসা এই আলোকে দেখতে পারে, সেটাই আসল ভালোবাসা। আর যে ভালোবাসা শুধু শরীর দেখে বিচার করে, সেটি ছিল শুধু মোহ, কখনোই সম্পর্ক ছিল না। একজন মানুষের প্রকৃত মূল্য তার হৃদয়ে, তার ভাবনায়, তার মানবিকতায়।

মানুষ হওয়াই সবচেয়ে বড় পরিচয়। সেই পরিচয়কে বুঝতে পারা এবং গ্রহণ করাই সত্যিকারের মুক্তি।

What's Your Reaction?

Like Like 2
Dislike Dislike 0
Love Love 1
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 1
lizacamelia lizacamelia