যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য যুদ্ধ - বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জের দ্বৈরথ

যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য যুদ্ধ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সুযোগ ও ঝুঁকি উভয়ই তৈরি করেছে। একদিকে, মার্কিন শুল্কের কারণে চীনা পণ্যের বাজার হারানোর ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (RMG) খাতে নতুন অর্ডার স্থানান্তরিত হচ্ছে এবং রপ্তানি আয় বাড়ছে। অন্যদিকে, শিল্পের কাঁচামালের জন্য চীনের ওপর ব্যাপক নির্ভরশীলতা এবং আমেরিকান 'ডাবল ট্যারিফ' আরোপের শঙ্কা বাংলাদেশের রপ্তানিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। এই পরিস্থিতিতে, কাঁচামালের বিকল্প উৎস তৈরি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) আকর্ষণের মাধ্যমে বাংলাদেশ এই ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতকে প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার সুযোগে পরিণত করতে পারে।

ডিসেম্বর 15, 2025 - 01:26
 0  7
যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য যুদ্ধ  - বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জের দ্বৈরথ

বিশ্বের শীর্ষ দুই অর্থনৈতিক শক্তি, যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে চলমান বাণিজ্য দ্বন্দ্ব বা 'ট্রেড ওয়ার' বিশ্ব অর্থনীতিতে এক গভীর অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। তবে এই ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এক বিশেষ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, যেখানে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ একে অপরের মুখোমুখি।

রপ্তানি খাতে সুযোগ - পোশাক শিল্পের সম্ভাবনা

বাণিজ্য যুদ্ধের সবচেয়ে স্পষ্ট সুযোগটি এসেছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (RMG) খাতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন চীনা পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক (Tariff) আরোপ করে, তখন আমেরিকান ক্রেতারা চীন থেকে পণ্য আমদানি কমিয়ে বিকল্প উৎসের সন্ধান করেন। অপেক্ষাকৃত কম শুল্ক এবং প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদন ব্যয়ের কারণে বাংলাদেশ এই ক্ষেত্রে একটি প্রধান গন্তব্য হয়ে ওঠে। এর ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে নতুন অর্ডার স্থানান্তর (Order Diversion) হয়েছে। চীনা পোশাকের দাম বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বাজারের হিস্যা (Market Share) বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

আমদানি খাতে ঝুঁকি - সরবরাহ চেইন এবং শুল্কের চাপ

যেখানে রপ্তানি একটি সুযোগ, সেখানে আমদানি খাত বাংলাদেশের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। বাংলাদেশ শিল্প-কারখানার কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য এবং যন্ত্রপাতির জন্য চীন থেকে সর্বোচ্চ পণ্য আমদানি করে। বর্তমানে এমন একটি শঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, কোনো পণ্য উৎপাদনে যদি চীনা কাঁচামালের ব্যবহার বেশি থাকে, তবে সেই পণ্যটি যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উপরও অতিরিক্ত শুল্ক (যেমন: ৩৫% বা তার বেশি) আরোপিত হতে পারে। এই 'ডাবল ট্যারিফ' (Double Tariff) বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্রে পণ্যকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলছে, বিশেষ করে ওভেন পোশাকের ক্ষেত্রে। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের উপর চীন থেকে আমদানি কমানোর জন্য ভূ-রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

বিনিয়োগ এবং শিল্প স্থানান্তরের সম্ভাবনা

বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে চীন থেকে বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানি তাদের উৎপাদন কেন্দ্র সরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছে। এই শিল্প স্থানান্তরের (Relocation) সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান এবং তাইওয়ানের মতো দেশ থেকে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) আকর্ষণ করতে পারে। সস্তা শ্রম এবং তুলনামূলক সুবিধাজনক বাজারের কারণে বাংলাদেশ চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য একটি বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র (Alternative Production Hub) হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এরই মধ্যে চীনা বিনিয়োগে বেশ কিছু নতুন শিল্প প্রকল্প শুরু হওয়ার খবর এসেছে।

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব

দীর্ঘমেয়াদে বাণিজ্য যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ধীর করে দেয় এবং বৈশ্বিক চাহিদা কমিয়ে আনে। বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমলে আমেরিকান ও ইউরোপীয় বাজারে পণ্যের সামগ্রিক চাহিদা কমে যেতে পারে, যা বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধির গতিকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করবে। এছাড়া, আমদানি পণ্যের দাম বাড়লে এবং টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বাড়লে (মূল্যস্ফীতি) দেশে আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতি (Imported Inflation) সৃষ্টি হতে পারে।

বাংলাদেশের করণীয় - চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৌশল

এই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য যুদ্ধ থেকে পূর্ণ সুবিধা নিতে এবং ঝুঁকিগুলো কমাতে বাংলাদেশকে সুদূরপ্রসারী কৌশল গ্রহণ করতে হবে:

  • কাঁচামালের বিকল্প উৎস: আমদানিতে চীনা নির্ভরশীলতা কমাতে ভারত, ভিয়েতনাম বা ইউরোপের মতো দেশগুলো থেকে কাঁচামাল আমদানির বিকল্প উৎস তৈরি করা।
  • উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি: অবকাঠামোগত দুর্বলতা (বন্দর, বিদ্যুৎ) এবং প্রযুক্তির অভাব দূর করে শিল্পের উৎপাদনশীলতা (Productivity) ও সক্ষমতা বাড়ানো।
  • কূটনৈতিক আলোচনা: যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য শুল্ক এবং উৎপত্তির নিয়ম (Rules of Origin - RoO) নিয়ে নিবিড় ও ফলপ্রসূ আলোচনা চালিয়ে যাওয়া।

অর্থনৈতিক অঞ্চল: দ্রুত চীনা বিনিয়োগের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ) স্থাপন করে সুযোগগুলো কাজে লাগানো।

যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য যুদ্ধ বাংলাদেশের সামনে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত এনে দিয়েছে। এটি কেবল রপ্তানি বৃদ্ধির সুযোগ নয়, বরং আমাদের শিল্পকে পশ্চাৎপদ সংযোগে (Backward Linkage) শক্তিশালী করা এবং চীনা কাঁচামালের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব সরবরাহ চেইন তৈরি করার একটি তাগিদও দিয়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক অর্থনীতির এই টানাপোড়েনে টিকে থাকার পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধির পথে অনেকটাই এগিয়ে যেতে পারবে।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0
Niloy66 MD Sabbir Hossen