লজিকের আয়নায় মানুষের প্রতিবিম্ব: সৃষ্টিশীলতা বনাম শৃঙ্খলা

শৃঙ্খলা মানুষকে গড়ে তোলে, সৃষ্টিশীলতা মানুষকে মুক্ত করে।

জানুয়ারী 22, 2026 - 21:29
জানুয়ারী 24, 2026 - 22:35
 0  11
লজিকের আয়নায় মানুষের প্রতিবিম্ব: সৃষ্টিশীলতা বনাম শৃঙ্খলা
লজিকের আয়নায় প্রতিফলিত মানুষের মন—শৃঙ্খলার মধ্যে সৃষ্টিশীলতার চাঞ্চল্য।

লজিকের আয়নায় মানুষের প্রতিবিম্ব: সৃষ্টিশীলতা বনাম শৃঙ্খলা

খাদিজা আরুশি আরু

সকালবেলা মানুষের ঘুম ভাঙে শুধু অ্যালার্মের শব্দে নয়, বরং একরাশ চিন্তায়। আজ কী খাওয়া হবে, কোন রাস্তায় গেলে কাজে দেরি হবে না, কার সঙ্গে কীভাবে কথা বললে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে—এই ক্ষুদ্র অথচ জরুরি প্রশ্ন নিয়েই দিনের শুরু হয়। চাইলে এসব প্রশ্নের উত্তর সময় মেপে, নিখুঁত যুক্তির সাহায্যে একটি যন্ত্রও দিতে পারে। তবু মানুষ সেই যন্ত্রের হাতে নিজের সকালটা তুলে দিতে চায় না। কারণ সকাল কেবল কাজের সূচনা নয়, এটি অনুভবেরও সূচনা।

মানুষের চিন্তা কেবল যুক্তির সিঁড়ি বেয়ে ওঠে না; এতে আছে আবেগের ঢেউ, স্মৃতির ছায়া, অদ্ভুত এক স্বপ্নজাল বোনার জাদুকাঠি। যন্ত্র হিসাব করে, মানুষ অনুভব করে—এই মৌলিক পার্থক্য আমরা প্রায়ই ভুলে যাওয়ার ভান করি।

একজন প্রকৌশলী যখন নতুন সেতুর নকশা আঁকেন, তখন তার টেবিলে শুধু কংক্রিটের হিসাব থাকে না। চোখের সামনে ভেসে ওঠে সকালের ব্যস্ত মানুষ, স্কুলফেরত শিশু, হঠাৎ বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া ক্লান্ত শহর। সেতুটি কেবল দাঁড়িয়ে থাকবে—এটাই যথেষ্ট নয়; সে ভাবতে থাকে, সেতুটি মানুষকে কেমন অনুভূতি দেবে। অথচ যন্ত্র সেতু বানাতে পারলেও শহরের দীর্ঘশ্বাস বুঝতে পারে না।

রাতের অন্ধকারে চিত্রশিল্পী ক্যানভাসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। সে রঙ-তুলির নিয়ম জানে, তবুও বারংবার তা ভাঙার চেষ্টা করে। ব্রাশের প্রতিটি আঁচড়ে জমে ওঠে না বলা কথা, চাপা কষ্ট, হঠাৎ পাওয়া আনন্দ। পাশে দাঁড়ানো কেউ হয়তো ছবিটা পুরোপুরি বুঝতে না পারলেও, অনুভব করতে পারে। যন্ত্র নিখুঁত ছবি আঁকতে পারে, কিন্তু সেই অদ্ভুত অনুভূতির ফাঁক পূরণ করার ক্ষমতা তার নেই।

মানুষের মস্তিষ্কে যুক্তি আর সৃজনশীলতার টানাপোড়েন চিরন্তন। বিজ্ঞানীরা বলেন—একদিকে বিশ্লেষণ, অন্যদিকে কল্পনা। এই দুইয়ের মেলবন্ধনে মানুষ তৈরি হয়।

একজন লেখক গল্প লিখতে বসে। সে পুরোপুরি হিসাব করে না, আবার পুরো অযৌক্তিকও হয় না। চরিত্রের আবেগ আর কাহিনীর গঠন একত্রে বয়ে যায়। যন্ত্র সেখানে কেবল কাঠামো দেখে, ভেতরের কম্পন নয়।

একজন ডাক্তার রোগীর রিপোর্ট পড়ার পাশাপাশি তার চোখের দিকে তাকায়, মানসিক অবস্থা বোঝার চেষ্টা করে। চোখের ক্লান্তি, কণ্ঠের দ্বিধা, নীরবতার ভাষা—সব মিলিয়ে সে সিদ্ধান্ত নেয় বা জানায়। এটি কেবল চিকিৎসা নয়, মানবিক সম্পর্কেরও অংশ। যন্ত্র উপসর্গ মিলিয়ে দিতে পারে, কিন্তু রোগীর ভয় অনুভব করতে পারে না।

লাইব্রেরির কোণে বসা এক ছাত্র বই পড়তে পড়তে হঠাৎ থেমে যায়। কোনো চরিত্রের ব্যথা তাকে নিজের জীবনের কথা মনে করিয়ে দেয়। সে কেবল পড়ছে না, ভেতরে ভেতরে বদলে যাচ্ছে। এই বদল হিসাবের বাইরে। যন্ত্র কেবল তথ্য দেয়, মানুষের মন শব্দের ভেতরের অর্থ খুঁজে নেয়।

বৃষ্টির মধ্যে খেলা করা শিশুর দিকে তাকালে বোঝা যায়—সে ভিজছে না, সে স্মৃতির পাতায় গল্প জমাচ্ছে। কাদামাটি, পানি আর আকাশ মিলিয়ে তার কল্পনায় তৈরি হচ্ছে এক অনন্য পৃথিবী। এই স্বতঃস্ফূর্ত সৃষ্টিশীলতা কোনো প্রোগ্রামে ধরা পড়ে না।

এক শহর পরিকল্পনাকারী কাগজে দাগ কাটে, মানচিত্র দেখে, আর ভেবে দেখেন মানুষ কোথায় হাঁটবে, কোথায় থামবে, কোথায় নিঃশ্বাস নেবে। যন্ত্র পরিকল্পনা করতে পারে, কিন্তু শহরের স্মৃতি বহন করতে পারে না।

একজন মা সন্তানের প্রথম হাঁটা দেখে আবেগে আপ্লুত হন; চোখের কোণে আনন্দের জল জমে। এই মুহূর্ত কোনো ডাটাবেসে রাখা যায় না। চোখের জল, হাসি, গর্ব—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক আজীবনের স্মৃতি। যন্ত্র সেখানে নির্বাক।

এক বৃদ্ধা পুরোনো ডায়েরি খুলে বসে। প্রতিটি পাতার শব্দ কেবল লেখা নয়, তা সময়ের ছাপ। পড়তে পড়তে সে নিজের অতীতের সোনালী পথ দিয়ে হেঁটে যায়। যন্ত্র স্মৃতি সংরক্ষণ করতে পারে, স্মৃতিতে বাঁচতে পারে না, অনুভব করতে পারে না।

এক সাংবাদিক খবর লিখে। সে জানে, তথ্য প্রদানই তার একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। ঘটনার পেছনে মানুষের ভয়, ক্ষোভ, আশা—সবই তার তথ্যকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। যন্ত্র সংবাদ বানাতে পারে, কিন্তু সমাজের স্পন্দন ধরতে পারে না।

মানুষ গল্পে বাঁচে। যন্ত্র শর্তে। মানুষ ভুল করে, প্রশ্ন তোলে, স্বপ্ন দেখে। যন্ত্র নিখুঁত উত্তর দেয়, কিন্তু কেন প্রশ্নটা উঠলো—তা জানে না। শব্দ, অনুভূতি আর সংযোগ—এই তিনটি উপাদান মানুষকে যন্ত্রের থেকে আলাদা করে রেখেছে। ইতিহাস দেখিয়েছে, সভ্যতার অগ্রগতি এসেছে এই সংমিশ্রণ থেকেই।

এক তরুণী তার বন্ধুকে বলে, “এই বইটা পড়ে আমি ভীষণ কেঁদেছি।” এই কান্না কোনো অ্যালগরিদমে ধরা পড়ে না। এক শিল্পী নাচে গল্প বলে, এক লেখক নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেয়। এই সব মিলিয়েই মানুষ।

অবশেষে বোঝা যায়, যন্ত্র হিসাব করে, মানুষ অনুভব করে। যন্ত্র শিখে নেয়, মানুষ বেঁচে থাকে। মানুষ গল্পে বাঁচে, যন্ত্র শর্তে। এই পার্থক্যটাই আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0
Khadiza Arushi Aru সখের বশে লেখালেখি শুরু করলেও বর্তমানে তা আর সখ নেই, নেশা হয়ে গেছে। নিজের অনুভূতি, চিন্তাধারা, অভিজ্ঞতাকে অন্যের দ্বারপ্রান্তে সুকৌশলে পৌঁছে দেয়াই হয়তো আমার লিখে যাবার অনুপ্রেরণা! আমার প্রথম সম্পাদিত বই, "নবধারা জল" এবং প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস, "সূর্যপ্রভা"