রক্তাক্ত প্রতিশোধ

একটা রহস্যময় খুন, সন্দেহের তীর জাকিয়ার দিকে। সে কি সত্যিই খুনী? নাকি তাকে তুর্পের তাস বানিয়ে আসলে খেলা খেলছে অন্য কেউ?

জানুয়ারী 24, 2026 - 22:09
জানুয়ারী 24, 2026 - 22:44
 0  5
রক্তাক্ত প্রতিশোধ
একটা রহস্যময় খুন, সন্দেহের তীর জাকিয়ার দিকে। সে কি সত্যিই খুনী? নাকি তাকে তুর্পের তাস বানিয়ে আসলে খেলা খেলছে অন্য কেউ?

রক্তাক্ত প্রতিশোধ

খাদিজা আরুশি আরু

পর্বঃ ০২


এক অদ্ভুত দম বন্ধ করা মুহূর্ত পার করছে জাকিয়া, কি থেকে কি হয়ে গেলো বুঝতে পারছে না সে। পাথর পেচানো কাগজটা খুলতে ভয় পাচ্ছে সে, তবুও কাঁপা হাতে কাগজটা খুলেই আঁতকে উঠলো। একটা কাগজে রক্তাক্ত হাতের ছাপ আর তার পাশে টাইপিং স্টাইলে লেখা, "পাপ কখনো পিছু ছাড়ে না, তুমি পাপী"! 

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবারও এগিয়ে এসে কাগজটা হাতে তুলে নিলো জাকিয়া, লেখাটা পড়ে বোঝার উপায় নেই কে লিখেছে... কোনো হ্যান্ড টাইপোগ্রাফি এক্সপার্ট হবে। কিন্তু কে সে! যে জাকিয়ার করা পাপের খবর রাখে... কই, জাকিয়া তো তার অতীতে করা চরম অপরাদের কথা কাউকে জানায় নি, সে তো পরিস্থিতি থেকে পালিয়ে বেঁচেছিলো! তবে কি সে ছাড়াও অন্য কেউ সেদিন সত্যটা জানতো! কিন্তু কে?

নাসিমা সকালেই কাজ ছেড়ে চলে গেছে, সে বলে গেছে সে নাকি কোনো খুনীর বাসায় কাজ করতে পারবে না। ঐ ঘটনা ঘটার পর একটা সপ্তাহ পার হয়ে গেছে, এপার্টমেন্টের অন্য ফ্লাটের লোকগুলোও কেমন যেনো তাকে ইদানিং ভয় পায়... তারা তাকে যথাসম্ভব এড়িয়ে চলে। সেদিনের পর সেই এস.আই. লোকটাও আর আসে নি। তবে জাকিয়া খোঁজ নিয়ে জেনেছে তাদের তদন্ত চলছে এবং বিভিন্নভাবে এ এপার্টমেন্টের কয়েকজনের সঙ্গে পুলিশ আলাদাভাবে কথা বলেছে।

প্রত্যেকের বয়ানের ভিত্তিতেই তদন্ত এগিয়ে চলছে... কিন্তু জাকিয়া আজ অফিস থেকে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে কেউ জানলার কাচ বরাবর একটা পাথর ছুঁড়ে মেরেছে। প্রথম প্রথম কাজটাকে কোনো বাচ্চার কাজ মনে করে এড়িয়ে গেলেও ঘর পরিষ্কার করার সময় জাকিয়া লক্ষ্য করলো, সেটা সামান্য পাথর নয় বরং একটা চিঠি কিংবা হুমকি। কাগজটা খোলার পর জাকিয়ার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সে চায় না তার অতীতে করা ভুলের কোনো সূত্রও পুলিশ পাক। হাজার হোক, সে বার সে যা করেছে ভালোবেসে করেছে। যদিও সে আজও ওই দিনের জন্য অনুতাপে অনুতপ্ত!

নাসিমা কাজ ছেড়ে দিয়েছে বিধায় রাতের রান্না হয় নি, জাকিয়ার শরীরে রান্না করার মতো বিন্দুমাত্র শক্তি অবশিষ্ট নেই। তাই না খেয়েই নিস্তেজ শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দিলো জাকিয়া। কিন্তু তার কপালে খুব সম্ভবত শান্তির ঘুম নেই, তাইতো ঘুমোনোর পর হঠাৎ আবারও জানলার কাঁচে শব্দ হলো... কাঁচ ভাঙ্গার শব্দে জাকিয়া লাফ দিয়ে বিছানায় বসে গেলো, আর সে মুহুর্তে সে দেখলো তার বিছানার কাছে বাচ্চাটা দাঁড়িয়ে আছে। বাচ্চাটা তার দিকে তাকিয়ে বলছে,

-আমাকে কেনো মারলে তুমি? একটা গ্লাস ভেঙ্গেছি বলে? একটা গ্লাসের মূল্য আমার জীবনের থেকে বেশি হয়ে গেলো মিষ্টি আপু?

জাকিয়া মুহূর্তে চোখ বন্ধ করে আবার চোখ খুললো... চোখ খুলে সামনে কাউকে না দেখতে পেয়ে তার হাত পা থরথর করে কাঁপতে লাগলো, ঠিক তারপরই তার ঘরময় এক ভয়ঙ্কর হাসির শব্দ ছড়িয়ে পড়লো। জাকিয়া কানে হাত দিয়ে চিৎকার করে বলতে লাগলো, "কেনো এসেছো তুমি? কেনো? আমি তোমাকে মারিনি, তোমার মিষ্টি আপু তোমাকে মারার কথা ভাবতেও পারে না"! চিৎকার করতে করতেই একসময় নেতিয়ে পড়লো জাকিয়া, বিছানার মধ্যখানে যবথব হয়ে শুয়ে রইলো চুপচাপ... অন্ধকারাচ্ছন্ন একলা ঘরে ঘড়ির টিকটিক শব্দে ভয়ে জাকিয়ার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছিলো কিন্তু উঠে পানি খাওয়ার মতো শক্তিটাও সে পেলো না।


এস.আই. তন্ময় গত তিন ঘন্টা যাবত বারংবার এপার্টমেন্টের দারোয়ারের বয়ান শুনছে। বয়ানটা এরকম, "আফারে তো ভালাই জানতাম, আইজ পর্যন্ত কোনো খারাপ কাম তো করতে দেখি নাই। সবসময় তো কত্তো সুন্দর কইরা কতা কইতো। প্রতি সপ্তাহেই রাস্তার বাচ্চাগোরে আইনা খাওয়াইতো, আমারে আর হের কামের বেটি নাসিমারেও খাইতে দিতো ভালা মন্দ রান্দলেই। যেইদিন ওই বাইচ্চা মাইয়াটা মরলো তার আগের দিনও হেয় কতোগুলা বাচ্চারে নিজের লগে কইরা ঘরে লইয়া গেছে। বাচ্চারা খাইয়া চইলাও গেছে কয়ের ঘন্টা পর... কিন্তু ওই বাচ্চা বাইর হইছে কি না কইতে পারুম না। কারন আমি খেয়াল করি নাই"। 

এতোটুকু বলে থেমেছিলো শফিক। তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হলো, "ভোরের আগে বাচ্চাটাকে মারা হয়েছে সম্ভবত, আপনি কোথায় ছিলেন তখন"? উত্তরে সে অতি সাধারনভাবে বলেছে, "আমি গরীব মানুষ, আল্লারে বিশ্বাস করি মন থেইকা। তো আমি প্রতিদিনই ফজরের আযান হইলে নামাজ পড়তে মসজিদে যাই, হেইদিনও গেছিলাম। এ সময় ছাড়া একবারও আমি গেটের সামনে থেকে সরি নাই, বিশ্বাস করেন স্যার"। 

এতোটুকু কথার পরই শফিককে যেতে দেয়া হয়েছিলো। এ কথাগুলোর পর তন্ময় বারবার রেকডিংটা শুনছে, কিন্তু কেইসের কোনো কূল কিনারা খুঁজে পাচ্ছে না। জাকিয়া নামের মেয়েটা বেশ কনফিডেন্ট, বলতে গেলে ওভার কনফিডেন্ট। তার সম্পর্কে অফিস বা এপার্টমেন্টের লোকেরাও এর আগে কখনো খারাপ কোনো বিষয় লক্ষ্য করে নি। সবার বয়ান অনুযায়ী মেয়েটা বড্ড শান্তিপ্রিয়, কখনো কারও সঙ্গে ঝগড়া অবধি করে না।

তন্ময় রেকডিংটা অফ করে দরজার দিকে তাকালো, বাইরে কুঞ্জর গলার স্বর শোনা যাচ্ছে তারমানে নতুন কোনো তথ্য সামনে আসলেও আসতে পারে। 

আরও দশ মিনিট পর কুঞ্জ বেশ চিন্তিত ভঙ্গিতে তন্ময়ের ঘরে এলো। তন্ময়ের চোখদুটো কুঞ্জর কপালের কুঞ্চিত রেখা দেখেই খুশিতে চকচক করে উঠলো। সে বেশ উৎসাহিত হয়ে বললো,

-সো ইয়াং ম্যান, আপডেট প্লিজ...

কুঞ্জ কোনো প্রকার ভূমিকা ছাড়াই বললো,

-স্যার আই থিংক, সি ইস দ্যা রিয়েল মার্ডারার। 

তন্ময়ের চোখে অবিশ্বাসের ছাপ, এই কুঞ্জই কিছুদিন আগে মেয়েটাকে খুনী বলতে চাইছিলো না। তার আগ্রহ বাড়লো, মুখটা গম্ভীর করে চিবুকের নিচে হাতদুটো রেখে বললো,

-আমাদের কাজ তদন্ত করে সাক্ষ্য এবং প্রমাণ কোর্টে জমা দেয়া, কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা নয়। তা তোমার কেনো মনে হলো যে মেয়েটাই খুনী?
-স্যার, মেয়েটার বাড়ির লোক মেয়েটার মুখ অবধি দেখতে চায় না! 
-কেনো তা জানতে চাও নি?
-চেয়েছি স্যার, আর একটা অদ্ভুত রহস্যময় তথ্য সামনে এসেছে।
-কি সেটা?
-মেয়েটা বাড়ির অনেক আদরের ছিলো, সে বার তার বিয়ের তোড়জোড় চলছিলো বাড়িতে, বলতে গেলে সব আয়োজন শেষ। কিন্তু হঠাৎ বিয়ের আগের দিন মেয়েটা বিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় কি জানেন স্যার?
-কি?
-মেয়েটার যার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিলো তার সঙ্গে তার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন তিন বছরের প্রণয়ের সম্পর্ক ছিলো। আর শুধু তা'ই নয়, ছেলেটা এই মেয়েকে পাগলের মতো ভালোবাসতো।

তন্ময় টেবিলের উপর পড়ে থাকা পেপার ওয়েট ঘুরাতে ঘুরাতে গম্ভীরভাবে বললো,

-স্ট্রেঞ্জ! একজনকে ভালোবাসলো অথচ বিয়ের আগের দিন পালিয়ে গেলো! আচ্ছা তারপর কি মিস জাকিয়া আর ও বাড়িতে ফিরে যান নি?
-পালিয়ে আসার এক সপ্তাহ পর উনি গিয়েছিলো কিন্তু ওনার পরিবার ওনাকে বাড়িতে ঢুকতে দেয় নি। 
-অদ্ভুত, একজন একা মেয়ে এভাবে কি করে থাকছে? মানে সে এতো বড় এপার্টমেন্ট ভাড়া কি করে জোগাচ্ছে!
-স্যার, এপার্টমেন্টটা ওনার নামে কেনা, উনি ভাড়া থাকছেন না।
-হোয়াট?
-ইয়েস স্যার, এই দেখুন হাউজিং কোম্পানীর কাছ থেকে এ আপডেট পেয়েছি। আমাদের কাজে লাগতে পারে তাই আমি পেপারস এর ফটোকপি নিয়ে এসেছি।

কপাল কুঁচকে কুঞ্জর হাতে ধরে রাখা পেপারগুলোর দিকে তাকালো তন্ময়, সে এই কেইসটাকে যতোটা সহজ ভেবেছিলো এ মুহূর্তে ততোটা সহজ মনে হচ্ছে না। সে কাগজটা দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করলো,

-আর কোনো তথ্য?
-স্যার এখনও তো কিছু বলিই নি...
-মানে?
-স্যার, মিস জাকিয়া যেদিন বাড়ি থেকে পালিয়েছিলেন সেদিন রাতে তাদের বাড়ির কাজের মেয়েটা গলায় দড়ি দিয়েছিলো। আর শুধু তাই নয়, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বলছে মেয়েতা দেড় মাসের অন্ত্বস্বত্তা ছিলো।
-ওই মেয়ের অন্ত্বস্বত্তা হবার সঙ্গে মিস জাকিয়ার পালানোর সম্পর্ক কি?
-স্যার তা তো বলতে পারছি না কিন্তু আমার মনে হলো ঘটনা দুটো কানেক্টেড। মানে, প্রণয়ের সম্পর্কের পর বিয়ে এটা যে কোনো মেয়ের জন্য চরম আকাঙ্ক্ষার, অথচ এ মেয়েটা সে সম্পর্ক পরিণতি পাবার আগ মুহূর্তে পালিয়ে গেলো, আর তার পর পরই কাজের মেয়েটার অন্ত্বস্বত্তা অবস্থায় আত্মহত্যা করা। 

তন্ময় কিছু বললো না, কেবল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে উঠে বেরিয়ে গেলো। কুঞ্জ কিছুক্ষণ তন্ময়ের যাবার পথে তাকিয়ে থেকে নিজের কাজের জন্য চলে গেলো।


জাকিয়ার অফিসে এসে তন্ময় একটা নতুন তথ্য জানলো, গত দুইদিন যাবত জাকিয়া অদ্ভুত ব্যবহার করছে... ভুলবশত পিওন তার ড্রেসে লাল কালি ফেলে দেয়াতে সে নাকি সকলের সামনে পিওনকে চড় মেরে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেছে। আর একসময় চিৎকার করতে করতে জ্ঞান হারিয়েছে... 

তার কলিগদের ভাষ্যমতে জাকিয়া কখনোই উচ্চবাচ্য করার মতো মানুষ নয়, তার মতো শান্ত মানুষকে গালাগাল করতে দেখে তারাও কিছুটা বিস্মিত। পিওন তো কথা বলতে গিয়ে কেঁদেই দিলো, তার ভাষ্যমতে, "ম্যাডাম সবার থেকে বেশি সম্মান দিতো আমাকে, সেই ম্যাডামই আমাকে সেদিন কতো জোরে থাপ্পড় দিলো... আর শুধু তা নয়, কি অকথ্য গালাগাল! লজ্জায়, অপমানে আমি সেদিন কেঁদে দিয়েছিলাম"!

তন্ময় বুঝতে পারলো না, এতো শান্ত মেয়েটা হঠাৎ অশান্ত হয়ে গেলো কেনো! এর পেছনেও কি কোনো রোমাঞ্চকর রহস্য লুকিয়ে আছে! নাকি মেয়েটা বহুরূপী? ভালোমানুষির অভিনয় করতে করতে একসময় তার আসল খোলস উম্মোচন করছে! নাহ, এ কেইসটা দিন দিন জটিল থেকে জটিলতর হয়ে যাচ্ছে। এর দ্রুত সমাধান হওয়া অতীব জরুরি...

চলবে...

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0
Khadiza Arushi Aru সখের বশে লেখালেখি শুরু করলেও বর্তমানে তা আর সখ নেই, নেশা হয়ে গেছে। নিজের অনুভূতি, চিন্তাধারা, অভিজ্ঞতাকে অন্যের দ্বারপ্রান্তে সুকৌশলে পৌঁছে দেয়াই হয়তো আমার লিখে যাবার অনুপ্রেরণা! আমার প্রথম সম্পাদিত বই, "নবধারা জল" এবং প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস, "সূর্যপ্রভা"