সক্রেটিসের প্রশ্ন: ভালো বলেই কি ধর্ম, নাকি ধর্ম বলেই ভালো?

ধর্ম কি নৈতিকতার উৎস, নাকি নৈতিকতা ধর্মের উর্ধ্বে? সক্রেটিসের বিখ্যাত 'ইউথিফ্রো ডাইলেমা'র আলোকে ধর্ম ও বিবেকের সংঘাত নিয়ে একটি গভীর দার্শনিক বিশ্লেষণ। পড়ুন- ভালো বলেই কি ধর্ম, নাকি ধর্ম বলেই ভালো?

জানুয়ারী 22, 2026 - 17:39
 0  11
সক্রেটিসের প্রশ্ন: ভালো বলেই কি ধর্ম, নাকি ধর্ম বলেই ভালো?

আমরা সাধারণভাবে মনে করি, ভালো আর মন্দের পার্থক্য আমরা ধর্ম থেকেই শিখি। ধর্ম না থাকলে মানুষ বুঝত না কোনটা সঠিক, আর কোনটা ভুল। এই ধারণাটা এতটাই স্বাভাবিক যে আমরা খুব কম মানুষই এর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলি। কিন্তু দর্শনের কাজই হলো সেই স্বাভাবিক ধারণাগুলোকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো। সক্রেটিস ঠিক সেটাই করেছিলেন। তিনি আমাদের সামনে এমন একটি প্রশ্ন রেখেছিলেন যা খুব সাধারণ মনে হলেও আমাদের নৈতিক চেতনার এক গভীর পরীক্ষা নেয়। এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবন, আমাদের ছোট-বড় সিদ্ধান্ত এবং আমাদের বিবেকের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

সক্রেটিসের প্রশ্নটি খুব সরল। কোনো কাজ কি ভালো বলেই ঈশ্বর সেটাকে ভালো বলেন? নাকি ঈশ্বর বলেছেন বলেই কাজটা ভালো হয়ে যায়? প্রথমে মনে হতে পারে এটি কেবল ধর্মতাত্ত্বিক বা দার্শনিক ধাঁধা। কিন্তু এর ভেতরেই লুকিয়ে আছে মানুষের নৈতিক জীবনের গভীর দ্বিধা। এটি ধর্মের বিরুদ্ধে কোনো আক্রমণ নয়। বরং এটি ধর্ম এবং নৈতিকতার সম্পর্ক বোঝার চেষ্টা। আমরা চাই যে কোনো কাজকে বিচার করার সময় মানুষের বিবেকও কাজে লাগুক। আমরা চাই মানুষ ভালো কাজ করুক শুধু নিয়ম মেনে নয়, বরং বোঝার মাধ্যমে।

ধরা যাক সত্য বলার উদাহরণ। প্রায় সব ধর্মেই সত্য বলা ভালো কাজ হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু প্রশ্ন হলো সত্য বলা কেন ভালো? যদি সত্য বলা কেবল ধর্ম বলেছে বলে ভালো হয়, তাহলে ধর্ম না থাকলে তো সত্য বলার কোনো মূল্য থাকত না। কিন্তু বাস্তবে আমরা জানি সত্য মানুষের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি করে, সম্পর্ককে মজবুত করে, সমাজকে টিকিয়ে রাখে এবং মানুষের জন্য নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলে। তাই সত্য ভালো, কারণ এটি মানুষের কল্যাণে অবদান রাখে। ধর্ম কেবল সেই বাস্তব সত্যটিকে স্বীকৃতি দেয়। ধর্ম মানুষকে মনে করিয়ে দেয় কী ভালো, কী মন্দ, কিন্তু সেই নৈতিক সত্য ধর্মের আবিষ্কার নয়।

এখান থেকেই দ্বিধাটা স্পষ্ট হয়। যদি আমরা বলি ঈশ্বরের আদেশই ভালো-মন্দ নির্ধারণ করে, তাহলে নৈতিকতার নিজস্ব কোনো মানদণ্ড থাকে না। আদেশ বদলালেই ভালো-মন্দ বদলে যেতে পারে। এতে মানুষের বিবেকের গুরুত্ব শূন্য হয়ে যায়। মানুষ তখন বিচার করে না, কেবল মানে। এই অবস্থায় ধর্ম হয়ে দাঁড়ায় কেবল নির্দেশের একটি তালিকা। মানুষ রোবটের মতো কাজ করে, নিজের বিবেক ব্যবহার করে না। নৈতিকতা তখন আংশিক হয়ে যায় এবং ধর্ম কেবল অন্ধ অনুসরণের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু যদি আমরা বলি কিছু কাজ নিজস্ব গুণেই ভালো বা মন্দ, তাহলে ধর্মের ভূমিকা পুরোপুরি বদলে যায়। ধর্ম তখন নতুন করে ভালো তৈরি করে না। ধর্ম মানুষের সামনে ভালোকে স্পষ্ট করে তুলে ধরে মাত্র। মানুষের বিবেককে জাগিয়ে তোলে। এই অবস্থায় মানুষ ধর্ম মানে, কিন্তু চোখ বন্ধ করে নয়। মানুষ নিজের বিবেক ব্যবহার করতে শেখে। ধর্ম তখন মানুষকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তি দেয়, শুধু আদেশ মানার নয়।

আজকের বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বুঝি। ধরুন, আমাদের মধ্যে অনেক মানুষ পরিবেশ রক্ষা করেন। কেউ কোনো আইন ভয়ের কারণে পানি বা বর্জ্য দূষণ করে না। কেউ দেখেছে যে কোনো ব্যক্তি অবৈধভাবে গাছ কেটে ফেলছে। সে নিজের বিবেক অনুযায়ী প্রতিবাদ করছে, সচেতন হচ্ছে। এখানে সে ধর্ম বা আইন মেনে কাজ করছে না শুধু, সে বোঝে এটি সঠিক। আবার মানবাধিকার সংক্রান্ত কাজও এভাবে। আমরা জানি শিশু শ্রম, নারীর অধিকার হরণ, অনুন্নত এলাকায় শিক্ষার অভাব। এগুলো ভুল। আমরা নৈতিক বোধে প্রতিরোধ করি, কেবল আইন বা ধর্মের ভয়ে নয়। এই উদাহরণগুলো দেখায় প্রকৃত নৈতিকতা কেবল আদেশ মেনে নয়, বোঝার মাধ্যমে আসে।

আমাদের সমাজে অনেক সময় ধর্মকে শুধু নিয়ম আর আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়। কী পরবে, কী খাবে, কীভাবে প্রার্থনা করতে হবে, কোন দিনে উৎসব পালন করতে হবে। এগুলোই প্রধান হয়ে যায়। কিন্তু নৈতিক প্রশ্নগুলো পিছনে পড়ে থাকে। ফলে মানুষ ধার্মিক হয়, কিন্তু নৈতিক হয় না। বাহ্যিকভাবে নিয়ম মানলেও ভিতরে নৈতিকতার ভিত তৈরি হয় না। মানুষ আচার পালন করে, কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে না। মানুষের হৃদয়ে ন্যায়ের বীজ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে মানুষ হয়ে যায় ধর্মান্ধ।

সক্রেটিসের দ্বিধা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে নৈতিকতা ছাড়া ধর্ম ফাঁপা হয়ে যায়। ধর্মের মূল লক্ষ্য মানুষকে অন্ধভাবে আনুগত্যে রাখার নয়, বরং বিবেকের সঙ্গে মিলিয়ে ন্যায়ের বোধ তৈরি করা। প্রকৃত নৈতিকতা তখনই জন্মায় যখন মানুষ ভালো কাজ করে কোনো শাস্তি বা পুরস্কারের ভয়ে নয়, বরং কারণ সে জানে সেটা সঠিক। এই অবস্থায় ধর্ম মানেই মানুষের ভেতরে ন্যায়ের বোধকে জাগিয়ে তোলা।

ধর্ম এবং নৈতিকতা কখনোই একে অপরের বিরোধী নয়। ধর্ম তখনই অর্থপূর্ণ হয়, যখন তা মানুষকে ভাবতে শেখায়, নৈতিক হতে শেখায়। ভালোকে ভালো বলে চিনতে শেখায়। আর নৈতিকতা তখনই গভীর হয়, যখন মানুষ নিজের বিবেককে গুরুত্ব দেয়, শুধু আদেশকে নয়। ধর্ম তখন মানুষের ভেতরে নৈতিক চেতনা তৈরি করে, যা মানুষকে স্বাধীনভাবে ভালো কাজ করতে উৎসাহ দেয়।

সক্রেটিসের প্রশ্নের কোনো চূড়ান্ত উত্তর নেই। কিন্তু এই প্রশ্ন আমাদের এক মতৈক্যে নিয়ে আসে। সেটা হলো, ভালো মানুষ হওয়া মানে শুধু ধর্ম মানা নয়। ভালো মানুষ হওয়া মানে বুঝে ধর্ম মানা। নিজের বিবেককে সঙ্গে নিয়ে ধর্মের পথে হাঁটা। মানুষের জীবনে নৈতিকতা ও ধর্মের এই সমন্বয়ই সমাজকে শক্ত করে, মানুষকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শেখায়। হয়তো এই বোধটাই সক্রেটিস আমাদের মাঝে জাগ্রত করতে চেয়েছিলেন।

What's Your Reaction?

Like Like 1
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0
alihshawon আলী এইচ শাওন প্রযুক্তিবিদ ও সমাজকর্মী