পরীক্ষা দিই আমরা, চাকরি পায় টাকা: মেধার বদলে টাকার রাজত্ব
বছরের পর বছর পরীক্ষা আর কঠোর পরিশ্রমের পরেও চাকরি এখন আর যোগ্যতার ফসল নয়, বরং টাকার বিনিময়ে কেনাবেচার সামগ্রী। এতে মধ্যবিত্তের স্বপ্ন ভাঙে, আত্মসম্মান ক্ষয়ে যায়। মেধার মূল্যায়ন না হলে কোনো জাতি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে পারে না।
আমরা পরীক্ষা দিই। বছরের পর বছর বইয়ের পাতায় চোখ রেখে এবং রাত জেগে এক বুক স্বপ্ন বাঁচিয়ে আমরা বড় হই। বাবা-মায়ের আশা, নিজের সোনালী ভবিষ্যৎ আর বেঁচে থাকার তাগিদ নিয়ে আমরা পরীক্ষার হলে ঢুকি। কলম ধরার মুহূর্তে মনে হয় আজ বুঝি ভাগ্য বদলাবে। কিন্তু পরীক্ষা শেষে হল থেকে বেরোতেই বাস্তবতা সজোরে ধাক্কা দেয়। জানা যায় যে চাকরি আজ যোগ্যতার ফল নয় বরং এক নিষ্ঠুর বিনিয়োগ। যাদের পকেট ভারী তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ। আর যাদের সম্বল শুধু মেধা তাদের জন্য পড়ে থাকে কেবল অনিশ্চয়তা আর গভীর হতাশা।
এ দেশে আমরা পরীক্ষা দিই এবং মেধা তালিকায় নামও ওঠে কিন্তু চূড়ান্ত নিয়োগের তালিকায় আমাদের জায়গা হয় না। সেখানে অনায়াসেই জায়গা করে নেয় টাকার জোর, সুপারিশ আর ক্ষমতার প্রভাব। একজন বেকার তরুণকে বাইরে থেকে দেখলে বোঝা যায় না তার ভেতরে প্রতিদিন কতটা যুদ্ধ চলে। অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করে একটার পর একটা ফরম ফিলাপ আর পরীক্ষা দিতে দিতে সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। বন্ধুদের কেউ চাকরি পেয়ে গেছে অথবা কেউ বিদেশে সফল হয়েছে। অথচ সে আজও সেই একই লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে চারপাশের মানুষের অবজ্ঞা বাড়তে থাকে। "এখনো চাকরি হয়নি?" এই ছোট প্রশ্নটাই যেন তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়।
চাকরি আজ এ দেশে এক সোনার হরিণে পরিণত হয়েছে। সবাই তার পেছনে দৌড়ায়। কিন্তু ধরতে পারে খুব সামান্য কজন। যাদের মেধার জোরে এটি পাওয়ার কথা ছিল, তারা টাকার অভাবে পড়ে থাকে সবার পেছনে। কারণ তাদের ঘুষ দেওয়ার সামর্থ্য নেই এবং নেই কোনো প্রভাবশালী পরিচয়। তাদের সম্বল কেবল একগাদা সার্টিফিকেট আর এক জোড়া স্বপ্নহীন ক্লান্ত চোখ। এই ব্যবস্থায় মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যে বাবা কৃষক বা সামান্য চাকরিজীবী তিনি নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে সন্তানকে পড়ান এই আশায় যে একদিন অভাব ঘুচবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায় যখন শোনা যায় যে পদটি আগেই নির্দিষ্ট করা ছিল। তখন শুধু চাকরি নয় বরং পুরো ব্যবস্থার ওপর থেকে বিশ্বাসটুকুও মরে যায়।
বেকারত্ব কেবল পকেট খালি করে না বরং এটি তিলে তিলে মানুষের আত্মসম্মান খেয়ে ফেলে। সকালে নাস্তার টেবিলে যখন কোনো শিক্ষিত তরুণ চুপ করে বসে থাকে তখন তার নীরবতা পুরো ঘরকে ভারী করে তোলে। সে জানে এই সামান্য খাবারের পেছনেও তার কোনো অবদান নেই বরং আজও সে তার বৃদ্ধ বাবার ওপর বোঝা হয়ে আছে। বাবা কিছু বলেন না এবং মা হয়তো প্রশ্ন করেন না কিন্তু তাদের সেই নীরবতা গলার ভেতর দলা পাকিয়ে থাকে। এই গ্লানি সহ্য করতে না পেরে অনেক তরুণ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। তারা প্রবাসী হয় শুধু জীবিকার প্রয়োজনে নয় বরং দেশের এই অপমান থেকে বাঁচতে।
হাতে দামী ডিগ্রি আর মাথায় অনিশ্চয়তার বোঝা নিয়ে তারা মালয়েশিয়া, সৌদি আরব কিংবা ইউরোপে পাড়ি দেয়। সেখানে তারা এমন সব শ্রমিকের কাজ করে যা নিজ দেশে করলে সমাজ তুচ্ছজ্ঞান করত। তবুও তারা যায় কারণ দেশের মাটিতে মেধাবী হয়েও বেকার থাকার চেয়ে বিদেশের হাড়ভাঙা খাটুনি তাদের কাছে সহজ মনে হয়। আমাদের মেয়েরাও অনেকে পরিস্থিতির চাপে হাল ছেড়ে দেয়। কেউ নামমাত্র বেতনে শিক্ষকতা করে আবার কেউ কোচিং সেন্টারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা খাটুনি দেয়। তবু তারা টিকে থাকে কারণ পরিবারের বোঝা হয়ে থাকার গ্লানি তাদের কাছে অনেক বেশি ভারী।
আজকের এই রুগ্ন সমাজ ব্যবস্থায় আমরা বেকার তরুণকে খুব সহজে অলস বা ব্যর্থ বলি। অথচ যে ব্যবস্থার কারণে সে আজ লাইনে দাঁড়িয়ে আছে সেই ব্যবস্থার ত্রুটি নিয়ে আমরা প্রশ্ন তুলি না। আমরা ভুলে যাই যে এই তরুণরাই একদিন দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিল। আজ যারা নিয়োগের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে রোদে পুড়ছে তারা অযোগ্য নয় বরং তারা একটি পচে যাওয়া ব্যবস্থার শিকার। দেশ যদি সত্যিই এগোতে চায় তবে তরুণদের এই ঘাম আর মেধার প্রকৃত মূল্যায়ন করতে হবে। নতুবা এমন একদিন আসবে যখন এ দেশের তরুণরা আর স্বপ্ন দেখবে না। আর স্বপ্নহীন কোনো জাতির ভবিষ্যৎ কখনো উজ্জ্বল হতে পারে না।
What's Your Reaction?
Like
4
Dislike
0
Love
4
Funny
1
Angry
0
Sad
0
Wow
5