মঙ্গলযাত্রা
অধ্যায় ১: সংকেত
২২১৮ সাল। মঙ্গলের বুকে ঘুমিয়ে থাকা এক পুরনো রোবট হঠাৎই সচল হলো। অত্যাধুনিক রোভার ‘এম-৫৬৫’ ভেঙে পড়েছিল বছর দশেক আগে। রোভার হলো একটি যান যা কোনো গ্রহ বা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বস্তুতে চলাফেরা করতে পারে। কিন্তু আজ, মঙ্গলের বিরান ভূমিতে বিধ্বস্ত সেই পুরনো রোভার থেকে সংকেত ভেসে এলো পৃথিবীতে “তারা জেগে উঠেছে এবং আবার আসবে পৃথিবীতে”। এই বার্তা নাসার মিশন কন্ট্রোলে আলোড়ন সৃষ্টি করল। সিগন্যাল বিশ্লেষণ করে দেখা গেল, এটা কোনো যান্ত্রিক গোলযোগ নয় এতে ছন্দ আছে, ভাষা আছে, এবং... মনুষ্য বুদ্ধিমত্তার ছাপ। প্রায় একশ বছর আগে মঙ্গলে বসতি গড়ে ছিলো কয়েক হাজার অত্যাধুনিক রোবট। তারা এসেছিলো আমাদের গ্যালাক্সির ভেলমোরা নামক একটি গ্রহ থেকে । একটি ভয়ংকর বিস্ফোরনে ধ্বংস হয়ে যায় সকল রোবট, শুধু এই রোভারে থাকা শ খানেক রোবট টিকে ছিলো, কিন্তু এই রোভারের সার্ভার হ্যাক করে মঙ্গলে ভূপাতিত করিয়েছিলো আমাদের পৃথিবীর কিছু হ্যাকার। কারন জানা যায় তারা নাকি প্ল্যান করেছিলো পৃথিবীকে আক্রমন করার, আবারো বসতি স্থাপন করতে চায় ভাবা যায়! পৃথিবীর নিজের অবস্থাই ভয়াবহ। কয়েকটি দেশ সাগরের বুকে বিলীন হয়ে গেছে বেশ আগেই। স্থল্ভূমি অনেক কমে গেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ তো লেগেই থাকে ঝড়, জলোচ্ছ্বাস আজ এখানে তো কাল ওখানে। ভূমিকম্প তো দৈনন্দিন ব্যাপার। এমতাবস্থায় মানুষই কোনরকম টিকে আছে।
অধ্যায় ২: মিশন ফিনিক্স
বিধ্বস্ত রোভার এম-৫৬৫ এর সেই রোবটের সংকেতের জবাবে নাসা ঘোষণা দিল নতুন এক অভিযানের, মিশন ফিনিক্স। একটি গোপন ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান। নেতৃত্বে থাকলেন ক্যাপ্টেন রজার সাইমন। দলে ছিলেন রোবটিক্স সায়েন্স এর প্রফেসর শাহ মুহাম্মাদ সাকলায়েন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও হ্যাকিং এক্সপার্ট ভিক্টর লী, এবং মিশন কমান্ডার জ্যাক স্যান্টোস। মিশনের লক্ষ্য ঐ রোভার থেকে সংকেতের উৎস খুঁজে বের করা এবং সেই সাথে নিশ্চিত হওয়া কি পরিমান রোবট রয়েছে ঐ রোভারে এমনকি পৃথিবীর নিরাপত্তার স্বার্থে ধ্বংস করা হবে ঐ রোভার, এটাই মিশনের মূল লক্ষ্য। চাঁদে কিংবা ভিন গ্রহে অভিযানের জন্য এখন আর আগের মতো কোন আয়োজন করতে হয় না। অভিজ্ঞ লোকজন থেকে শুরু করে আত্যাধুনিক ডিভাইস এবং শক্তিশালী স্পেসশিপ সবসময় প্রস্তুত থাকে। অতীতে যা মানুষ কল্পনা করতো এখন সেসবই বাস্তবে ব্যবহার হচ্ছে এবং এইসব স্পেসশিপ এর প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে যে কোন গ্রহের মধ্যাকর্ষন শক্তিকে। পুরনো রকেট প্রযুক্তি আজ আর ব্যবহার হয় না। তারা রওনা হলেন স্কাইবার্নার-৩ নভোযান নিয়ে। মঙ্গলপৃষ্ঠে নেমেই তারা অদ্ভুত জিনিস দেখতে পেল ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাচীন এক শহরের চিহ্ন! মাটিতে ছড়িয়ে আছে নানা রকম ধাতুর টুকরো, গলিত সোলার প্যানেল, আর ধ্বংস হওয়া রোবটের দেহ। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার ছিল, শহরের পাশের পাহাড়ে এক বিশাল গুহা, যার ভেতর থেকে ভেসে আসছিল মেশিনের গুঞ্জন। অতি সন্তর্পনে তারা এগিয়ে যায় গুহাটির দিকে।
অধ্যায় ৩: মেকালন
গুহার ভেতরে ঢুকে তারা যা দেখলো, তা কোনোভাবেই আশা করেনি, জনা পঞ্চাশেক মেকালন । অত্যন্ত হিংস্র ও প্রতিশোধ পরায়ন মেকালন । অর্ধ-মানব, অর্ধ-রোবট এক জাতি যারা হাজার বছর ঘুমিয়ে ছিল এবং তারা ঐ রোভারের বাসিন্দা নয় । বহু বছর পর জেগে উঠে বিধ্বস্ত রোভারটি পেয়ে তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে। তাদের চোখে তীব্র হিংস্রতা বিদ্যমান। ইতিহাসের পাতায় মঙ্গলে এদের অস্তিত্বের কথা জানা যায় না, অন্তত পৃথিবীবাসী জানে না এরা কবে কবে থেকে মঙ্গলে বসবাস করছে। শুধু জানে এই মেকালন যে কোন সময় পৃথিবী আক্রমন করতে পারে। তাদের যা করার দ্রুত করতে হবে। ওরা সিদ্ধান্ত নেয় গোপনে খোঁজ নেবে শহরের আশে পাশে আরো মেকালন এর আস্তানা আছে কিনা। পৃথিবীতেও মেসেজ পাঠানো হলো । দ্রততার সাথে আধুনিক ও অতি গতিশীল স্পেসশিপে করে আশে পাশের কয়েকটি শহর ঘুরে জানা যায় আর কোথাও মেকালনদের আস্তানা নেই, পৃথিবী থেকেও একই মেসেজ পাঠানো হয় তাদের। সুবিধা হলো ওরা সাধারণত যুদ্ধ ছাড়া রোভারের বাইরে বের হয় না। এইসব মেকালনদের সৃষ্টি করেছিলো উন্নত কোন গ্রহের বাসিন্দারা যুদ্ধ করা কিংবা আক্রমন মোকাবেলা করার জন্য। সেই রাতে, বেস ক্যাম্পের কম্পিউটার হঠাৎ জেগে উঠে বলল: “ওরা তোমাদের লক্ষ করেছে।”
অধ্যায় ৪: মোকাবেলা
সাকলায়েন, ডেভিড, আর জ্যাক স্যান্টোস অতি গোপনে গুহার ভেতর প্রবেশ করলো এবং এর ভেতরেই একটা ডিজিটাল ট্র্যাপ তৈরি করলো কিন্তু রোবটগুলো বুঝে ফেলায় চোখের পলকে এক ভয়ঙ্কর যুদ্ধ শুরু হলো। ওদের এমন কিছু যন্ত্র আছে যা দিয়ে মানুষের মস্তিষ্ক হ্যাক করা যায়, রিবুট করা যায় এমন কি ইচ্ছামত নিয়ন্ত্রন করা যায় এর কারন এখন প্রায় সবার মাথায় বিশেষ ডাটা চিপ বসানো থাকে। ভয়ঙ্কর এক মেশিন যা দিয়ে কোন রকম ধ্বংসযজ্ঞ ছাড়াই সব কিছুর দখল ও নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব। পৃথিবী থেকেই তারা প্ল্যান করে কিছু ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ওয়েপন ও প্লাজমা বোমা নিয়ে এসেছিলো। এর মধ্যেই ডেভিড শহরের শক্তির উৎস খুঁজে পেলেন এক প্রাচীন রিঅ্যাক্টর, যা এখনো সচল। তারা সেখানে বসাল প্লাজমা বোমা। সময়মতো সক্রিয় করা হলো বোমাটিকে এবং যথা সময়ে ঘটানো হলো বিস্ফোরন। ধ্বংস হয়ে গেলো প্রাচীন রিঅ্যাক্টরটি আর পুরনো রোভারে মেকালনদের গবেষণাগারের সকল যন্ত্র অকেজো করা হলো ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ওয়েপনের মাধ্যমে। এর মধ্যেই হলো সূর্যোদয়, সূর্যালোকে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হলো দৃশ্য, লাল রঙের ধূলোয় ঢাকা পরে আছে পুরো শহর। নিস্তব্ধ ও নীরব।
অতঃপর অভিযাত্রীরা ফিরে আসলেন পৃথিবীতে। ফিরে এসে কমান্ডার জ্যাক স্যান্টোস লিখে রাখেন তার রিপোর্টে-
“মঙ্গল শুধুই এক গ্রহ নয়। ওখানে ইতিহাস আছে, আর আছে ভয়ঙ্কর এক বার্তা, আমরা যাকে মৃত ভাবি, তারা আসলে মৃত নয়।”
শেষ
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0