ভাষা, মস্তিষ্ক ও মানবতার নির্মাণ

ভাষা ও মস্তিষ্কের সম্পর্কের ভেতর দিয়েই মানুষের মানব হয়ে ওঠার গল্প।

ফেব্রুয়ারী 2, 2026 - 20:26
ফেব্রুয়ারী 2, 2026 - 21:17
 0  8
ভাষা, মস্তিষ্ক ও মানবতার নির্মাণ
This article explores how the deep relationship between language and the human brain transforms humans from biological beings into thinking, feeling, and civilized entities.

ভাষা, মস্তিষ্ক ও মানবতার নির্মাণ

খাদিজা আরুশি আরু


একটি শিশু যখন জন্মগ্রহণ করে, তখন তার কান্না পৃথিবীতে তার প্রথম ঘোষণা। কিন্তু সেই কান্নার কোনো ভাষা নেই। তবু সেই শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে ভবিষ্যতের সব কথা বলা, সব প্রশ্ন করা, সব অনুভব প্রকাশ করার সম্ভাবনা। শিশুটিকে কোলে নিয়ে বাবা যখন নার্সকে জিজ্ঞেস করে—‘ছেলে নাকি মেয়ে?’—তখন আসলে তিনি শুধু লিঙ্গ জানতে চান না; তিনি অজান্তেই একটি দীর্ঘ মানবিক যাত্রার সূচনা করেন। কারণ সেই শিশু তখনো জানে না সে কে, কী তার নাম, কোথায় তার স্থান, কী হবে তার পরিচয়। অথচ তার মস্তিষ্কের ভেতরে তখন থেকেই শুরু হয়ে যায় এক নীরব বিপ্লব—ভাষার মাধ্যমে মানুষ হয়ে ওঠার প্রস্তুতি।
মানুষ জন্মায় শরীর নিয়ে, কিন্তু মানুষ হয়ে ওঠে ভাষা দিয়ে। ভাষা ছাড়া মানুষ কেবল একটি জীব; ভাষার মাধ্যমেই সে হয়ে ওঠে সমাজের অংশ, ইতিহাসের ধারক, ভবিষ্যতের স্বপ্নদ্রষ্টা। মস্তিষ্ক এবং ভাষার এই সম্পর্ক প্রকৃতির এক বিস্ময়কর চুক্তি—যেখানে জৈবিক গঠন আর সামাজিক পরিবেশ একসাথে মিলিত হয়ে মানবসভ্যতার ভিত্তি নির্মাণ করে।
ডারউইন মানুষের বিবর্তনের কথা বলেছেন, প্রাকৃতিক নির্বাচনের কথা বলেছেন। কিন্তু যে প্রশ্নটি তিনি পুরোপুরি ধরতে পারেননি, তা হলো—কেন মানুষের মস্তিষ্কের একটি বিশেষ অংশ ভাষা তৈরির এমন অনন্য ক্ষমতা অর্জন করল? কেন অন্য প্রাণীর ডাক আছে, সংকেত আছে, কিন্তু মানুষের আছে গল্প, কবিতা, আইন, দর্শন, প্রেমপত্র, বিপ্লবী স্লোগান? এখানে যেন প্রকৃতি আর ইতিহাস গোপনে এক চুক্তিতে বসেছে। মানুষের মস্তিষ্ককে এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে, যেন সে শুধু বাঁচবে না—সে বলবে, লিখবে, ভাববে, প্রতিবাদ করবে।
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় আমরা জেনেছি, মানুষের মস্তিষ্কের বাম গোলার্ধে ব্রোকা এবং ওয়ার্নিকে নামের দুটি অঞ্চল রয়েছে, যেগুলো ভাষা উৎপাদন ও ভাষা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু এই তথ্য যতটা বৈজ্ঞানিক, ততটাই অসম্পূর্ণ যদি আমরা এটিকে কেবল শারীরবৃত্তীয় ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ রাখি। কারণ ভাষা কোনো একটি কোণের সম্পত্তি নয়। ভাষা সারা মস্তিষ্কজুড়ে ছড়িয়ে থাকা লক্ষ লক্ষ নিউরন ও সিনাপসের সমবায়ে গড়ে ওঠা এক জীবন্ত নেটওয়ার্ক। এই নেটওয়ার্ক শুধু শব্দ তৈরি করে না—এটি চিন্তা তৈরি করে, স্মৃতি গড়ে তোলে, আবেগকে অর্থ দেয়।
একজন মা যখন তার শিশুকে ‘মা’ শব্দটি শেখান, তখন তিনি শুধু একটি ধ্বনি শেখান না। তিনি শেখান একটি সম্পর্ক, একটি উষ্ণতা, একটি নিরাপত্তার অনুভব। শিশুটি শুধু শব্দ শোনে না—সে মায়ের মুখের অভিব্যক্তি দেখে, তার কণ্ঠের কোমলতা অনুভব করে, তার স্পর্শের উষ্ণতায় আশ্বস্ত হয়। মস্তিষ্কের ভেতরে তখন একসাথে সক্রিয় হয় দৃষ্টি, শ্রবণ, স্পর্শ, আবেগ—সব মিলিয়ে একটি শব্দ একটি সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতায় রূপ নেয়। এভাবেই ভাষা বাস্তবতার সাথে যুক্ত হয়। শব্দ আর বস্তু আলাদা থাকে না; শব্দ হয়ে ওঠে বাস্তবতার প্রতীক।
আমাদের দৈনন্দিন জীবন এই সম্পর্কের নীরব সাক্ষ্য বহন করে। একজন মানুষ যখন বাজারে গিয়ে বলে, ‘আজ অনেক গরম’, তখন তিনি কেবল আবহাওয়ার খবর দিচ্ছেন না। তার ত্বক তাপ অনুভব করছে, শরীর ঘাম নিঃসরণ করছে, চোখ রোদের তীব্রতা ধরছে, মস্তিষ্ক সেই সব অনুভূতিকে একত্র করে একটি বাক্যে রূপ দিচ্ছে। ভাষা এখানে শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি অভ্যন্তরীণ অভিজ্ঞতা আর বাইরের জগতের মধ্যে সেতুবন্ধন।
শিক্ষা এই সেতুবন্ধনের সবচেয়ে শক্তিশালী রূপ। একটি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক যখন গণিত, বিজ্ঞান বা সাহিত্য পড়ান, তখন তিনি কেবল তথ্য দিচ্ছেন না। তিনি শিক্ষার্থীদের মস্তিষ্কে নতুন পথ তৈরি করছেন। প্রতিটি নতুন শব্দ, প্রতিটি নতুন ধারণা, প্রতিটি নতুন সূত্র মস্তিষ্কের ভেতরে নতুন নিউরাল সংযোগ সৃষ্টি করে। বিজ্ঞান একে বলে নিউরোপ্লাস্টিসিটি—মস্তিষ্কের নিজের গঠন পরিবর্তন করার ক্ষমতা। অর্থাৎ শিক্ষা কেবল মন বদলায় না; শিক্ষা মস্তিষ্ক বদলায়। শব্দ শেখা মানে নতুন চিন্তার রাস্তা তৈরি করা। ধারণা শেখা মানে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দেওয়া।
কিন্তু এই আলোর বিপরীতে একটি গভীর অন্ধকারও আছে। ইতিহাসে এমন বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে, যেখানে শিশু দীর্ঘদিন মানুষের সংস্পর্শ থেকে বঞ্চিত হয়েছে, ভাষার পরিবেশ পায়নি। বড় হয়ে তারা কথা বলতে পারেনি, মানুষের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়তে পারেনি। এটি শুধু একটি সামাজিক ট্র্যাজেডি নয়; এটি একটি জৈবিক ক্ষতি। কারণ ভাষার অভাবে তাদের মস্তিষ্ক পূর্ণ বিকাশের সুযোগ পায়নি। এতে প্রমাণ হয়—ভাষা কেবল যোগাযোগের উপকরণ নয়, এটি মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য অপরিহার্য শর্ত।
ভাষা আবার একেক সংস্কৃতিতে একেকভাবে মস্তিষ্ককে গড়ে তোলে। একজন চাইনিজ ভাষাভাষীর মস্তিষ্ক আর একজন ইংরেজিভাষীর মস্তিষ্ক ভাষা প্রক্রিয়াকরণে ভিন্ন ভিন্ন পথ ব্যবহার করে। চাইনিজ লিপি বেশি ভিজ্যুয়াল ও স্থানিক দক্ষতার সাথে যুক্ত, যেখানে অ্যালফাবেটিক ভাষা ধ্বনিগত বিশ্লেষণের ওপর বেশি নির্ভরশীল। ফলে ভাষা শুধু সংস্কৃতি তৈরি করে না—সংস্কৃতিও মস্তিষ্কের কাঠামোকে আকার দেয়। আমরা যেভাবে কথা বলি, যেভাবে লিখি, যেভাবে ভাবি—সবকিছুই আমাদের মস্তিষ্কের ভেতরে আলাদা ছাপ রেখে যায়।
আবেগ ও স্মৃতির ক্ষেত্রেও ভাষার ভূমিকা অনন্য। একটি প্রেমের চিঠি, একটি শোকবার্তা, একটি শিশুর প্রথম ‘বাবা’ ডাক—এই সব শব্দ শুধু তথ্য বহন করে না, তারা অনুভূতি বহন করে। শব্দের সাথে যুক্ত হয় স্মৃতি, স্মৃতির সাথে যুক্ত হয় আবেগ। মস্তিষ্কের গভীর অংশ তখন সক্রিয় হয়ে ওঠে, যা মানুষকে কেবল যুক্তিবাদী প্রাণী নয়—সংবেদনশীল, সহমর্মী, মানবিক সত্তায় রূপ দেয়। ভাষা আমাদের কেবল ভাবতে শেখায় না; ভাষা আমাদের অনুভব করতে শেখায়।
এই সব কিছুর কেন্দ্রে রয়েছে মস্তিষ্ক ও ভাষার সেই গোপন চুক্তি—যে চুক্তি মানুষকে মানুষ করে তোলে। প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য আমাদের পরিচয়কে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করে। প্রকৃতি আমাদের দেহ দিয়েছে, কিন্তু ভাষার মাধ্যমে আমরা সেই দেহকে আত্মা দিই। ভাষা ছাড়া শরীর কেবল একটি জৈব কাঠামো; ভাষার মাধ্যমে সেই শরীর হয়ে ওঠে ইতিহাসের বাহক, সংস্কৃতির ধারক, স্বপ্নের ধারক।
আমরা যারা আজ কথা বলছি, লিখছি, চিন্তা করছি, তর্ক করছি, ভালোবাসছি—সবকিছুই এই অসাধারণ সম্পর্কের ফল। মস্তিষ্ক ও ভাষার এই চুক্তি না থাকলে মানবসভ্যতা কেবল অসম্ভবই নয়, অকল্পনীয় হতো। কারণ সভ্যতা শুধু ইট-পাথরের শহর নয়; সভ্যতা হলো শব্দের শহর, অর্থের শহর, স্মৃতির শহর। আর সেই শহরের স্থপতি হলো আমাদের মস্তিষ্ক ও ভাষার যুগলবন্দি।
মানুষের ইতিহাস আসলে ভাষার ইতিহাস। প্রতিটি বিপ্লব, প্রতিটি ধর্ম, প্রতিটি আইন, প্রতিটি কবিতা—সবই শুরু হয়েছে শব্দ দিয়ে। তাই মস্তিষ্ক ও ভাষার এই সম্পর্ক শুধু বৈজ্ঞানিক বিষয় নয়; এটি মানবতার জন্ম-রহস্য। এই রহস্যের ভেতর দিয়েই আমরা প্রতিদিন নতুন করে মানুষ হয়ে উঠি।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0
Khadiza Arushi Aru সখের বশে লেখালেখি শুরু করলেও বর্তমানে তা আর সখ নেই, নেশা হয়ে গেছে। নিজের অনুভূতি, চিন্তাধারা, অভিজ্ঞতাকে অন্যের দ্বারপ্রান্তে সুকৌশলে পৌঁছে দেয়াই হয়তো আমার লিখে যাবার অনুপ্রেরণা! আমার প্রথম সম্পাদিত বই, "নবধারা জল" এবং প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস, "সূর্যপ্রভা"