কাশফুলের ছবি
দিশার খালাতো বোন ঊষা ঢাকাতে থাকে। দিশা কে খুব ভালোবাসে ঊষা।ঊষা মেডিকেল কলেজে পড়ে ।প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে বিশেষভাবে ডাক্তারি শেখে। খুব ব্যস্ত সময় যায় তার, ক্লাস, ওয়ার্ড, একটার পর একটা দায়িত্ব। (কাশফুলের ছবি)
তবু ও সে দিশা কে অনেক মিস করে। শুক্রবার
কোনো ক্লাস নেই।তাই সে দিশা কে ফোন করে।
-হ্যালো আপু কেমন আছো।দিশা বলল,আমি ভালো আছি।ঊষা বলল,তোমাকে খুব মিস করছি
আপু।
তুমি জানো আমার খুব ইচ্ছে কাশফুল দেখার। জানো তো, কখনো চোখে দেখিনি। শুধু বই আর ফেসবুকেই দেখি মনে হয় যদি একদিন গ্রামে গিয়ে নিজের চোখে দেখতে পারতাম!
দিশা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,
তুই তো জানিস, কাশফুল এখন চারদিকেই ফুটে আছে। আমাদের মাঠের ধারে, নদীর পাড়ে, এমনকি স্কুলের পেছনেও। কেমন সাদা তুলার মতো ওরা দুলছে বাতাসে।
ঊষা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
শুধু কথায় শুনেই মন ভরে যায় আপু যদি ছুটি পেতাম, তোকে চেপে ধরতাম, আমায় নিয়ে চল গ্রামের পথে।
দিশার মনটা খারাপ হয়ে গেল। ছোটবেলায় দু’জনে কত দৌড়ে বেড়িয়েছে গ্রামের পথে। অথচ এখন, জীবনের ব্যস্ততায় ঊষা আটকে আছে ঢাকার ইটপাথরে।
সন্ধ্যায় দিশা হাঁটতে বের হলো। মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে কাশফুলের দিকে তাকিয়ে ফোনটা বের করলো। একটার পর একটা ছবি তুলতে লাগলো। কাছ থেকে, দূর থেকে, কখনো নিজের ছায়াসহ সব যেন ঊষার জন্য।
বাড়ি ফিরে ছবিগুলো ঊষাকে পাঠালো। সঙ্গে লিখলো:
“ঊষা, কাশফুল তোকে খুব মিস করছে। ওরা বললো, এবার তোর জন্য ওরা আরো সাদা হবে, আরো দুলবে বাতাসে। আর আমি? আমি তোর জন্য কাশফুল হয়ে তোর পাশে দাঁড়াবো, যতদিন না তুই নিজেই এসে দেখে যাবি।”
ঊষার চোখে জল চলে এলো। সে ফোনটা বুকের কাছে চেপে ধরলো। তার মনেও কাশফুল ফুটে উঠলো ভালোবাসায়, অপেক্ষায়, দিশার নিঃশব্দ মমতায়।
ঊষা ছবি গুলো বারবার দেখতে লাগলো। প্রতিটা ছবিতে যেন দিশার কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছিলো সে। মনে হচ্ছিল, কাশফুলগুলোও যেন কথা বলছে তুই চলে আয় ঊষা, আমরা তোর জন্যই ফুটেছি।
রাত গভীর হতে লাগলো। মেডিকেল কলেজের ব্যস্ততা, রোগীদের ভিড়, ক্লাসের চাপ সবকিছুর মাঝেও মনে পড়তে লাগলো ছোটবেলার সেই দিনগুলো। দিশার সঙ্গে বর্ষার দিনে কাদামাটি মেখে দৌড়ানো, শীতের সকালে কম্বল মুড়ি দিয়ে গল্প শোনা, আর পাটক্ষেতে লুকোচুরি খেলা সব যেন ফিরতে চাইলো স্মৃতির জানালা পেরিয়ে।
ঊষা বিছানায় বসে লেখার খাতা খুললো। অনেক দিন কিছু লেখেনি, ব্যস্ততায় আবেগগুলো চাপা পড়ে গিয়েছিল। এবার কলম হাতে নিয়ে লিখতে লাগলো।
গ্রাম মানেই শুধু সবুজ নয়, গ্রাম মানেই দিশার মতো একটা হৃদয়, যেখানে কাশফুল নয়, ভালোবাসাও দুলে যায় বাতাসে।
পরদিন সকালে ক্লাসে বসেই দিশাকে মেসেজ দিলো ঊষা আপু, ছবি গুলো শুধু ছবি না, ওরা যেন আমার মনের ওপর একরাশ স্নেহ ছড়িয়ে দিয়েছে। তোমাকে পেয়ে আমি ধন্য। তোমরা গ্রামের মাটি ছুঁয়ে থাকো তোমরা আমাদের মতো ক্লান্ত শহুরেদের মনের বিশ্রাম।
দিশা পড়ে হেসে ফেললো। উত্তর দিলো তোর জন্য কাশফুলের পাশাপাশি আমি এবার সরিষা ফুলও তুলে রাখবো। আর একটা ছোট ঝিল আছে জানিস? ওটার পাড়ে বসে বিকেলে তোকে নিয়ে এক কাপ চা খেতে চাই।
ঊষা মুচকি হেসে ভাবলো, সে দিনটা হয়তো খুব কাছেই। এই ব্যস্ততা একদিন থামবে, সেও গ্রামে ফিরবে শুধু কাশফুল দেখতে নয়, নিজের ফেলে আসা শৈশবকে জড়িয়ে ধরতে।
ঢাকার কনক্রিটের মাঝে বসে থাকা একটি মেয়ে তখন নিজের হৃদয়ে গ্রামের বাতাস অনুভব করছিলো। কাশফুল শুধু একটা ফুল না, যেন একটি সেতু দুই বোনের ভালোবাসার, স্মৃতির, আর প্রতীক্ষার।
কয়েকদিন পর ঊষা দিশাকে ফোন করলো।
বলল,আপু তুমি একটু বাড়ির পিছনে এসো তোমার জন্য সারপ্রাইজ আছে।দিশা বলল,
দাঁড়া এক্ষুনি আসছি।
দিশা গিয়ে দেখলো তার আদরের বোনটি তার জন্য একগুচ্ছ রজনীগন্ধা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।দিশা
দৌড়ে গিয়ে ঊষাকে জড়িয়ে ধরল।দিশা বলল,
এই বাঁদর তুই গ্রামে আসছিস আমাকে জানাবি না।ঊষা বলল,জানালে কি আর এভাবে দুজন
দুজনকে জড়িয়ে ধরতাম।
আপু তুমি রজনীগন্ধা পছন্দ করো বলে। তোমার জন্য আমি রজনীগন্ধা ফুল নিয়ে এসেছি।দিশা
বলল, আমার মিষ্টি বোন ধন্যবাদ তোকে।
চল এবার বাড়িতে চল আগে বিশ্রাম নিবি তারপর
আমরা দুইবোন সারা বিকেল ঘুরবো।ঊষা বলল,
চলো।ঊষা বাড়ির ভিতর ঢুকে বলল,আপু খালামনি কোথায়?দিশা বলল,মা রান্নাঘরে।
ঊষা চুপিচুপি রান্না ঘরে গিয়ে পিছন থেকে মাকে
জড়িয়ে ধরলো।মা তো ঊষাকে দেখে অবাক।বলল, তুই কখন এলি।।ঊষা বলল, এইমাত্র
খালামনি।
আপুর জন্য মনটা খুব খারাপ লাগছিল।আর গ্রামের স্মৃতিগুলো ও খুব মনে পড়ছিল তাই।কলেজ
ছুটি হতেই চলে আসলাম।মা ঊষাকে বলল,তুই ফ্রেশ হয়ে আয় । তারপর দুই বোনকে আমি একসাথে খেতে দিচ্ছি।
ঊষা ফ্রেশ হয়ে আসলো।এসে খাওয়া দাওয়া করলো। তারপর একটু বিশ্রাম নিলো।বিকেলে
ঊষা দিশা কে বলল,আপু চলো বেড়িয়ে আসি।
দিশা আর ঊষা কাশফুলের বনে গেলো।ঊষা তো
কাশফুল কে জড়িয়ে ধরে হেসেই কুটিকুটি।দিশা কে বলল,আপু আমার ছবি তুলে দাও।দিশা ঊষাকে ছবি তুলে দিলো।
দিশা ঊষাকে বলল,চল তোকে শাপলার বিলে
নিয়ে যাবো।দুজন হাঁটতে হাঁটতে শাপলার বিলে
চলে আসলো।ঊষা বলল,আপু কিছু শাপলা তুলে
দাও।দিশা বলল,একটু দাঁড়া আমি তুলে দিচ্ছি।
দিশা শাপলা তুলে দিলো ঊষাকে।ঊষা শাপলা
ফুল নিয়ে অনেক সেলফি তুললো।
সন্ধ্যায় দুইবোন বাড়ি ফিরে এলো। তাদের ফটোগুলো
দেখতে লাগলো।ঊষা সপ্তাহ খানেক গ্রামে থেকে
ঢাকায় চলে গেলো। ঢাকায় ফিরে দিশাকে।
ম্যাসেজ করলো আপু আমি তোমাকে অনেক অনেক মিস করছি।
তোমার সাথে তোলা ছবিগুলো আমার কাছে যত্ন
করে রেখে দিয়েছি। দিশা বলল, আমি ও তোকে
অনেক মিস করছি।
What's Your Reaction?
Like
4
Dislike
0
Love
5
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
4