ভারী খাবার খাওয়ার পর কীভাবে দিনের খাদ্যাভ্যাসকে ব্যালেন্স করবেন
শীতকাল আসলে সকলদেশেই কিছুটা উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বাচ্চাদের উইন্টার ভ্যাকেশন, বিয়ে, দাওয়াত, পিঠা-পুলির উৎসব, নববর্ষ বিভিন্ন উপলক্ষে সেলিব্রেশনের উপকরণ হিসাবে আমাদের দেশে বিভিন্ন মুখরোচক খাদ্যই থাকে মূল ফোকাস। এ সময়ে অনেকেরই ভারী, তেল-চর্বি বা অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার খেয়ে ফেলার অভ্যাস থাকে। মাঝে মাঝে এমন খাবার খাওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু দিনের বাকি সময়ের খাবার সঠিকভাবে সামলে না নিলে শরীরে ক্লান্তি, ফুলে যাওয়া বা হজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
সুখের বিষয় হলো—ডিটক্স ডায়েট বা উপোস করা ছাড়াই মাত্র কয়েকটি সহজ নিয়ম মেনে চললেই শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
১. পর্যাপ্ত পানি পান করা
তেল–ঝাল বা নোনতা খাবারের পর শরীর প্রায়ই ডিহাইড্রেটেড বা ভারী লাগে। পানি শরীর থেকে অতিরিক্ত সোডিয়াম বের করতে সহায়তা করে এবং হজম প্রক্রিয়া সহজ করে।
যা করতে পারেন:
· খাবারের কিছুক্ষণ পর ১–২ গ্লাস পানি পান করতে পারেন
· হালকা গরম পানি, লেবু পানি বা গ্রিন টি পান করতে পারেন
· অতিরিক্ত মিষ্টি পানীয় এড়িয়ে চলুন
২. পরের বেলায় হালকা ও ফাইবারযুক্ত খাবার খাওয়া
ফাইবার হজমে সহায়তা করে এবং ভারী খাবারের পরে শরীরকে আরাম দেয়।
উপযুক্ত খাবারের উদাহরণ:
· সেদ্ধ বা স্টীম করা সবজি
· লেবু বা ভিনেগার ড্রেসিংসহ সালাদ
· পেঁপে, আপেল, নাশপাতি বা মাল্টা
· পাতলা ডাল বা সুপ
এই সময়ে আবার তেলে ভাজা বা বেশি কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার এড়িয়ে চলাই ভালো।
৩. পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ করা
খাবার বাদ দিলে রক্তে শর্করা কমে যায় এবং ক্ষুধা আরও বেড়ে যায়। এর বদলে সহজ পাচ্য প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার খেলে শরীর বেশি সময় পূর্ণ অনুভব করে ও শক্তি বজায় থাকে।
উদাহরণ:
· গ্রিলড মাছ বা মুরগি
· সেদ্ধ ডিম
· মুগ ডাল, ছোলা, মটরশুঁটি বা টোফু
৪. কার্বোহাইড্রেট কমিয়ে দিন
যদি আগের বেলায় ভাত-বিরিয়ানি বা পাস্তার মতো কার্বোহাইড্রেট বেশি খেয়ে থাকেন, তবে পরের ৬–৮ ঘণ্টা কার্ব কমিয়ে খান। অল্প পরিমাণে কমপ্লেক্স কার্ব খাওয়া যেতে পারে।
যা খেতে পারেন:
· সামান্য ব্রাউন রাইস
· একটি ছোট লাল আটার রুটি
· অল্প পরিমাণ মিষ্টি আলু
৫. একেবারে না খেয়ে থাকা ঠিক নয়
অনেকে বেশি খাবার খাওয়ার পরে পরবর্তি বেলায় একেবারেই না খেয়ে থাকার চেষ্টা করেন। এতে এর পরে যে বেলায় তিনি খাবার গ্রহণ করেন তখন অতিরিক্ত খেয়ে ফেলার ঝুঁকি থাকে, আবার বিপাকক্রিয়াও ধীর হয়ে যায় যা খাদ্যগ্রহণের ব্যালেন্স আনয়নের পুনরায় বাধা সৃষ্টি করে। এরচেয়ে বরং হালকা কিন্তু পুষ্টিকর খাবার বেছে নেওয়া ভালো।
৬. ১৫–২০ মিনিট হাঁটুন
খাওয়ার পরে হালকা হাঁটা হজমে সহায়তা করে এবং গ্যাস বা অস্বস্তি কমায়। খাওয়ার পরপর জোরালো ব্যায়াম না করাই ভালো।
৭. একটি প্রোবায়োটিক যুক্ত করুন
তেলে ভাজা বা মসলাযুক্ত খাবার অনেক সময় হজমে অস্বস্তি সৃষ্টি করে। প্রোবায়োটিক অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য রাখতে সাহায্য করে।
যা খেতে পারেন:
· টক দই
· চিনি ছাড়া লাচ্ছি বা দইয়ের ঘোল
৮. পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা হালকা খাবারে থাকুন
যদি দুপুরে ভারী খাবার খেয়ে থাকেন, তাহলে রাতের খাবার হালকা রাখুন। আর রাতের খাবার ভারী হলে পরের দিনের নাশতা ও দুপুরের খাবার হালকা নিন।
উপযুক্ত হালকা খাবার:
· সবজি খিচুড়ি
· চিকেন ব্রথ
· ওটমিল
· সবজি সুপ
· সেদ্ধ সবজি
৯. পরের দিন পরিমাণে সতর্ক থাকুন
শরীর সাধারণত রিচফুড সমৃদ্ধ একটা মীলের পরে স্বাভাবিকভাবেই হালকা ক্ষুধা অনুভব করে। সে অনুযায়ী অল্প খাবার ধীরে ধীরে খান।
১০. অপরাধবোধ নয়—ভারসাম্যই মূল কথা
খাবার আনন্দের, সংস্কৃতির এবং সামাজিক জীবনের অংশ। মাঝে মাঝে একটু বাড়তি খাওয়া কোনো সমস্যার সৃষ্টি করে না—যদি পরে দিনের খাবারগুলোর ভারসাম্য ঠিক রাখা যায়।
শেষ কথা
এক বেলার রিচফুড বা অতিরিক্ত খাবার আপনার স্বাস্থ্যের ক্ষতি করবে না। গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেই খাবারের পর দিনের বাকি সময় কীভাবে আপনার প্লেট সাজাচ্ছেন। পর্যাপ্ত পানি, ফাইবার, লিন প্রোটিন, কম কার্বোহাইড্রেট এবং সামান্য হাঁটাচলা—এই মিলিত অভ্যাসগুলো শরীরকে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনে এবং আপনাকে রাখে সতেজ ও সুস্থ।
-ক্লিনিকাল ডায়েটিশিয়ান
সানজিদা শারমীন
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0