রক্তাক্ত প্রতিশোধ

একটা রহস্যময় খুন, সন্দেহের তীর জাকিয়ার দিকে। সে কি সত্যিই খুনী? নাকি তাকে তুর্পের তাস বানিয়ে আসলে খেলা খেলছে অন্য কেউ?

ফেব্রুয়ারী 2, 2026 - 21:25
 0  3
রক্তাক্ত প্রতিশোধ
একটা রহস্যময় খুন, সন্দেহের তীর জাকিয়ার দিকে। সে কি সত্যিই খুনী? নাকি তাকে তুর্পের তাস বানিয়ে আসলে খেলা খেলছে অন্য কেউ?

রক্তাক্ত প্রতিশোধ
খাদিজা আরুশি আরু
পর্বঃ৩


বেশ কিছুক্ষণ যাবত জাকিয়ার ফ্লাটের কলিংবেল বাজছে, ঘুম ঘুম চোখে একবার তাকিয়ে আবারও চোখ বন্ধ করে নিলো জাকিয়া। ডাক্তার তাকে হাই পাওয়ারের ঘুমের ঔষধ দিয়েছে তবে তাতে লাভের লাভ কিছু হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। বাসায় দরজা খোলার মতো কেউ নেই বিধায় ঘুম চোখেই উঠে দরজার কাছে গেলো জাকিয়া। কোনো মতে দরজা খুলেই সোফায় গা এলিয়ে দিলো সে। 

তন্ময় ভেতরে এসে কিছুটা অস্বস্তিবোধ করলো, জাকিয়াকে তা বুঝতে দিলে চলবে না তাই এগিয়ে গিয়ে জাকিয়ার মুখোমুখি সোফাটায় বসলো তন্ময়। কিছুক্ষণ বসে থাকার পর সে লক্ষ্য করলো, জাকিয়া সোফায় বসেই ঘুমচ্ছে। একবার ডাকবে ভেবেও পরে আর ডাকলো না বরং সে সম্পূর্ন ফ্লাটটায় তল্যাশী শুরু করলো... একটা সময় তন্ময়ের চোখ গেলো জানলার ভাঙ্গা কাঁচটায়, দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে কেউ ঢিল মেরে ভেঙ্গেছে কাঁচটা আর ভাঙ্গাটা নতুন।

তন্ময় জাকিয়ার বেডরুম সার্চ করার সময় টেবিলের উপর জাকিয়ার ডাক্তারের স্লিপ দেখে তড়িঘড়ি নিজের মোবাইলে একটা ছবি তুলে নিলো তারপর বের হয়ে গেলো... বের হবার সময় সে ঘুমন্ত জাকিয়ার দিকে ফিরে তাকালো আর এক রহস্যময় হাসি হেসেই দরজাটা লক করে বেরিয়ে গেলো।

সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আপনমনে তন্ময় বললো, "লক দরজার এই এক সুবিধা, কেউ ভেতর থেকে লক না করলেও লক করা যায়"! হঠাৎ তার চোখ পড়লো সিঁড়ি দিয়ে তড়িঘড়ি উঠতে থাকা মানুষটার দিকে। তন্ময়কে দেখেই লোকটা থেমে গেলো, অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষের সামনে পড়লে যেমন মুখাভঙ্গী হয় অনেকটা তেমন চেহারা করে লোকটা জিজ্ঞেস করলো,

-আপনাকে আগে এ এপার্টমেন্ট দেখি নি তো। কতো নম্বর ফ্লাট আপনার?

তন্ময় লোকটাকে বোঝার চেষ্টা করছিলো, কিছুক্ষণ সরু দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে বললো,

-আমি এ বাড়িতে থাকি না, ইনভেস্টিগেশন এর জন্য এসেছি। আপনাকে তো এ এপার্টমেন্টে আগে দেখি নি, মানে...
-আরে আপনি সেই এস.আই.! সত্যিই, ঘটনাটা কি সাংঘাতিক ছিলো, একটা বাচ্চা মেয়ে... আরে আমার পরিচয়ই তো দিলাম না। আমি জাবেদ, ওই খুনী মেয়েটা যে ফ্লাটে থাকে তার পাশের ফ্লাটটা আমার কলিগের। প্রায়ই এ বাড়িতে আমরা আড্ডা দেই, আসলে ব্যাচেলর ফ্লাট তো...

কথাটা শুনে তন্ময় হুট করে প্রশ্ন করলো,

-যেদিন বাচ্চাটার মার্ডার হলো সেদিন রাতে কি আপনি এ বাড়িতে ছিলেন?
-না, সেদিন আমি অফিসের একটা কাজের জন্য খুলনায় গিয়েছিলাম। তবে এটা ঠিক যে, মেয়েটা বেশ অহংকারী এবং রগচটা।

কথাটা শুনে তন্ময় আড়চোখে তাকালো লোকটার দিকে, লোকটার কথা বুঝার চেষ্টা করলো... কিন্তু না বুঝতে পেরে বললো,

-আপনার কেনো মনে হলো যে, মিস জাকিয়া অহংকারী এবং রগচটা? অন্য কেউ তো তার সম্পর্কে এ জাতীয় মন্তব্য করে নি কখনো।
-কারন তারা জানে না এ মেয়ের সত্যিটা।

তন্ময় ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,

 -আপনি জানেন?
-অবশ্যই।

তন্ময় বেশ আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

-কি জানেন আপনি মিস জাকিয়ার সম্পর্কে?
-আমার যে বন্ধুর ফ্লাট সে বন্ধু ওই মেয়েকে পছন্দ করতো, তো একদিন এক রেস্টুরেন্টে দেখা করে বিয়ের প্রস্তাব দিলে সঙ্গে সঙ্গে সে আমার বন্ধুকে চড় দিয়েছিলো, এমনকি যা তা বলে অপমানও করেছে। অথচ আমার বন্ধুকে ভদ্রভাবে না বলে দিলে সে আর কখনো তাকে বিরক্ত করতো না। এতোটা অহংকার আর রাগ তো ভালো মানুষের থাকে না। সেদিনের আগে আমার বন্ধুও তাকে শান্ত মেয়ে ভাবতো। আমার তো এরপর থেকেই মনে হয় এ মেয়ে নেশাখোর, নতুবা সমাজে প্রতিষ্ঠিত একটা ছেলেকে কেউ না বলে!

তন্ময় মুচকি হেসে বললো,

-অনেক উপকার হলো আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে মি. জাবেদ। নতুবা সাসপেক্ট এর এই দিকটা তো অজানাই থেকে যেতো।

জাবেদ মুচকি হেসে বললো,

-প্রকৃত খুনী শাস্তি পাক এটাই তো আমার বা আপনার মূল চাওয়া হওয়া উচিত তাই না? আমি কেবল একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে যতোটুকু সাহায্য করতে পেরেছি তা করেছি। আমার সঙ্গে এই সামান্য কথোপকথনে আপনার যদি বিন্দুমাত্র সাহায্য হয় তবে আমি সন্তুষ্ট।
-আসছি, আশা করি খুব শীঘ্রই আসল খুনী ধরা পড়বে।
-বেস্ট অফ লাক।
-থ্যাংকস...


ব্লাড টেস্ট রিপোর্ট হাতে বসে আছে তন্ময়, তার অনুমান সঠিক প্রমাণিত হবে ভাবে নি সে। এপার্টমেন্ট থেকে ফেরার পর একজন লেডি কনস্টেবলকে ডাক্তারের সঙ্গে গিয়ে জাকিয়ার ব্লাড সেম্পল আনতে বলেছিলো তন্ময়। রিপোর্ট আসার পর তন্ময় ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইলো। দীর্ঘদিন যাবত মেয়েটা ড্রাগ নিচ্ছে অথচ কেউ বুঝতে পারে নি! ড্রাগটা খুব কম পরিমানে প্রতিদিন তার শরীরে গেছে। কিন্তু অদ্ভুত হলেও সত্য যে ওই ঘটনার পর থেকে তার শরীরে কোনো প্রকার ড্রাগস যায় নি। 

তন্ময়কে চিন্তিত দেখে কুঞ্জ বললো,

-স্যার, মেয়েটাকে ড্রাগ এডিক্ট তো কখনোই মনে হয় নি। 
-আমারও মনে হয় নি প্রথমে কিন্তু রিপোর্ট তো ভুল বলছে না।
-স্যার, এমন কি হতে পারে না যে মেয়েটা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় বাচ্চাটাকে খুন করেছে?
-হতেই পারে, এ ফিল্ডে আসার পর কম ক্রিমিনাল তো দেখি নি।
-স্যার, মেয়েটার ব্যাপারে কি আরও খোঁজ নেয়া উচিত নয়?
-অবশ্যই উচিত, আচ্ছা তার বাসার কাজের লোক কি যেনো নাম...
-স্যার, নাসিমা...
-হুম, নাসিমা... তাকে ডেকে পাঠাও, আমার তার কাছে কিছু জানার আছে...


নিজের ঘরের ভাঙ্গা জানলার সামনে শান্তভাবে বসে আছে জাকিয়া, নিজের সঙ্গে লড়তে লড়তে বর্তমানে সে ক্লান্ত। জাকিয়ার চোখের কোণ বেয়ে নিরবে জল পড়ছে, আজ অফিসে যাবার পর তার মনে হলো সে আগের মতো কাজ করতে পারছে না। তার কাজ করতে অস্বস্তিবোধ হচ্ছে, তার কলিগরাও তার সঙ্গে স্বাভাবিক হতে পারছে না। অবশ্য এই নতুন অস্তিত্বটা সে নিজেও বুঝে উঠতে পারছে না। 

একবার মনে হচ্ছে তার এই লক্ষ্যহীন জীবন রেখে লাভ কি! তার থেকে থানায় গিয়ে স্বীকার করে নিক যে সে খুনী... পরবর্তীতে মনে হচ্ছে তার এ কাজ করার মানে হলো একজন খুনীকে বাঁচিয়ে দেয়া... একই ভুল জীবনে দ্বিতীয়বার করার মন মানসিকতা তার নেই আবার নিজেকে বয়ে চলবার শক্তিটাও সে পাচ্ছে না। 

ইদানিং জাকিয়া নিজের মাঝে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ্য করছে, তার বড্ড তেষ্টা পাচ্ছে... যে তেষ্টা পানির দ্বারা মেটে না, এ কেমন তেষ্টা তা জাকিয়া বুঝতে পারছে না। মনে হয় পুরো শরীর জ্বালা করছে, কিন্তু এ জ্বালা কি করে কমবে তা সে বুঝতে পারছে না। গতকাল রাতে ঘুমের ঔষধ খেয়ে ঘুমালেও সকাল থেকে ছটফটানিটা আবার বেড়েছে। 

চা খাবো চা খাবো করেও বানানো হচ্ছে না, তার মনে হচ্ছে কেউ জেনে বুঝে তাকে অন্ধকার গহ্বরে তলিয়ে দিতে চাইছে... কিন্তু কে! একবার কি ওই এস.আই. লোকটার সঙ্গে কথা বলা উচিত? না থাক, লোকটার চরিত্র বিশেষ ভালো বলে মনে হচ্ছে না। নতুবা প্রথম দেখায় কোনো মেয়ের গলার চেইনের প্রশংসা করে নাকি কেউ! নিশ্চয়ই লকেট দেখার বাহানায় ক্লিভেজ দেখার চেষ্টা করছিলো... জাকিয়া একা একাই বললো, "পৃথিবীর সকল পুরুষই চরিত্রহীন, তাদের কাছে নারী দেহই সব... সেই দেহের মাঝে লুকায়িত মন নামক সামন্য বস্তুটির খোঁজ কেউ করে না"!

এক নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস বাতাসে বিলীণ হয়ে গেলো অথচ জাকিয়া জানলোই না কালো বিড়ালের মতো এক অদ্ভুত অশুভ ছায়া তাকে দিন দিন অন্ধকারে তলিয়ে দিচ্ছে... যা প্রতি মুহূর্তে তাকে পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছে!

হঠাৎ তার মনে পড়ে গেলো কিছুদিন আগের ঘটনাটা, কেউ একজন তার ফ্লাটের দরজার কড়া নেড়েছিলো... সে ঘুম ঘুম চোখে দরজা খুলেছিলোও কিন্তু ঘুমের ঔষধের জন্য আবার সোফাতেই ঘুমিয়ে পড়ে... কে এসেছিলো তার মনে পড়ছে না তবে কেনো যেনো তার মনে হলো তার ভীষণ পরিচিত কেউ এসেছিলো। হতে পারে তা মনের ভুল কারন ওই ঘটনার পর থেকেই সে বারংবার সেই মুখটি দেখছে... কল্পনা করছে... মানুষটা যেমনই হোক, একসময় তো তার পাশে ছিলো! জাকিয়া খোলা আকাশের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখেই স্বগতোক্তি করলো, "হাসিব"!

চলবে...

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0
Khadiza Arushi Aru সখের বশে লেখালেখি শুরু করলেও বর্তমানে তা আর সখ নেই, নেশা হয়ে গেছে। নিজের অনুভূতি, চিন্তাধারা, অভিজ্ঞতাকে অন্যের দ্বারপ্রান্তে সুকৌশলে পৌঁছে দেয়াই হয়তো আমার লিখে যাবার অনুপ্রেরণা! আমার প্রথম সম্পাদিত বই, "নবধারা জল" এবং প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস, "সূর্যপ্রভা"