বাংলাদেশে স্নাতকদের কর্মসংস্থান: কোন বিভাগের শিক্ষার্থীরা এগিয়ে?
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার দরজা পেরিয়ে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী প্রতি বছর স্নাতক ডিগ্রি হাতে নিয়ে কর্মজগতে পা রাখেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সবাই কি সমানভাবে সফল হচ্ছেন? বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপের আলোকে দেখা যায়, বিজ্ঞান, প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) এবং ব্যবসায় শিক্ষার স্নাতকরা কর্মক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে। অন্যদিকে, মানবিকতা, শিল্পকলা এবং কিছু সামাজিক বিজ্ঞানের স্নাতকদের পথটা বেশ কঠিন।
কর্মসংস্থানের চিত্র: কে এগিয়ে, কে পিছিয়ে?
২০২৪ সালের হিসেবে বাংলাদেশে সামগ্রিক কর্মসংস্থানের হার প্রায় ৫৯%, যা ২০২৫ সালে ৬২% ছাড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু স্নাতকদের ক্ষেত্রে ছবিটা ততটা উজ্জ্বল নয়। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কলেজগুলোর স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২৮% ছাড়িয়েছে, যেখানে মহিলাদের মধ্যে এই হার ৩৪% এর বেশি। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বেকারত্ব ১১%, এবং উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে এটি ২৮% পর্যন্ত। বিজ্ঞান বিভাগের স্নাতকরা, বিশেষ করে গণিত, পরিসংখ্যান এবং প্রকৌশলের কিছু শাখার শিক্ষার্থীরা, কর্মক্ষেত্রে বেশি সফল। তাদের মধ্যে মাত্র ৩৪% চাকরি পান, তবে তাদের বেতন তুলনামূলকভাবে বেশি—গড়ে মাসিক ১৪,২৬৪ টাকা। তথ্যপ্রযুক্তি এবং উৎপাদন খাতে তাদের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। ব্যবসায় শিক্ষার স্নাতকরা, যারা অর্থায়ন, হিসাববিজ্ঞান বা মার্কেটিং নিয়ে পড়েন, তারাও ভালো অবস্থানে আছেন। তাদের কর্মসংস্থান হার প্রায় ৩১%, এবং অর্থায়ন খাতে গড় বেতন ১৩,৩২০ টাকা। অন্যদিকে, মানবিকতা এবং সামাজিক বিজ্ঞানের স্নাতকদের অবস্থা করুণ। ইতিহাস, রাজনীতি বিজ্ঞান বা বাংলা বিভাগের স্নাতকদের মধ্যে কর্মসংস্থান হার মাত্র ২৬-২৯%। অনেকেই শিক্ষকতার মতো নিম্ন-বেতনের চাকরিতে আটকে যান, যেখানে গড় বেতন মাসিক ৯,০২০ টাকা। শুধু তাই নয়, তাদের মধ্যে মাত্র ২০% তাদের পড়াশোনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ চাকরি পান। ঔষধ এবং ফার্মাসি স্নাতকরা অবশ্য একটি উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। স্বাস্থ্য খাতে তাদের চাহিদা ব্যাপক, এবং কর্মসংস্থান হার ৮৫-৯০% এর কাছাকাছি।
কেন এই বৈষম্য?
এই পার্থক্যের পেছনে রয়েছে বেশ কিছু কারণ। বাংলাদেশের অর্থনীতি তৈরি পোশাক, তথ্যপ্রযুক্তি এবং উৎপাদন খাতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে, বিজ্ঞান, প্রকৌশল এবং আইটি বিভাগের স্নাতকরা এই খাতগুলোর চাহিদার সাথে মিলে যাওয়া দক্ষতা অর্জন করে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বিইউইটি) বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ-র স্নাতকরা তাদের বিশেষায়িত জ্ঞানের কারণে দ্রুত চাকরি পান। ব্যবসায় শিক্ষার স্নাতকরা ব্যাংকিং এবং অর্থায়ন খাতে শক্ত অবস্থান ধরে রাখেন। কিন্তু মানবিকতা ও সামাজিক বিজ্ঞানের পাঠ্যক্রম প্রায়শই তাত্ত্বিক। এগুলো বাজারের চাহিদার সাথে খাপ খায় না। ফলে, এই বিভাগের স্নাতকরা শিক্ষকতা বা অপ্রাসঙ্গিক কাজে নিয়োজিত হন। এছাড়া, ইংরেজি এবং তথ্যপ্রযুক্তির দক্ষতার অভাব তাদের পিছিয়ে দেয়। মহিলা স্নাতকদের জন্য এই চ্যালেঞ্জ আরও তীব্র—তারা পুরুষদের তুলনায় ২১% কম বেতন পান।
পথ কোনদিকে?
এই সমস্যা মোকাবিলায় কিছু পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবহারিক দক্ষতার ওপর জোর দিতে হবে। জাপান বা মালয়েশিয়ার মতো দেশে শিক্ষা ব্যবস্থা শিল্পের চাহিদার সাথে সংযুক্ত। বাংলাদেশেও এমন পাঠ্যক্রম গ্রহণ করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্যারিয়ার সেন্টার এবং ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম চালু করা প্রয়োজন। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়িয়ে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে সেতু তৈরি করা যায়। এছাড়া, লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য কমাতে নীতিগত পদক্ষেপ নিতে হবে।
শেষ কথা
বাংলাদেশে স্নাতকদের কর্মসংস্থানে সাফল্য নির্ভর করে তাদের বিভাগ, শিক্ষার মান এবং শিল্পের চাহিদার ওপর। বিজ্ঞান, প্রকৌশল এবং ব্যবসায় শিক্ষার স্নাতকরা বাজারে এগিয়ে থাকলেও, মানবিকতার স্নাতকদের জন্য পথটা কঠিন। শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিল্পের সাথে সহযোগিতা বাড়িয়ে আমরা প্রতিটি স্নাতকের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারি। তরুণদের হাতে দেশের ভবিষ্যৎ—এখনই সময় তাদের পথ সুগম করার।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0