কিশোর-কিশোরীদের মনের ভাষা বোঝা: মানসিক চাপ, সাহায্যের সংকেত এবং বাবা-মায়ের ভূমিকা

মে 4, 2025 - 15:52
নভেম্বর 16, 2025 - 14:22
 0  1
কিশোর-কিশোরীদের মনের ভাষা বোঝা: মানসিক চাপ, সাহায্যের সংকেত এবং বাবা-মায়ের ভূমিকা

কিশোর-কিশোরীদের মন অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই বয়সে তারা মানসিক চাপে পড়ে গেলেও তা প্রকাশ করতে পারে না। কখনও আচরণে পরিবর্তন, একাকীত্ব, অতিরিক্ত রাগ বা হঠাৎ ফলাফলে অবনতি—এসব হতে পারে সাহায্যের নিঃশব্দ আহ্বান। বাবা-মায়েদের উচিত সন্তানের অনুভূতিগুলোর প্রতি সতর্ক থাকা, মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং বন্ধুর মতো পাশে দাঁড়ানো। কেবল আদেশ নয়, দরকার সহানুভূতি ও নির্ভরতা। মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হবে আরও শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী। সময়মতো সাড়া দিলে অনেক বড় সমস্যা এড়ানো সম্ভব। সন্তান কথা না বললেও, তারা চায়—তাদের কেউ বোঝার চেষ্টা করুক।

লুসি বলে, সে সবসময়ই একটু চিন্তিত থাকত, কিন্তু প্রায় দুই বছর আগে তার উদ্বেগ প্রকট আকার ধারণ করে এবং সে প্যানিক অ্যাটাকের শিকার হতে শুরু করে।

“আমি বুঝতেই পারছিলাম না কী হচ্ছে, আমার বাবা-মাও জানতেন না,” বলে ১৫ বছর বয়সী এই কিশোরী। “এটা খুব ভীতিকর ছিল। এই আক্রমণগুলো হঠাৎ করেই হতো, কোনও পূর্বসংকেত ছাড়াই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে ওঠে, আমি জনসমক্ষে প্যানিক অ্যাটাকের মুখোমুখি হতে থাকি।”

ধীরে ধীরে লুসি স্কুলে অনুপস্থিত থাকতে শুরু করে এবং সামাজিক মেলামেশা থেকেও নিজেকে গুটিয়ে নেয়। তার ভাষায়, বাবা-মায়ের জন্য তার এমন সংগ্রাম দেখা অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে উঠেছিল। “আমরা জানতাম না কী করব বা সাহায্যের জন্য কোথায় যাব।”

প্রায় ছয় মাস ধরে লুসি নিজেই তার উদ্বেগ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে, কিন্তু অবশেষে তার পরিবার সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপির (CBT) জন্য অর্থ ব্যয় করবে, যা একটি কথাবার্তা-ভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতি।

লুসির মতে, থেরাপির ফলে তার জীবনে বড় পরিবর্তন আসে। যদিও এখনো মাঝে মাঝে প্যানিক অ্যাটাক হয়, তবে তা অনেক কম এবং সে আবার স্কুলে যেতে পারছে ও আগের মতোই নিজের পছন্দের কাজ করছে।

লুসির অভিজ্ঞতা বিরল নয়। NHS-এর তথ্য অনুসারে, ৮ থেকে ২৫ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রতি পাঁচজনের একজন কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগে।

এত বেশি সমস্যা কেন?
কিশোর বয়সে মানসিক চ্যালেঞ্জগুলো বেড়ে যায় কারণ এই সময় তরুণরা নিজেদের বিকাশ, পরীক্ষার চাপ, বন্ধুত্ব ও সম্পর্কজনিত জটিলতার মুখোমুখি হয়।

কিংস কলেজ লন্ডনের শিশু ও কিশোর মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আন্দ্রেয়া ড্যানিস বলেন, জৈবিক কারণগুলোও মানসিক সমস্যা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে।

“কিশোরদের মস্তিষ্ক এখনও পুরোপুরি পরিপক্ব হয় না। যে অংশটি আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে, তা দায়িত্বশীলতা ও বিচারবুদ্ধির জন্য দায়িত্বশীল অংশের চেয়ে আগে বিকশিত হয়। এর মানে তরুণরা আবেগগুলো খুব তীব্রভাবে অনুভব করতে পারে, যদিও সেগুলো নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা তখনো সম্পূর্ণ গঠিত হয়নি—যা অভিভাবকদের কাছে প্রায়ই আচরণগত ওঠানামা হিসেবে দেখা দেয়,” তিনি ব্যাখ্যা করেন।

তিনি আরও বলেন, বয়ঃসন্ধিকালেই এসব সবচেয়ে প্রকট হয়, কারণ হরমোনগত পরিবর্তন ও শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ির পরিবর্তন ঘুমের ধরনে প্রভাব ফেলে এবং আবেগ আরও অনিয়ন্ত্রিত করে তোলে।

bd2bead0 2670 11f0 b26b ab62c890638b.png
bd2bead0 2670 11f0 b26b ab62c890638b.png

কখন এবং কীভাবে সহায়তা করবেন
তাহলে প্রশ্ন হলো—স্বাভাবিক মানসিক ওঠানামা কোনগুলো, এবং কখন তা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছায়, যা পেশাদার সহায়তার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করে?

প্রফেসর ড্যানিস বলেন, অনেক অভিভাবকের জন্য এই পার্থক্য বোঝা কঠিন। তিনি কিছু আচরণকে স্বাভাবিক বয়ঃসন্ধিকালীন বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করেন, যেমন:

  • মাঝে মাঝে রাগ বা খিটখিটে মেজাজ
  • কখনও কখনও একাকীত্ব বা গোপনীয়তার চাহিদা
  • বন্ধুদের গ্রহণযোগ্যতা বা পড়াশোনার ফলাফল নিয়ে উদ্বেগ

পরিচয় এবং স্বাধীনতা নিয়ে অনুসন্ধান
কিশোর-কিশোরীরা প্রায়ই নিজেদের পরিচয় ও স্বাধীনতা নিয়ে নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। এ সময়ে তাদের আবেগের প্রতিক্রিয়া অনেক সময় অপ্রত্যাশিত বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হতে পারে। অধ্যাপক ড্যানিস মনে করেন, যদি এসব আচরণ দৈনন্দিন জীবনের ওপর বড় ধরনের প্রভাব না ফেলে, তবে বাবা-মা হিসেবে সন্তানকে সহানুভূতি ও ধৈর্যের সঙ্গে সমর্থন করা উচিত।

সবচেয়ে প্রচলিত কিশোর-কিশোরীদের মানসিক সমস্যা হলো খিটখিটে মেজাজ ও উদ্বেগ। মেজাজজনিত সমস্যার ক্ষেত্রে অধ্যাপক ড্যানিস বলেন, সুস্থ জীবনযাপন রুটিন বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—যেমন যথাযথ ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা এবং বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা। সেই সঙ্গে সন্তানদের পছন্দের কাজ যেমন ঘোরাঘুরি, খেলা বা অন্যান্য আনন্দদায়ক কার্যকলাপ যুক্ত করা উচিত।

তিনি বলেন, “তাদের অনুভূতি স্বীকৃতি দিতে সহায়তা করুন, সমস্যা বিশ্লেষণ করে সমাধান বের করার জন্য পাশে থাকুন।”

উদ্বেগের ক্ষেত্রে, কিছু নির্দিষ্ট শান্তির কৌশল কার্যকর হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে নিয়ন্ত্রিত শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, গ্রাউন্ডিং (যার মাধ্যমে কেউ নিজের চারপাশের জিনিসে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে), এবং মননশীলতা চর্চা।

অধ্যাপক ড্যানিস সতর্ক করেন, “অতিরিক্ত আশ্বাস দিয়ে যাওয়ার প্রবণতা থেকে দূরে থাকুন।” বরং, উদ্বেগ কীভাবে মোকাবিলা করা যায় তা শেখানো উচিত এবং সেই সঙ্গে সন্তানের সঙ্গে উদ্বেগের বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা করে তা পর্যবেক্ষণ করাও জরুরি। “উদ্বেগ কমাতে দিনে একবার নির্ধারিত 'উদ্বেগের সময়' নির্ধারণ করে তখন বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা বা লেখার অভ্যাস গড়ে তোলা উপকারী হতে পারে।”

মানসিক দৃঢ়তা গড়ে তোলা
YoungMinds নামক সংস্থার অভিভাবক সহায়তা হেল্পলাইনের পরিচালক স্টিভি গোল্ডিং জানান, উদ্বেগই হলো সেই সমস্যা যার কারণে তারা সবচেয়ে বেশি কল পেয়ে থাকেন।

“অনেক শিশুই উদ্বেগ এবং মাঝে মাঝে প্যানিক অ্যাটাকের ভুক্তভোগী। এটা বাবা-মা’র জন্য খুব চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতি। তারা প্রায়ই সিদ্ধান্তহীনতা ও আত্মবিশ্বাসের ঘাটতিতে ভোগেন, বুঝতে পারেন না কী করবেন। আমরা অনেক বাবা-মার কাছ থেকেই এমন কল পাই, যারা দেখছেন তাঁদের সন্তান মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে, অথচ তাঁরা বুঝে উঠতে পারছেন না কীভাবে সহায়তা করবেন বা কোথায় যাবেন।”

তিনি বলেন, “আমরা অভিভাবকদের প্রধান যে পরামর্শ দিই তা হলো—সন্তানের সঙ্গে খোলামেলা যোগাযোগ করুন। জানতে চান, কী তাদের কষ্ট দিচ্ছে। এবং যদি তারা আপনাকে বলার মতো অবস্থায় না থাকে, জিজ্ঞেস করুন, এমন কেউ আছে কি যার সঙ্গে তারা কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।”

মিসেস গোল্ডিং পরামর্শ দেন, অভিভাবকরা যেন সন্তানের স্কুলের সঙ্গেও যোগাযোগ করেন, কারণ শিক্ষকরা অনেক সময় সমস্যাগুলোর লক্ষণ আগে থেকেই দেখতে পারেন।

তবে তিনি আরও বলেন, “শিশুদের ব্যক্তিগত পরিসর দরকার—সবকিছু দ্রুত ঠিক করার চেষ্টা থেকে বিরত থাকতে হবে। তারা যা বলছে, শুধু মনোযোগ দিয়ে শুনুন এবং প্রতিফলন করুন।”

শিশু মনোবিজ্ঞানী ডঃ স্যান্ডি মান একমত পোষণ করে বলেন, অনেক অভিভাবকের স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে তাদের সন্তানের সমস্যা দ্রুত সমাধান করতে চাওয়ার, কিন্তু সবসময় সেটিই সবচেয়ে ভালো উপায় নয়।

তিনি অভিভাবকদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন:

  • জীবনে ঘটে যাওয়া ছোট-বড় ব্যর্থতাগুলোর ব্যাখ্যা দিন, আপনার নিজের ভুলের উদাহরণ শেয়ার করুন
  • ভুলকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে শেখান
  • সন্তানকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিন এবং বোঝান যে নিজের সুখের দায়িত্ব প্রধানত তার নিজের
  • সন্তান যদি অতি নেতিবাচক বা দ্বৈত মানসিকতায় (সব ভালো বা সব খারাপ ভাবা) ভোগে, তা চ্যালেঞ্জ করুন

“আমরা মাঝে মাঝে এমন আচরণ করি, যেন শিশুরা নিজেদের সমস্যা সমাধান করতে পারে না, তাই আমরা খুব দ্রুত হস্তক্ষেপ করি বা চিকিৎসার দিকে ঝুঁকি,” বলেন ডঃ মান।

কখন পেশাদার সহায়তা দরকার
তবে ডঃ মান ও প্রফেসর ড্যানিস উভয়েই জোর দিয়ে বলেন, যখন প্রয়োজন হয় তখন পেশাদার সাহায্য নেওয়ায় কোনো লজ্জা থাকা উচিত নয়।

ডঃ মান বলেন, “লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। আমাদের শুধু বুঝতে হবে কখন নিজেরা সমাধান খুঁজব আর কখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া উচিত।”

তারা কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণের কথা বলেন, যেগুলো দেখা গেলে অভিভাবকদের দ্রুত সাহায্য চাইতে হবে:

  • আত্ম-আঘাত করা বা আত্মহত্যার চিন্তা
  • ঘুম বা খাদ্যাভ্যাসে বড় পরিবর্তন
  • আচরণে হঠাৎ বড় ধরনের পরিবর্তন বা হতাশার স্পষ্ট লক্ষণ
  • প্রতিদিনের কাজ যেমন স্কুলে যাওয়া বা বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগে ব্যাঘাত
  • আগে যে কাজগুলোতে আনন্দ পেত, সেগুলো থেকে নিজেকে পুরোপুরি গুটিয়ে নেওয়া

রয়েল কলেজ অফ সাইকিয়াট্রিস্টস-এর শিশু ও কিশোর অনুষদের চেয়ার ডঃ এলেন লকহার্ট বলেন, বাবা-মায়েদের উচিত সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলাখুলি কথা বলা এবং সহায়তা চাওয়ার ক্ষেত্রে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করা।

তিনি বলেন, “আমরা জানি অনেক শিশু মানসিকভাবে সংগ্রাম করে। এই ধারনা যে স্কুলজীবনই জীবনের সেরা সময়—এটা বাস্তব নয়।”

তবে NHS-এর শিশু মানসিক স্বাস্থ্যসেবার দীর্ঘ প্রতীক্ষার কারণে কোথায় এবং কীভাবে সহায়তা পাওয়া যাবে, তা জানা কঠিন—বিশেষ করে যখন ব্যক্তিগত থেরাপির খরচ বহন করা সম্ভব না হয়।

সাধারণভাবে, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিলে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে যোগাযোগ করা উচিত নিজের জিপি (GP) বা মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা দলের সঙ্গে, যারা অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় স্কুলগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। NHS মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবায় রেফারাল ছাড়াও, তারা আপনাকে স্থানীয় বিভিন্ন সংস্থা বা চ্যারিটির সঙ্গে সংযোগ করাতে পারে, যারা প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করে থাকে।

ডঃ লকহার্ট বলেন, “স্কুল নিজেরাও সহায়তা করতে পারে—অনেক স্কুলেই কাউন্সেলিং বা সহায়তা পরিষেবা চালু রয়েছে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “আমি মনে করি অনেক বাবা-মা তাদের ভূমিকার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারেন না, এমনকি যখন তাদের সন্তান থেরাপির জন্য অপেক্ষা করছে বা চিকিৎসা নিচ্ছে। বাড়িই হলো সেই পরিবেশ যেখানে তারা বেশিরভাগ সময় কাটায়—তাই অভিভাবকরাই সমাধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।”

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0
jakiahbithi যাকিয়াহ ফাইরুজ (বীথি)