ভদ্র সন্তান গর্বিত বাবা-মা
প্রত্যেক বাবা-মায়েরই স্বপ্ন থাকে—তাদের সন্তান একদিন বড় হয়ে ভালো চাকরি করবে, সমাজে সম্মান অর্জন করবে। মানুষ এক নামেই চিনবে। বাবা রাস্তায় হাঁটলে কেউ বলবে, “দেখো, অমুকের ছেলে এখন কত বড় অফিসার!”
কিন্তু যদি সেই ছেলে বা মেয়ে খারাপ পথে চলে যায়, তাহলে বাবা-মা আর মাথা উঁচু করে চলতে পারেন না। সমাজের মানুষ নানান ধরনের কথা বলতে শুরু করে। কেউ নিজের ভুল না দেখে বরং অন্যের দোষ খুঁজে বেড়ায়।
অনেকেই ভাবে, অন্যকে খোঁচা মেরে কথা বললে বুঝি খুব বুদ্ধিমান প্রমাণিত হওয়া যায়। কিন্তু এমন কথায় যে অন্য কেউ কষ্ট পায়—তা অনেকেই বুঝতে চায় না।
সন্তান যখন ছোট থাকে, তখন থেকেই তাকে সদাচরণ শেখানো উচিত। কীভাবে বড়দের সম্মান করতে হয়, কিভাবে সালাম দিতে হয়, তা শেখানো প্রয়োজন। বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন এলে ভালো ব্যবহার করা, কথা বলা, মিষ্টভাষী হওয়া—এই গুণগুলো শিশুকে শেখাতে হবে।
দুঃখজনকভাবে, অনেক বাবা-মা এসব শেখান না। ফলে তারা নিজেরাই পরে লজ্জায় পড়েন।
রাস্তায় হেঁটে যেতে যেতে অনেক সময় দেখি—কিছু বাচ্চা দোকান থেকে কিছু কিনে বা বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় খেয়ে বেড়াচ্ছে। এটি একদমই ঠিক নয়। মা যদি একটু শাসনের চোখে বলে, "বাড়িতে বসেই খাবে", তাহলে সে নিশ্চয়ই শোনে।
আবার দেখা যায়, কিছু মা রাস্তায় দাঁড়িয়ে বা অন্যের বাড়িতে গিয়ে বাচ্চাকে খাইয়ে দিচ্ছেন। যেন ঘরে বসিয়ে খাওয়ানোটা খুব কষ্টকর একটা কাজ! কখনও কখনও, মা বাচ্চাকে নিয়ে অন্যের বাড়িতে যান, আর সেই বাড়ির মানুষ হয়তো তখন খাওয়াদাওয়ায় ব্যস্ত। তখন বাচ্চাটি খাবার দেখে কান্নাকাটি করে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক শিক্ষিত মা-বাবাও এসব বিষয়ে উদাসীন। সন্তানের আচরণ ঠিক না হলে অন্য কেউ কিছু বললেই তারা রেগে যান। অথচ উচিত ছিল—নিজ সন্তানকে সংশোধন করা।
এক বাচ্চা আরেক বাচ্চাকে মারছে, অথচ তার মা নিজ সন্তানকে শাসন না করে উল্টো অন্য বাচ্চাকে ধমক দিচ্ছে। এতে নিজের সন্তান আশকারা পেয়ে যায়। আবার দেখা যায়, কেউ যদি গালাগালি শিখে এসে মায়ের সামনেই তা বলে ফেলে, তখন মা সেটা ভুল ধরিয়ে দেওয়ার বদলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসেন। এতে শিশুটি বেয়াদব হয়ে ওঠে।
অনেক সময় দেখা যায়, সন্তান বাবার পকেট থেকে টাকা চুরি করছে, মা দেখছেন—কিন্তু কিছুই বলছেন না। এতে শিশু দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। সন্তান যদি অন্যায় করে, আর কেউ কিছু বলতে আসে, তখন বাবা-মা বলেন, “আমার সন্তানের ব্যাপারে কিছু বলবেন না।” এতে সন্তান ভাবে, “আমার মা-বাবা তো আমাকেই সাপোর্ট করে। আমি যা খুশি তাই করতেই পারি।”
আদব-কায়দা, ভদ্রতা, নীতি-নৈতিকতা—এসব যদি ছোটবেলা থেকেই শেখানো না হয়, তাহলে বড় হয়ে সেই সন্তান কীভাবে শিখবে?
একজন ভালো সন্তানের জন্য বাবা-মা গর্বিত হন। আর খারাপ সন্তানের জন্য সমাজের কাছে তাদের মাথা নিচু করতে হয়।
শুধু স্কুলে পাঠিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বাবা-মার উচিত খোঁজ নেওয়া—সন্তান পড়াশোনা ঠিকভাবে করছে কি না, স্কুলের স্যার বা ম্যাডামের প্রতি যথাযথ সম্মান দেখাচ্ছে কি না, প্রাইভেট বেতনের বিষয়গুলো ঠিকমতো দেওয়া হচ্ছে কি না।
সন্তান যতই ভালো হোক, এই নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখলে তার মধ্যে একটা দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। সে বুঝে যায়—“আমি যদি খারাপ কিছু করি, তাহলে বাবা-মা জানতে পারবে। শিক্ষকেরা জানাবে।”
তাই সন্তানের প্রতি ভালোবাসা মানে সব কিছু মেনে নেওয়া নয়, বরং তাকে সঠিক পথে চালিত করা। আর সেটা শুরু হোক ঘর থেকেই।
এই ছোট ছোট বিষয়গুলো শিশুর মনে একটা জবাবদিহিতার বোধ তৈরি করে। সে বুঝে যায়—বাবা-মা সবকিছু জানেন, তারা আমার প্রতি যত্নবান। এতে করে সে অন্যায় থেকে নিজেকে দূরে রাখতে চেষ্টা করে।
শুধু পড়ালেখা নয়—নৈতিকতা, সম্মান, আত্মসম্মানবোধ—এই গুণগুলো একজন মানুষকে পূর্ণ করে তোলে। আর এই গুণগুলো শেখানোর সবচেয়ে বড় জায়গা হলো পরিবার।
আজকাল অনেক বাবা-মা সন্তানকে শুধুই পরীক্ষার রেজাল্টে ভালো চাইছেন, কিন্তু তার মনমানসিকতা, ব্যবহার, সমাজের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি কেমন—তা দেখছেন না। অথচ এই মানসিক গঠনই একদিন তাকে প্রকৃত মানুষ করে তুলবে।
বাচ্চা বয়স থেকেই যদি তাকে শিখিয়ে দেওয়া যায়—কারো জিনিসে লোভ করা যাবে না, রাস্তায় খাওয়া ঠিক নয়, মিথ্যে বলা পাপ, বড়দের অপমান করা অনুচিত—তবে সেই শিক্ষাই একদিন তার চারিত্রিক ভিত্তি হবে।
তাই আমাদের উচিত—শুধু ভালো রেজাল্টের পেছনে না ছুটে, সন্তানকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। আর তা শুরু হোক আজ থেকেই, আমাদের ঘর থেকেই।
লেখিকা: জেরিন জাহান দিশা
What's Your Reaction?
Like
1
Dislike
0
Love
1
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
1