ভাট ফুলের ভালোবাসা
সাঈদ খলিশাকুন্ডি গ্রামের ছেলে। (ভাট ফুলের ভালোবাসা) গ্রামের সরল, শান্ত পরিবেশে তার শৈশব-কৈশোর কেটেছে প্রকৃতির কোলে। ভোরবেলায় শিশির ভেজা ঘাসে হেঁটে, আযানের ধ্বনি আর পাখির কিচিরমিচিরে জেগে ওঠাই ছিল তার প্রাত্যহিক রুটিন। রোদে পুড়েছে, বৃষ্টিতে ভিজেছে, গাছে উঠে কাঁঠাল-আম পেড়ে খেয়েছে সে। গ্রামই ছিল তার আত্মা। কিন্তু জীবন থেমে থাকে না। পড়াশোনার গণ্ডি পেরিয়ে সাঈদ কুষ্টিয়া শহরের একটি ব্যাংকে ম্যানেজার পদে চাকরি পেয়ে যায়। নতুন দায়িত্ব, নতুন জীবন। তবে শহরের কোলাহল, যানবাহনের গর্জন, আর নিঃসঙ্গতা তাকে পীড়া দেয়। গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠো পথ, সবুজ ধানের মাঠ, আর সেই নিঃশব্দ বিকেলগুলো...সবই যেন অচিরেই স্মৃতিতে পরিণত হয়। কুষ্টিয়ায় অফিসে প্রথম দিনেই সাঈদের পরিচয় হয় মিতুর সাথে। প্রাণবন্ত, হাসিখুশি এক মেয়ে—দেখতে দেখতে তাদের মাঝে এক গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। মিতু ছিল শহরের হলেও মনে যেন গ্রাম্য সহজ-সরল ছাপ। একদিন বিকেলে মিতু প্রস্তাব দিল, "আজ অফিস শেষে আমরা রেস্টুরেন্টে যাবো। আমার খুব ইচ্ছে করছে। ট্রিট দিবো তোমাকে।" সাঈদ অবাক হলেও সায় দিল। তারা গেল ‘মৌ বন’ রেস্টুরেন্টে। বিরিয়ানি খেয়ে দুজনে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেল কাছের পার্কে। সাঈদ হঠাৎ বলল, "জানো মিতু, শহরটা একদম ভালো লাগে না আমার। কেউ কাউকে চেনে না, বিপদে পড়লেও কেউ এগিয়ে আসে না।" মিতু হেসে জবাব দিল, "যার মনে সহানুভূতি আছে, সে যেখানেই থাকুক—মানুষের পাশে দাঁড়াবেই। তুমি শহরের উপর দোষ দিচ্ছো, কিন্তু নিজের মনটা কি ঠিক আছে?" এই কথাগুলো সাঈদের মনে দাগ কেটে যায়। সে অনুভব করে, পরিবর্তন শুধু বাইরের নয়, ভেতর থেকেও দরকার। হঠাৎ করেই মিতু বলে ওঠে, "তুমি তো গ্রামের ছেলে, আমার কিন্তু গ্রাম ঘোরা নিয়ে অনেক শখ।" সাঈদ হাসল, বলল, "সামনে কোরবানির ঈদের ছুটি। চল, ঈদটা আমার গ্রামে কাটাও। দেখবে কেমন শান্তি!" মিতু কিছুক্ষণ চুপ থেকে মুচকি হেসে বলল, "ঠিক আছে, ঈদের পর আমি তোমার বাড়িতে আসবো।" ঈদের ছুটি এলো। সাঈদ ফিরে গেল তার প্রাণের খলিশাকুন্ডি গ্রামে। মা-বাবার সাথে বসে সে মিতুর কথা বলল। মা শুনে হালকা হাসলেন, "ছেলেটা শহরে গিয়ে বদলে যাচ্ছে দেখি! এখন আবার মেয়েবন্ধুও হয়েছে!" সাঈদ একটু লজ্জা পেলেও মনে মনে ভাবল—এই সম্পর্কের মধ্যে একটা বিশুদ্ধতা আছে। হয়তো এই শহরেই সে খুঁজে পেয়েছে নিজের মতো একজনকে—যে হৃদয় দিয়ে দেখে, আর ছুঁয়ে যেতে পারে তার গ্রামের মাটির সুবাস। ঈদের ছুটিতে মিতু এল সাঈদের গ্রামের বাড়িতে। খলিশাকুন্ডির শান্ত নিঃশব্দ পাড়াগাঁ যেন মিতুর জন্য এক নতুন জগৎ খুলে দিল। সাঈদ তাকে নিয়ে এল নিজের বাড়িতে। সাদামাটা হলেও আত্মার উষ্ণতায় ভরপুর সেই বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়েই মিতু যেন এক প্রশান্তির শ্বাস ফেলল। সাঈদের মা হাসিমুখে এগিয়ে এসে মিতুকে বুকে টেনে নিলেন। "এই যে মিতু মা, এসো এসো। আজ তোমার জন্য কত কী রান্না করেছি!" সত্যিই, ঘরের ভেতর থেকে ছড়িয়ে আসছিল ছাগলের মাংস, গরুর মাংস আর নানা রকম পিঠা-পুলির সুবাস। সাঈদের বাবা নিজের হাতে ফলানো পুঁইশাক, লাউ আর কচুর শাক নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন সকাল থেকেই। কিন্তু মিতু একটু হেসে বলল, "আন্টি, আমি এসব খাব না। আমাকে শুধু কচুর শাক আর লাউয়ের তরকারি রান্না করে দেন।" সাঈদের মা অবাক হয়ে বললেন, "আরে শোন পাগলি মেয়ের কথা! ছুটিতে এসে এসব খাবার বাদ দিয়ে কচুর শাক খাবে?" মিতু মৃদু হাসি দিয়ে উত্তর দিল, "আন্টি, আমি বইয়ে পড়েছি—কচুর শাকে কত উপকারিতা! আর এমন তাজা শাক তো শহরে খুঁজে পাওয়া যায় না।" সাঈদের মা আর কথা না বাড়িয়ে আদর করে বললেন, "আচ্ছা মা, আজই তোমার পছন্দের মতো করে কচুর শাক আর লাউ রান্না করব। খাওয়া শেষে বলতে হবে কেমন হয়েছে!" সত্যি সত্যিই দুপুরে সবাই যখন বিরিয়ানি আর মাংসে মন দিল, তখন মিতু আদর করে খেয়ে নিল ভাত আর কচুর শাক-লাউয়ের তরকারি। তৃপ্তির হাঁসিতে তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বিকেলে সাঈদ মিতুকে নিয়ে বের হলো গ্রামের পথে। কাঁকড়–পাথরের সরু রাস্তা, ধানের ক্ষেতে দোল খাওয়া বাতাস, আর দূরে কিছু গরু চরছে—এসব দেখে মিতু একবার থেমে, আবার হাঁটে। "জানো সাঈদ," মিতু বলল, "তোমার গ্রামটা আমার মনে ধরেছে। শহরের কোলাহল, ধোঁয়া আর মানুষের মুখোশের ভিড়ের থেকে অনেক অনেক ভালো লাগছে এখানে।" সাঈদ মৃদু হাসল। "তাহলে চলো, তোমাকে মাঠে নিয়ে যাই। সন্ধ্যার বাতাসটা এখানে যেন আলাদা। একেকটা শ্বাসে মন ভরে যায়।" মিতু সাঈদের পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলল, "এই জায়গাটা তোমার নয়, এখন আমাদের।" সাঈদের চোখে এক অপূর্ব আলো জ্বলজ্বল করে উঠল। শহরের ক্লান্তি পেরিয়ে, সে যেন আবার নিজের ভেতরের মানুষটাকে খুঁজে পেল এই মিতুর হাত ধরে। সেদিন বিকেলের রোদটা ছিল নরম আর মধুর। ধানের ক্ষেতে দুলছে সোনালি শীষ, আর বাতাসে ভেসে আসছে অজানা এক ফুলের সুবাস। হঠাৎ সাঈদের চোখ পড়ল মাঠের একপাশে—ওখানে ঝোপঝাড়ের মাঝখানে ফুটে আছে অসংখ্য ভাঁটফুল। একধরনের কোমল সাদা ফুল, যেগুলো দেখতে যেমন সুন্দর, গন্ধে তেমনি মাতাল করে। মিতু কৌতূহল নিয়ে বলল, "আচ্ছা সাঈদ, ওই ফুলটা কীসের?" সাঈদ হাসল। "তোমার পছন্দ হয়েছে নাকি?" মিতু লজ্জা মিশ্রিত স্নিগ্ধ হাসিতে বলল, "খুব পছন্দ হয়েছে। এমন গন্ধ শহরে কোথাও পাইনি।" সাঈদ কিছু না বলে বলল, "একটু দাঁড়াও।" তারপর ছুটে গেল মাঠের পাশে। সাবধানে পা ফেলে তুলে আনল ভাঁটফুলের একটা গোছা। ফিরে এসে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল মিতুর সামনে। তার চোখে তখন যেন গ্রাম, শহর, আকাশ—সব কিছু মিলিয়ে একটিই দৃশ্য ফুটে উঠেছে—মিতুর মুখ। নরম কণ্ঠে বলল, "আই লাভ ইউ, মিতু।" মিতুর চোখ ভিজে এল। সে ধীরে হাতে নিল ফুলগুলো, শুঁকে বলল, — "আই লাভ ইউ টু, সাঈদ।" হঠাৎ সাঈদ আবার জিজ্ঞেস করল, — "তুমি সারাজীবন আমার পাশে থাকবে তো?" মিতু একটু চোখ নামিয়ে বলল, — "থাকবো। তবে একটা শর্ত আছে।" সাঈদ অবাক হয়ে বলল, — "কি শর্ত?" মিতু মৃদু হেসে বলল, — "প্রতিদিন আমাকে এই ভাঁটফুল দিতে হবে। আর প্রতিদিন বিকেলে এমন করে আমাকে নিয়ে হেঁটে বেড়াতে হবে, যেমন আজ।" সাঈদ তার দুই হাতের মুঠোয় মিতুর হাত ধরল। — "তোমার প্রতিটি শর্ত আমি হৃদয় দিয়ে পালন করব। কেবল তুমি আমায় ছেড়ে যেয়ো না কখনো।" বাতাসে ভেসে চললো ভাঁটফুলের গন্ধ। এক বিকেলের নিঃশব্দ ঘাসে লেখা হয়ে রইল দুজনের প্রথম প্রেমের কবিতা। লেখিকা: জেরিন জাহান দিশা
What's Your Reaction?
Like
4
Dislike
0
Love
4
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
4