রক্তাক্ত প্রতিশোধ

একটা রহস্যময় খুন, সন্দেহের তীর জাকিয়ার দিকে। সে কি সত্যিই খুনী? নাকি তাকে তুর্পের তাস বানিয়ে আসলে খেলা খেলছে অন্য কেউ?

জানুয়ারী 22, 2026 - 21:05
জানুয়ারী 24, 2026 - 22:05
 0  6
রক্তাক্ত প্রতিশোধ
একটা রহস্যময় খুন, সন্দেহের তীর জাকিয়ার দিকে। সে কি সত্যিই খুনী? নাকি তাকে তুর্পের তাস বানিয়ে আসলে খেলা খেলছে অন্য কেউ?

রক্তাক্ত প্রতিশোধ

খাদিজা আরুশি আরু

পর্বঃ ০১


ভোর পৌনে পাঁচটা, জাকিয়া ক্লান্ত ভঙ্গিতে বিছানা ছেড়ে ওয়াশরুমে গেলো। আজকাল শরীর টা আর আগের মতো সঙ্গ দেয় না, নিজেকে মাঝে মাঝে যন্ত্রমানব মনো হয় তার। বাবা মায়ের অতি আদরের মেয়ে আজ কি না একা একা থাকছে, রাত জেগে অফিসের কাজ করছে। জীবনটা সত্যিই অদ্ভুত, কখন কাকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করায় বলা দায়! আধো আধো চোখে ভেসিনের আয়নায় একবার নিজেকে দেখে চোখটা আবার বন্ধ করে নিলো সে। এ জাকিয়াকে তার নিজেরই দেখতে মন চায় না, অন্যরা কি দেখবে!
ঘুমে ঢুলকে ঢুলতে কোনোমতে ভেসিনের কলটা ছাড়লো জাকিয়া। কল ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই একটা ভ্যাপসা গন্ধ নাকে লাগলো, বাধ্য হয়েই আবার চোখ খুললো জাকিয়া। চোখ খুলার সঙ্গে সঙ্গে ভুত দেখার মতো চমকে দূরে সরে গেলো সে...। চিৎকার দিতে চাইলো কিন্তু গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হচ্ছে না। ভেসিনের কল দিয়ে অনবরত লাল রঙের পানি পড়ছে, মনে হচ্ছে এটা পানির কল নয় বরং রক্তকল!
পলকহীন দৃষ্টিতে কল থেকে পড়া রক্ত দেখছিলো জাকিয়া, আস্তে আস্তে চোখের সামনে অন্ধকার ছেয়ে গেলো। জাকিয়া অন্ধকারে কি যেনো দেখলো তারপর, তারপর...!
চোখ খুলে নিজেকে শয়নরত অবস্থায় আবিষ্কার করলো জাকিয়া, কি থেকে কি ঘটে গেলো মনে করতে বেশ খানিকটা সময় লাগলো তার। যখন ভোরের সেই ভয়ানক দৃশ্য মনে পড়লো লাফ দিয়ে উঠে বসলো সে। বসার পর আবিষ্কার করলো এটা তার ফ্লাটের বসার ঘরের সোফা। ফ্লাটের দরজাটা বিচ্ছিরিভাবে ভাঙ্গা হয়েছে, এপার্টমেন্টের অনেকেই সেখানে উপস্থিত সঙ্গে কিছু অপরিচিত লোককেও দেখা যাচ্ছে।
জাকিয়াকে উঠতে দেখে টি-টেবিলটা টেনে জাকিয়ার মুখোমুখি বসলো বত্রিশ কি পঁয়ত্রিশ বছরের একজন লোক। কোনো প্রকার ভূমিকা ছাড়াই জাকিয়াকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করলো,

-আপনি কেনো এই নৃশংস খুনটা করলেন?

এক মুহূর্তের জন্য জাকিয়া থমকে গেলো, সে খুন করছে! এ কথাটা একজন অপরিচিত লোক এতো কনফিডেন্স এর সঙ্গে কি করে বলতে পারে! জাকিয়া নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করলো এবং পরমুহূর্তে কিছুটা উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো,

-আপনি আমাকে এমন বেহুদা প্রশ্ন করবার কে? আর আপনার এসব বেহুদা প্রশ্নের জবাব দিতে আমি... আমি বাধ্য নই।
-আমি এস.আই. তন্ময়, আশা করি এবার আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধিত হবেন।

জাকিয়া একবার চোখ তুলে এস.আই. তন্ময়কে দেখলো তারপর চোখ নামিয়ে শান্তস্বরে বললো,

-আমি কোনো খুন করি নি।

এস.আই. তন্ময় বিদ্রুপের হাসি হেসে বললো,
 
-সব খুনীই ধরা খাবার পর বলে, "আমি খুন করি নি"!
-আমি সত্যিই খুন করি নি...
-তাহলে কল থেকে পানির বদলে রক্ত পড়তে দেখে আপনি কোনো শব্দ করেন নি কেনো? সম্পূর্ণ এপার্টমেন্টে তো হইচই পড়ে গিয়েছিলো, কিন্তু আপনি ছিলেন নির্বিকার। কেনো?
-আমি রক্ত দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, আর ভয় পাওয়ার দরুন জ্ঞান হারিয়েছি।
-সত্যি কি তাই? কেবল ভয়ের জন্য জ্ঞান হারিয়েছেন নাকি নিজের অপরাধ লুকানোর জন্য নাটক সাজিয়েছেন?

কথাটা শুনে জাকিয়ার ভীষণ রাগ হলো, নিজের রাগ সংবরণ করতে না পেরে চিৎকার করে বললো,

-আমি কোনো খুন করি নি, আমি খুনি নই। আমার উপর মিথ্যা দোষ চাপানো বন্ধ করুন।
-রিলাক্স, আমি কেবল জিজ্ঞেস করছি আপনি কেনো খুন করেছেন আর আপনি তো রেগে গেলেন ম্যাডাম। ফর ইওর কাইন্ড ইনফরমেশন এটা আমাদের রুটিন ইনকোয়ারির মধ্যে পড়ে। 

জাকিয়া নিজেকে শান্ত মেয়ে হিসেবেই জানে কিন্তু হয়তো পরিস্থিতি তাকে অশান্ত হতে বাধ্য করছে। সে নিজেকে সামলে আস্তে করে বললো,

-হুঁ।

এপার্টমেন্টের দারোয়ান শফিক এতোক্ষণ সোফার কাছে মাথায় হাত দিয়ে বসে ছিলো, জাকিয়ার কাজের বুয়া নাসিমা দরজার কাছে গুটিশুটি মেরে দাঁড়িয়ে ছিলো। এস.আই. তন্ময় জাকিয়ার সামনে থেকে সরে গেলে শফিক মুখ বাঁকিয়ে বললো,

-ভালা মাইনষের সুরতের ফিছে শয়তান থাকে হুনছিলাম, এই আফায় তার প্রমান দেহার ভাগ্য কইরা দিলো। 

নাসিমা কাঁদো কাঁদো মুখে জাকিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো,

-আফা, আপনে বাচ্চাডারে মারলেন কেন? মানতাছি কাইল আফনের একটা গেলাস ভাঙছিলো, তার লাইগা তো বকছেনও তারে। কিন্তু একখান গেলাসের লাইগা ফুলের মতো বাচ্চাডারে মাইরা ফালাইবেন!

সবকিছু এতো দ্রুত হচ্ছিলো যে, জাকিয়া কিছুই বুঝতে পারছিলো না ঠিকঠাক। কিন্তু বুয়ার মুখে বাচ্চা আর গ্লাস ভাঙ্গার কথা শুনে জাকিয়া কিছুটা অবাক হলো, বিস্ময়ের সঙ্গেই জিজ্ঞেস করলো,

-কোন বাচ্চা নাসিমা?
-নাটক কইরেন না আফা, কাইল যে বাচ্চাডা আপনের বাসায় খাইতে আইসা গেলাস ভাঙছিলো তার কথা কইতাছি। যারে আপনে মাইরা বস্তাত ভইরা টাংকিতে পুইরা থুইছেন।

মুহূর্তের জন্য জাকিয়া থমকে গেলো, সে খুব করে অনুভব করলো তার হাত পা কাঁপছে। সোফার হ্যান্ডেলটা ধরে কোনোমতে দাঁড়ালো জাকিয়া, তারপর আশেপাশের পরিস্থিতি বুঝার চেষ্টা করলো। তারপর সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলো, নিচে নামার সময় জাকিয়া লক্ষ্য করলো তার পেছন পেছন কয়েকজন নামছে...। এক মুহূর্তের জন্য জাকিয়া ভাবলো কারা এরা! পুলিশ বা গোয়েন্দার লোক নয় তো! গ্যারেজে একটা চাটাইয়ের উপর শুয়ে আছে একটা বাচ্চা শরীর, গায়ের উপর সাদা চাদর দেয়া...। চাদরের  উপরে রক্তের ছোপ স্পষ্ট। পাশেই মুখ কাটা একটা বস্তা পড়ে আছে, বস্তায় রক্তের ছাপ!
জাকিয়া এগিয়ে গিয়ে লাশের মুখের উপর থেকে চাদর সরাবে ঠিক সে মুহূ্র্তে কেউ তার হাত ধরলো। পাশ ফিরে জ্ঞান ফেরার পর যে লোকটা তাকে প্রশ্ন করছিলো তাকে দেখে তড়িৎ গতিতে হাত ছাড়িয়ে নিলো জাকিয়া। তন্ময় জাকিয়াকে একবার লক্ষ্য করলো তারপর ভাবলেশহীণভাবে বললো,

-আপনাকে লাশ ধরার অনুমতি দেয়া হয় নি, যে ধরবেন। চাইলে একবার দেখতে পারেন।

জাকিয়া কিছু বললো না, কেবল একবার এস.আই. তন্ময়ের দিকে তাকালো। এস.আই. তন্ময় লাশের উপর থেকে চাদরটা সরিয়ে বললো,

-এতোটা নির্দয় একটা মানুষ কি করে হয়? এ বাচ্চাটাকে মেরে কি পেলেন বলুন তো? আমরা পুলিশ মানুষ, কতো চোর ডাকাত ধরি তাও তো বাচ্চাদের প্রতি একটু মায়া কাজ করে। আর আপনি কি না ভালোমানুষির মুখোশ পরে ওকে আপনার হিংস্রতার স্বীকার বানালেন! মানুষ বড়ই অদ্ভুত প্রানী। বিশেষ করে আপনার মতো মহিলারা...

লাশটা দেখেই আঁতকে উঠলো জাকিয়া, বোঝা যাচ্ছে একবার নয় কয়েকবার ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। জাকিয়া লাশের দিকে তাকিয়েই জিজ্ঞেস করলো,

-আপনার নামটা যেনো কি বলেছিলেন?
-তন্ময় হাসান, ইনশর্ট এস.আই. তন্ময়।

জাকিয়া তন্ময়ের দিকে ঘুরে দাঁড়ালো, গলার স্বরে কাঠিন্যতা বজায় রেখে বললো,

-সো মি. তন্ময়, আমি চাই এ বাচ্চাটার খুনী শাস্তি পাক। সুতরাং নিজেদের কাজে মনোযোগ দিন। আর আরেকটা কথা, আমি খুন করি নি... তাছাড়া আমিই যে খুনী এ কথাটা এখনো প্রমাণ হয় নি। তাই দ্বিতীয়বার আমাকে প্রমাণ ছাড়া খুনী বলবেন না।
-সাক্ষ্য এবং প্রমাণ দুটোই আপনার বিরুদ্ধে ম্যাডাম।
-প্রতিটা ঘটনা একটা কয়েনের মতো, আর আপনারা কেবল ঘটনার এপিঠ দেখেছেন ওপিঠ নয়। আর যেহেতু এখনো প্রমান হয় নি যে আমি খুনী, তাই আশা করবো অন্য সবার মতো আমাকেও সম্মানের চোখে দেখবেন।
-যে সম্মান পাবার যোগ্য এস.আই. তন্ময় কেবল তাকেই সম্মান করে ম্যাডাম। এনিওয়ে, নাইস লকেট...।

জাকিয়া লক্ষ্য করলো তন্ময় তার গলার লকেটের দিকে গভীর দৃষ্টিতে চেয়ে আছে, তার মনে হলো লোকটার দৃষ্টি লকেট কয় বরং অন্যকিছুই পরোক্ষভাবে দেখবার চেষ্টা করছে তাই রাগান্বিত স্বরে বললো,

-দেটস নান ওফ ইওর বিজনেস মি. তন্ময়। আপনি আপনার কাজে মন দিন...


জাকিয়ার এপার্টমেন্ট থেকে বের হবার সময় এস.আই. তন্ময় তার সহকর্মী কুঞ্জকে ডেকে বললো,

-কুঞ্জ, মিস জাকিয়া এর দৈনিক টাইম টেবিল এবং যাবতীয় তথ্য আগামী বাহাত্তর ঘন্টার মধ্যে আমার টেবিলে চাই। আর একটা কথা, ওনার উপর নজর রাখার জন্য একজন কন্সটেবলকে  সিভিল ড্রেসে বাড়ির আশেপাশে কোথাও অবস্থান করতে বলবে।
-জ্বী স্যার।
-আর শোনো... মেয়েটা একা থাকে, তার পরিবারের খোঁজটাও নিও।
-ওকে স্যার।

যেতে যেতে আবার পেছন ফিরে তাকালো তন্ময়, কুঞ্জকে ডেকে বললো,

-এপার্টমেন্টের দারোয়ানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় যাবার নোটিশ দাও। লোকটাকে সুবিধার মনে হচ্ছে না, একা একটা মেয়ে একটা বাচ্চার লাশ নিয়ে গ্যারেজ অবধি এলো আর দারোয়ান দেখলো না! ব্যপারটা সন্দেহজনক...
-স্যার আমি জানিয়ে দেবো দারোয়ানকে। কাল সকালের মধ্যে যেনো থানায় হাজিরা দিয়ে আসে। কি মনে হয় স্যার? মেয়েটা খুন করেছে?
-করতেও পারে কুঞ্জ। মেয়েটাকে আর তার ঘরটাকে লক্ষ্য করো নি? সারাটা ঘর এলোমেলো, বারান্দায় ধুলো পড়া... বাড়িতে কাজের লোক আছে তবুও ঘর অগোছালো, অপরিষ্কার, কেনো? সামন্য বেতনের চাকরি করে অথচ তবুও এতো ফাস্টক্লাস এপার্টমেন্টের ফ্লাটে থাকে আর বেশি অবাক করা বিষয় হলো তার গলায় একটা ডায়মন্ডের লকেটওয়ালা স্বর্নের চেইন। এছাড়া মেয়েটার চোখের নিচে গাঢ় কালি, মনে হয় কতোদিন ঘুমোয় না। আবার হতেও পারে নেশা টেশা করে...
-হতে পারে স্যার...

আর কথা বাড়ালো না কুঞ্জ, নিজের কাজের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। তন্ময়ও গাড়িতে উঠে থানার পথে রওনা হলো। তন্ময় চলে যাবার পর কুঞ্জ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো, সবার সামনে শান্ত হলেও সে জানে তন্ময় কাজে বিলম্ব একেবারেই পছন্দ করে না। বাহাত্তর ঘন্টার মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্যদি না পেলে কুঞ্জর চাকরি নিয়েও টানাটানি হতে পারে। 
তন্ময়কে বুঝতে পারে না কুঞ্জ, কখনো পানির মতো সরল আমার কখনো পাথরের মতোই কঠিন! মাঝে মাঝে কুঞ্জর মনে হয়, তন্ময় নামের মানুষটার মাঝে মন নামক বস্তুটি নেই। থাকলে নিশ্চয়ই সে আসামীদের পশুর মতো মারতে পারতো না। 
জাকিয়া মেয়েটা যদি সত্যিই বাচ্চাটার খুন করে থাকে তবে মেয়েটাকে জেলে পঁচে মরতে হবে। কারন তন্ময় আর যা'ই হোক, কোনো অপরাধীকে কোনো ব্যাপারে ছাড় দেবে না। কুঞ্জ দীর্ঘশ্বাস ফেললো, মনে মনে বললো, "চাকরিটা স্যারকে কেমন পাথর বানিয়ে দিয়েছে"! পরমুহূর্তে তার মনে হলো, "কই, সে তো পাথর হয় নি! তবে তন্ময় কেনো এমন... তবে কি তন্ময় মানুষটাই পাথরের মতো শক্ত, অনুভূতিহীন"!

চলবে...

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0
Khadiza Arushi Aru সখের বশে লেখালেখি শুরু করলেও বর্তমানে তা আর সখ নেই, নেশা হয়ে গেছে। নিজের অনুভূতি, চিন্তাধারা, অভিজ্ঞতাকে অন্যের দ্বারপ্রান্তে সুকৌশলে পৌঁছে দেয়াই হয়তো আমার লিখে যাবার অনুপ্রেরণা! আমার প্রথম সম্পাদিত বই, "নবধারা জল" এবং প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস, "সূর্যপ্রভা"