বেলী ফুলের স্বপ্ন
গল্পের নাম: বেলী ফুলের স্বপ্ন
লেখক: জেরিন জাহান দিশা
আমি অভি। এক বস্তির ছেলে। বাবা রিকশা চালান, মা অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। শহরের এক ছোট্ট ঘরে থাকি আমরা। জীবনে যত অভাব-অনটন, তবু আমার একটা বড় স্বপ্ন ছিল—নিজের একটা ফুলের দোকান খুলব একদিন।
আমি ক্লাস আটে পড়ি। ভোরে ঘুম থেকে উঠে বেলী ফুল গাঁথতে বসি। পাশের কাকিমা বাজার থেকে বেলী ফুল এনে দেন, আমি মালা বানিয়ে বিক্রি করি। সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে কিছু বিক্রি করি, বিকেলেও। যত টাকাটা পাই, তার কিছু মাটির ব্যাংকে জমাই, আর কিছু মা’কে দিই।
আমার একমাত্র বন্ধু অনু। ও বেলী ফুল খুব ভালোবাসে। প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া সময় আমি ওকে একটা করে ফুল দিই। ও হাসে আর বলে, “তোর ফুলটাই আমার সবচেয়ে সুন্দর লাগে।” ওর সেই হাসিই আমার দিনের শক্তি।
একদিন স্কুলে “আমার স্বপ্ন” নিয়ে রচনা প্রতিযোগিতা হলো। সবাই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার কথা বললো, আর আমি লিখেছিলাম—ফুল বিক্রি করে মানুষকে হাসাতে চাই। অদ্ভুত, আমি প্রথম হলাম। স্যার বললেন, “অভির স্বপ্নই সত্য, ওর মতো ছেলে বদলাবে জীবন।”
সময় গেল, এসএসসি পরীক্ষা আসলো। আমি ফুল বিক্রি কমিয়ে দিলাম, পড়াশোনায় মন দিলাম। অনুর সাথে যোগাযোগও কমে গেল।
একদিন অনু হঠাৎ এসে বলল,
“তোর পরীক্ষা, তাই ফুল দেইনি।”
আমি হাসলাম, “পরীক্ষা শেষে তোকে অনেক ফুল দেব।”
ও মুচকি হাসল, “একটা ফুলই যথেষ্ট।”
ওর কথা আমার হৃদয়ে লেগে গেল। আমরা অনেকক্ষণ কথা বললাম, তারপর ও চলে গেল।
পরীক্ষার দিন এল। আমি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি, দেখি অনু হাতে একটা ছোট বেলী ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে।
“তোর জন্য,” ও বলল।
আমি কিছু বললাম না, শুধু ফুলটা নিয়ে ওর চোখে চোখ রেখে দাঁড়ালাম।
পরীক্ষার ফলাফল এল, আমি প্রথম বিভাগে পাশ করলাম! মা কাঁদল, বাবা হাসল, সবাই বলল, “অভি একদিন বড় কিছু করবে।”
আমার সঞ্চয় আর বাবা-মায়ের সাহায্যে বাজারে ছোট্ট একটা দোকান নিলাম। নাম দিলাম “অভির ফুলের দোকান।” শুরুতে বেলী ফুল, রজনীগন্ধা আর গোলাপ বিক্রি করলাম। মানুষ ভালোবেসে সাহায্য করল, দোকান বড় হতে লাগল।
অনু মাঝে মাঝে এসে সাহায্য করে—মালা গাঁথে, দোকান সাজায়, হাসতে হাসতে বলে, “তোর স্বপ্ন সত্যি হচ্ছে, অভি।”
আমি বলি,
“তুই পাশে আছিস বলেই সম্ভব হচ্ছে।”
কিন্তু হঠাৎ বাবার ওপর বেদনার ছায়া নেমে এল। বাবা স্ট্রোক করলেন। আমি তড়িঘড়ি তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাচ্ছিলাম, পথে বাবাকে হারালাম। মায়ের অসুস্থতায় অনু পাশে দাঁড়াল।
কয়েক দিন দোকানে যাইনি। মা বললেন,
“অভি, দোকান না খুললে আমরা খাবো কি? আজ দোকান খুল।”
আমি রাজি হলাম।
সকালে অনু আর ওর মা খাবার নিয়ে এল। কথা বললাম, তারপর দোকানে গেলাম।
দুপুরে মা বললেন,
“অভি, অনুকে বিয়ে করবি। ও মনের মতো মেয়ে।”
আমি বললাম, “মা, তুমি যা ভালো বুঝো তাই করো।”
মা পরদিন অনুর বাড়ি গিয়ে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। অনুর মা রাজি হলেন। শুক্রবার আমাদের বিয়ে ঠিক হলো।
বিয়ের দিন আমি অনুকে বেলী ফুলের মালা দিলাম। ও খুব খুশি হলো।
বিয়ের পর পরই দোকানে একজন ভদ্রলোক এল, বেলী ফুল সব কিনে নিয়ে গেলেন।
তার একটি কার্ড দিলেন,
“এটা রাখো। আমি রোজ ফুল কিনব। যেকোনো প্রয়োজনে আমার সাথে কথা বলো।”
ফুল বিক্রি থেকে ভালো লাভ হলো। বাজার থেকে বড় পাঙ্গাস মাছ কিনলাম অনুর জন্য, মা’র জন্য শাড়ি আর মিষ্টি।
বাড়ি ফিরে মা’কে দিলাম।
অনুকে বললাম,
“তুই আমার জন্য খুব ভাগ্যবান। তোর আসার পরই দোকানে ভালো ক্রেতা এল।”
এভাবেই দোকান বড় হতে লাগল।
আমি একটা সুন্দর বাড়ি বানালাম। সেখানে আমি, অনু আর মা সুখে থাকি।
আমার ছোট্ট বেলী ফুলের স্বপ্ন আজ আমাদের জীবনের গল্প।
আমার ছোট্ট বেলী ফুলের স্বপ্ন আজ আমাদের জীবনের গল্প।
অনু এখন আমার জীবনের ছায়া। দোকানে প্রতিদিন সকালে ও থাকে, মালা গাঁথে, ফুল সাজায়। বিকেলে স্কুল থেকে ফেরার পথে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ফুল দেখে—কেউ কিনে, কেউ শুধু দেখে যায়। আমি সবার সাথে হাসি, কথা বলি। আমার মনে হয়, আমি শুধু ফুল বিক্রি করি না, আমি ভালোবাসা ছড়াই।
প্রতিদিন সকালে দোকান খুলে যখন প্রথম মালা হাতে নিই, মনে পড়ে ছোট্ট সেই অভি—যে ছেঁড়া গেঞ্জি গায়ে, কাঁধে ফুলের ঝুড়ি নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকত। তখন ভাবি, স্বপ্ন কখনো ছোট হয় না। শুধু একটু সাহস লাগে, আর ভালোবাসা লাগে পাশে।
অনেকেই এখন আমার কাছে আসে সাহায্য চাইতে—আমি যাদের পারি, সাহায্য করি। কারণ আমি জানি, অভাব কাকে বলে। আমি চাই, এই বস্তির কোনো ছেলেমেয়ে যেন শুধু অভাবের ভয়ে স্বপ্ন দেখতেই না পারে—সেই দিনটা আমি বদলাতে চাই।
অনু মাঝে মাঝে বলে,
“তোর স্বপ্নটা আজ অনেক বড় হয়েছে।”
আমি বলি,
“এটা শুধু আমার স্বপ্ন না, এটা আমাদের স্বপ্ন, আমাদের ভালোবাসা।”
রোজ রাতে ঘুমানোর আগে আমি একটা জিনিস করি—মাটির সেই পুরনো ব্যাংকটা দেখি, যেখানে আমি প্রথম টাকা জমাতাম। সেটায় এখন টাকা নেই, কিন্তু আছে স্মৃতি, আশা, আর একটা ছোট্ট স্বপ্নের শুরু।
আমার নাম অভি, আমি একদিন স্বপ্ন দেখেছিলাম। আজ আমি সেই স্বপ্নের মাঝে বেঁচে আছি—বেলী ফুলের সুবাসে, অনুর হাসিতে, আর মায়ের দোয়ায়।
What's Your Reaction?
Like
4
Dislike
0
Love
3
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
4