সাইবার বুলিং: নীরব আগ্রাসন ও প্রতিরোধের পথ
লেখক: জেরিন জাহান দিশা
বর্তমান সময় ডিজিটাল যোগাযোগের এক বিস্ময়কর সময়। মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ট্যাবলেটের মতো প্রযুক্তি ডিভাইসের কল্যাণে মানুষ আজ তথ্য ও বার্তার অগাধ জগতে প্রবেশ করেছে। আমরা চাইলে মুহূর্তেই যোগাযোগ করতে পারি, মতামত দিতে পারি, এমনকি হাজারো মানুষের কাছে আমাদের বক্তব্য পৌঁছে দিতে পারি। কিন্তু এই প্রযুক্তির ভুল ব্যবহারও মারাত্মক হতে পারে। বিশেষ করে, যখন কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে হেয়, অপমান বা লাঞ্ছিত করতে প্রযুক্তির ব্যবহার করে—তখন সেটিই হয়ে ওঠে এক ভয়ংকর সামাজিক ব্যাধি, যার নাম সাইবার বুলিং।
সাইবার বুলিং কী?
সাধারণভাবে বললে, ব্যক্তিগত তথ্য, নিজস্ব বিশ্বাস বা স্পর্শকাতর ঘটনার অপব্যবহার করে কাউকে হেনস্তা করা, অপমানিত করা, বিব্রত করা বা মানসিক আঘাত দেওয়া—এসবই বুলিংয়ের আওতায় পড়ে। আর যখন এই কাজগুলো করা হয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে, যেমন—সোশ্যাল মিডিয়া, মেসেজিং অ্যাপ, ফোরাম বা অনলাইন গেমিং-এর মাধ্যমে, তখন তা হয়ে ওঠে সাইবার বুলিং।
সাইবার বুলিং অনেকভাবে সংঘটিত হতে পারে। কাউকে উদ্দেশ্য করে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, নেতিবাচক রিভিউ, কটাক্ষপূর্ণ ছবি বা ভিডিও শেয়ার, মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া, ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে কাউকে হেয় করা, এমনকি ব্যক্তিগত বার্তা পাঠিয়ে হুমকি বা বাজে কথা বলা—এসবই সাইবার বুলিংয়ের অন্তর্ভুক্ত।
কারা এর শিকার?
সাইবার বুলিং-এর শিকার হতে পারে যে কেউ—ছোট্ট স্কুলপড়ুয়া বাচ্চা থেকে শুরু করে সমাজের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা পর্যন্ত। শিশু-কিশোররা সাধারণত সহপাঠীদের দ্বারা টার্গেট হয়, আর বড়রা কর্মক্ষেত্রে বা পাবলিক ফিগার হিসেবে আক্রমণের শিকার হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যারা একটু বেশি জনপ্রিয়, যেমন—ইউটিউবার, অভিনেতা বা খেলোয়াড়, তারাও প্রায়ই অনলাইনে হেনস্তার শিকার হন।
বন্ধুত্বের নাম করে অনেকে মজা করতে গিয়েও কারো ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য শেয়ার করে দেয়, যা আদতে সাইবার বুলিংয়েরই অংশ। আমরা নিজেরাও অনেক সময় না বুঝে ঠাট্টার ছলে এমন কিছু করে ফেলি যা কাউকে গভীরভাবে আঘাত করে।
তাই আমাদের সতর্ক থাকা জরুরি—আমার কথায় বা আচরণে অন্য কেউ কষ্ট পাচ্ছে কি না।
সাইবার বুলিং প্রতিরোধের উপায়
সাইবার বুলিং রোধে আমাদের সমাজ, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং প্রযুক্তিগত উদ্যোগ—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার। এর প্রতিরোধমূলক উপায়গুলোকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়:
১. প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিরোধ:
অপরিচিতদের সঙ্গে সংযুক্ত না হওয়া:
সোশ্যাল মিডিয়ায় অপরিচিত কাউকে অ্যাড বা ফলো করার আগে ভাবুন। আপনার তথ্য তারা কীভাবে ব্যবহার করতে পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকুন।
নিষেধ বা প্রতিবাদ জানানো:
যদি কেউ অনলাইন বা চ্যাটে বাজে মন্তব্য করে, তাকে স্পষ্টভাবে জানান—এটা আপনি মেনে নেবেন না।
ব্লক ও রিপোর্ট:
যে কেউ বারবার আপনাকে বিরক্ত করছে, তাকে অবিলম্বে ব্লক করুন। সামাজিক মাধ্যমগুলোর নিরাপত্তা টিমকে রিপোর্ট করুন।
মিউট ও রেস্ট্রিক্ট:
ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামসহ অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে মিউট বা রেস্ট্রিক্ট অপশন রয়েছে, যেগুলো ব্যবহারে আপনি বিরক্তিকর কনটেন্ট এড়াতে পারবেন।
AI-এর মাধ্যমে সহায়তা:
আজকাল সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হয় হিংসাত্মক পোস্ট বা মন্তব্য চিহ্নিত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়ার জন্য।
২. সচেতনতা বৃদ্ধি করে প্রতিরোধ:
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক আলোচনা:
শিক্ষকরা ক্লাসে সাইবার বুলিং সম্পর্কে আলোচনা করলে শিক্ষার্থীরা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে নিতে শিখবে।
পরিবারে আলোচনা:
পিতামাতা বা বড়রা ছোটদের সঙ্গে নিয়মিত এ বিষয়ে কথা বললে তারা ভয় না পেয়ে নিজের সমস্যা খুলে বলতে পারবে।
সেমিনার ও ক্যাম্পেইন:
স্কুল, কলেজ বা সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে সাইবার বুলিংবিরোধী সেমিনার আয়োজন করা যেতে পারে। এতে সবাই সচেতন হবে।
ভালো ব্যবহার শেখানো:
অনলাইনে কীভাবে একজন অন্যজনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হয়, সেটি পরিবার এবং সমাজের দায়িত্ব শেখানো।
আমাদের করণীয়
আমরা যদি নিজের আচরণ নিয়ে একটু সচেতন হই, তবে অনেক সাইবার বুলিং এর আগেই বন্ধ করা সম্ভব। নিচে কিছু করণীয় উল্লেখ করা হলো—
কারো পোস্টে মন্তব্য করার আগে ভাবুন, আপনি যা লিখছেন তা যদি আপনার জন্য বলা হতো, আপনি কেমন অনুভব করতেন।
নিজের কোনো ছবি, তথ্য বা ব্যক্তিগত ব্যাপার কাউকে দেওয়ার আগে ভেবে নিন—সে কি আসলেই ভরসার যোগ্য?
কোনো বন্ধু বা পরিচিত জন যদি সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়, তাকে একা করে দেবেন না। পাশে দাঁড়ান। সাহস দিন।
এবং সবচেয়ে বড় কথা, সাইবার অপরাধের বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার আপনার আছে। প্রয়োজনে সহায়তা চান।
উপসংহার
সাইবার বুলিং কোনো সাধারণ ঠাট্টা নয়—এটি একটি মানসিক নিপীড়নের রূপ। প্রযুক্তির অপব্যবহার করে কাউকে কষ্ট দেওয়া কখনোই সভ্য আচরণ নয়। আমাদের উচিত অনলাইনকে একটি নিরাপদ, বন্ধুত্বপূর্ণ ও সম্মানজনক পরিবেশে রূপান্তর করা।
আসুন, আমরা সবাই মিলে এই নীরব আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই। নিজে সাইবার বুলিং করব না, কাউকে করতে দেব না। তবেই গড়ে উঠবে এক শান্তিপূর্ণ ডিজিটাল সমাজ।
What's Your Reaction?
Like
4
Dislike
0
Love
4
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
4