আমরা নিজেরাই নিজের শত্রু

জুলাই 14, 2025 - 21:04
নভেম্বর 16, 2025 - 14:25
 1  5
আমরা নিজেরাই নিজের শত্রু

আমরা নিজেরাই নিজের শত্রু আমরা প্রতিনিয়ত নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছি। হার্টের সমস্যা, কিডনির রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, এমনকি ক্যানসারের মতো কঠিন রোগও আজকাল খুব সাধারণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু আমরা কি ভেবে দেখেছি, এইসব রোগের পেছনে আসল কারণ কী? দায় কার? দুঃখজনক হলেও সত্যি আমরা নিজেরাই নিজের শত্রু হয়ে উঠেছি। আমরা নিজেরাই আমাদের শরীরে প্রতিদিন বিষ ঢুকাচ্ছি, অথচ বুঝে উঠছি না কী ভয়ংকর ক্ষতি করছি নিজের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের। একটি সময় ছিল, যখন কৃষকরা বিষমুক্ত, স্বাস্থ্যকর খাবার ফলাতেন। কিন্তু এখন সেই জায়গায় এসেছে লাভের মোহ। আমরা যারা কৃষিকাজ করি, তারাই ফসলে বিষ ছিটিয়ে দিচ্ছি বাজারে তুলে দিচ্ছি পরদিনই। অথচ এসব বিষাক্ত খাবার কিনে নিচ্ছে আমাদের সন্তান, আমাদের পরিবার, এমনকি আমরা নিজেরাও। আর এভাবেই বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে শরীরের অঙ্গগুলো হার্ট, কিডনি, লিভার কিছুই রেহাই পাচ্ছে না। শুধু খাদ্য নয়, আমাদের জীবনযাপনেও এসেছে চরম অনিয়ম। সকালে ঘুম থেকে উঠছি দেরিতে, রাতে খাচ্ছি ভারী খাবার তেল, চর্বি আর মসলায় ভরা। খাওয়ার পরপরই ঘুমিয়ে পড়ছি। হাঁটাচলা নেই, ব্যায়াম নেই। সারাদিন বসে থাকা, মোবাইল বা টিভির সামনে সময় নষ্ট করা যেন জীবনের নতুন রুটিন। এতে শরীরে জমছে মেদ, বাড়ছে উচ্চ রক্তচাপ ও সুগারের ঝুঁকি। ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে হৃদযন্ত্র। একদিকে বিষাক্ত খাবার, অন্যদিকে অনিয়মিত জীবনধারা এই দুই মিলে আমরা নিজের অজান্তেই নিজের কবর রচনা করছি। অথচ একটু সচেতন হলেই এসব রোগ থেকে বাঁচা সম্ভব। প্রথমেই দরকার খাদ্যে সচেতনতা। কৃষকদের উচিত ফসল ফলানোর আগে মানুষকে ভাবা আজ যা দিচ্ছি, আগামী প্রজন্ম তাই খাবে। অল্প লাভের জন্য বিষ দিয়ে ফসল ফলালে শরীর নষ্ট হবে অনেকের, আর দায় থাকবে আমাদেরই। বিষমুক্ত চাষাবাদ আমাদের সন্তানদের জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে। দ্বিতীয়ত, জীবনধারায় পরিবর্তন আনতে হবে। সকালে ঘুম থেকে উঠা, পরিমিত খাওয়া, সময়মতো ঘুমানো, প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা, পর্যাপ্ত পানি পান, এবং স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণ এই অভ্যাসগুলো শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। রেস্তোরাঁর খাবারের চেয়ে ঘরের স্বাস্থ্যকর খাবারেই রয়েছে সুস্থতার চাবিকাঠি। আমরা যেন নিজের জন্য সময় না হারাই। নিজের শরীরের যত্ন না নিলে, এক সময় শরীর আমাদের সাথ ছেড়ে দেবে। তখন চিকিৎসা খরচ, হাসপাতালে দৌড়ঝাঁপ, আর পরিবারের কষ্ট ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। একটা কথা মনে রাখুন শরীর একটাই। একে ভালো না রাখলে, জীবনের সব স্বপ্নই ধুলোয় মিশে যাবে। আজই সিদ্ধান্ত নিন আমি সুস্থ থাকবো, আমি সচেতন হবো। আমি নিজের শত্রু নয়, বন্ধু হতে চাই। আগেকার দিনে মানুষ খেতো কম, কিন্তু বাঁচতো বেশি। তখন জীবন ছিল অভাবে ঘেরা, কিন্তু স্বাস্থ্য ছিল প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকা। এখন চারপাশে খাবারের বাহার, কিন্তু প্রতিদিনই বাড়ছে অসুস্থ মানুষের সংখ্যা। এক সময়ের কথা মনে আছে ভাতে জোটতো, তরকারি হয়তো থাকতো না। তখন মানুষ নিজের উঠোনেই পুঁইশাক, কচুশাক, ডাঁটা, লাউ লাগিয়ে খেতো। মাছ ধরা হতো পুকুরে, ধান রোদে শুকিয়ে চাল বানানো হতো। ফরমালিন, কেমিক্যাল, প্রিজারভেটিভ এসব শব্দ কেউ চিনতো না। খাবার ছিল মৌলিক, মাটির গন্ধমাখা। আজকের দিনে খাবারের অভাব নেই, কিন্তু সেই খাবারে নেই কোনো পুষ্টি। বরং যা আছে তা হলো বিষ। সবজিতে স্প্রে করা হচ্ছে কীটনাশক। মাছ-ফল-মাংসে দেওয়া হচ্ছে ফরমালিন। দিন শেষে টেবিলে যে খাবার আসছে, তা দেখতেও সুন্দর, খেতেও সুস্বাদু কিন্তু তা শরীরের জন্য ধীরে ধীরে মৃত্যু ডেকে আনছে। আগে মানুষ হাঁটতো মাইলের পর মাইল। হেঁটেই যেতো হাটে-বাজারে। এখন একটা রিকশা না পেলে আমরা রাস্তায় নামতেই চাই না। ঘরের ভেতরেও মোবাইলে ব্যস্ত, শরীরচর্চা নেই, হাঁটাহাঁটি নেই। আগে বাড়িতে সবাই মিলে বসে খেতো, কথা বলতো, হাসতো। এখন সবাই নিজের ফোনে মুখ গুঁজে একা একা খায়। আগে এত ‘খাওয়ার বিলাসিতা না থাকলেও, ছিল দীর্ঘ হায়াত। একজন বৃদ্ধ ৮০-৯০ বছর পর্যন্ত বেঁচে যেতেন কোনো রিং ছাড়াই, কিডনি ছিদ্র না হয়েই। অথচ আজ ৪০ বছরের তরুণেরও হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে, ডায়াবেটিস ধরা পড়ছে স্কুলপড়ুয়া ছেলের। আমরা এখন প্রতিদিনই এমন কিছু খাচ্ছি, যা আমাদের ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু আমরা কেউ থামছি না, ভাবছিও না। তবে এখনো সময় আছে। এখনো চাইলে ফিরতে পারি সেই সাদামাটা, স্বাস্থ্যে ভরপুর জীবনে। নিজের উঠোনে একটু শাকসবজি লাগানো যায়। বাজারে টাটকা ও অল্প কীটনাশক দেওয়া খাবার খোঁজা যায়। রাস্তায় হেঁটে যাওয়া, সকালে উঠে সূর্যের আলো গায়ে মাখা এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলো ফিরিয়ে আনতে হবে। এবং সবচেয়ে জরুরি, শরীরের সঙ্গে আবার বন্ধুত্ব করতে হবে। প্রযুক্তির অগ্রগতি, আয় ও ভোগের স্বাচ্ছন্দ্য আমাদের যা দিয়েছে, তার চেয়ে অনেক কিছুই কেড়ে নিয়েছে। এখন দরকার সচেতনতা, খাদ্যে সাবধানতা, আর জীবনযাপনে ভারসাম্য। অভাবের দিনে মানুষ ছিল স্বাস্থ্যবান, কারণ খাবারে ছিল প্রকৃতি। আর আজ স্বাচ্ছন্দ্যের দিনে মানুষ হচ্ছে রোগাক্রান্ত, কারণ খাবারে আছে বিষ। পৃথিবী বদলে গেলেও, সুস্থ থাকতে হলে আমাদের ফিরতে হবে শেকড়ে।

What's Your Reaction?

Like Like 4
Dislike Dislike 0
Love Love 4
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 3
@zerin609 Zerin Jahan Disha Disha