ভাষা ও মানব সভ্যতা: শব্দের ভেতর দিয়ে মানুষ হয়ে ওঠা
ভাষা কীভাবে মানুষের চিন্তা, আবেগ ও সমাজ গড়ে তুলে সভ্যতাকে জীবন্ত রেখেছে- এই লেখাটি সেই মানবিক ও ইতিহাসনির্ভর অনুসন্ধান।
ভাষা ও মানব সভ্যতা: শব্দের ভেতর দিয়ে মানুষ হয়ে ওঠা
খাদিজা আরুশি আরু
ভোরবেলা শহরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা চা- ওয়ালার মুখে প্রথম যে শব্দটা শোনা যায়, সেটা কোনো দর্শন নয়, কোনো তত্ত্বও নয়- একটা ডাক। সেই ডাকে ক্লান্ত শরীর সাড়া দেয়, ঘুম ভাঙে, মানুষের দিন শুরু হয়। ভাষা এভাবেই কাজ করে। বড় বড় সভ্যতার জন্ম ভাষণের মঞ্চে হয়নি; হয়েছে দৈনন্দিন জীবনের ক্ষুদ্র শব্দবিন্যাসে, বাজারের দরদামে, মায়ের আদেশে, শিশুর প্রশ্নে। মানুষ কথা বলেছে বলেই মানুষ একা থাকেনি। আর একা থাকেনি বলেই সভ্যতা তৈরি হয়েছে।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ভাষা কখনো শুধু যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না। এটি ছিল সংগঠনের হাতিয়ার। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় পাওয়া যায়, প্রায় সত্তর হাজার বছর আগে ঘটে যাওয়া所谓 “Cognitive Revolution”-এর সময় থেকেই মানুষের আচরণে নাটকীয় পরিবর্তন আসে। ইউভাল নোয়া হারারি দেখান, মানুষ তখন কল্পনা করতে শিখেছে- দেবতা, নিয়ম, ভবিষ্যৎ। এই কল্পনার ভিত্তি ছিল ভাষা। পশুরা শব্দ করে, কিন্তু তারা গল্প বলতে পারে না। মানুষ পারে। আর গল্পই মানুষকে গোষ্ঠী বানিয়েছে, গোষ্ঠী থেকে সমাজ, সমাজ থেকে রাষ্ট্র।
ভাষার শক্তি বোঝা যায় সংকটের সময়। যুদ্ধের ময়দানে সবচেয়ে আগে যে অস্ত্রটা কাজ করে, সেটা বন্দুক নয়- ঘোষণা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় উইনস্টন চার্চিলের ভাষণ ব্রিটিশ জনগণকে শুধু সাহসই দেয়নি, একটি ভেঙে পড়তে বসা জাতিকে মানসিকভাবে একত্র করেছিল। গবেষকরা দেখান, ভাষণগুলোর শব্দচয়ন ছিল বাস্তববাদী- কষ্ট লুকানো হয়নি, ভয় অস্বীকার করা হয়নি। ভাষা এখানে আশ্বাস নয়, ছিল সৎ স্বীকারোক্তি। সেই সততাই বিশ্বাস তৈরি করেছিল।
একই ভাষার ভিন্ন ব্যবহার মানুষকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যেতে পারে। বিশ শতকের জার্মানিতে ভাষাকে অস্ত্র বানানো হয়েছিল। ভিক্টর ক্লেম্পেরার তার গবেষণায় দেখান, নাৎসি শাসন কীভাবে ধীরে ধীরে দৈনন্দিন শব্দ পাল্টে দিয়েছিল। মানুষ বুঝতেই পারেনি, শব্দ বদলাতে বদলাতে চিন্তাও বদলে যাচ্ছে। ভাষা এখানে আয়না নয়, ছুরি হয়ে উঠেছিল। এই বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়- ভাষা নিরপেক্ষ নয়। এটি মানুষের নৈতিক অবস্থানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে।
বিজ্ঞান ভাষার ভূমিকা নিয়ে আরও গভীরে গেছে। ভাষাবিদ নোয়াম চমস্কি মানুষের মস্তিষ্কে একটি “Language Faculty”-এর কথা বলেন, যা মানুষকে জন্মগতভাবে ভাষা শেখার ক্ষমতা দেয়। নিউরোসায়েন্স দেখিয়েছে, ভাষা ব্যবহার করলে মস্তিষ্কের একাধিক অংশ একসঙ্গে সক্রিয় হয়- স্মৃতি, আবেগ, যুক্তি। অর্থাৎ ভাষা শুধু কথা বলা নয়; এটি চিন্তা করার কাঠামো। তাই কোনো মানুষ যখন ভাষা হারায়, সে শুধু কথা হারায় না- নিজেকে প্রকাশ করার একটা জানালাও বন্ধ হয়ে যায়।
দৈনন্দিন জীবনে এর প্রতিফলন স্পষ্ট। হাসপাতালে বসে থাকা একজন স্বজনের মুখে শোনা যায় চিকিৎসকের একটি বাক্য- সংক্ষিপ্ত, পরিষ্কার। সেই বাক্য আশার হতে পারে, আবার ভেঙে পড়ার কারণও। গবেষণায় দেখা গেছে, চিকিৎসকদের ভাষা রোগীর মানসিক সুস্থতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। একই তথ্য ভিন্নভাবে বললে রোগীর সিদ্ধান্ত বদলে যেতে পারে। এখানে ভাষা তথ্য নয়, অনুভূতির বাহক।
সভ্যতার ইতিহাসে আইন তৈরি হয়েছে ভাষার মাধ্যমে। হাম্মুরাবির বিধিসংহিতা, মাগনা কার্টা কিংবা আধুনিক সংবিধান- সবই ভাষার কাঠামোয় বাঁধা সামাজিক চুক্তি। মানুষ এই ভাষায় বিশ্বাস করে বলেই নিয়ম মানে। সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুর্খেইম বলেন, সামাজিক সংহতি তৈরি হয় যৌথ বিশ্বাস থেকে, আর সেই বিশ্বাস টিকে থাকে প্রতীক ও ভাষার মাধ্যমে। ভাষা ছাড়া ন্যায়বিচার কেবল শক্তির নাম হতো।
তবু ভাষা সব সময় উঁচু মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলে না। কখনো এটি রান্নাঘরের কোণে, কখনো বাসের সিটে বসে থাকা অপরিচিত দু’জনের আলাপে। শহরের কোলাহলে কেউ যখন বলে, “একটু জায়গা দিবেন?”- সেখানে কোনো তত্ত্ব নেই, কিন্তু আছে সভ্যতার ন্যূনতম শিষ্টাচার। এই ছোট বাক্যগুলোই দেখায় মানুষ এখনও মানুষ হয়ে থাকতে চায়।
এইখানেই ভাষা ও মানব সভ্যতার সম্পর্ক সবচেয়ে নগ্নভাবে ধরা দেয়। সভ্যতা মানে শুধু অট্টালিকা বা প্রযুক্তি নয়; সভ্যতা মানে একে অপরকে বোঝার চেষ্টা। আর বোঝার চেষ্টা শব্দ ছাড়া অসম্ভব। প্রযুক্তি যত এগিয়েছে, ভাষার প্রয়োজন তত কমেনি- বরং বেড়েছে। ডিজিটাল যুগে একটি ভুল শব্দ মুহূর্তে হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, আবার একটি সঠিক বাক্য ভরসার জায়গা হয়ে দাঁড়ায়।
ভাষা যখন মানুষকে এক করে, তখন সেটি কেবল যোগাযোগের সেতু নয়- পরিচয়ের মানচিত্রও। একজন মানুষ কীভাবে নিজেকে দেখে, সে পৃথিবীকে কীভাবে বোঝে, তার বড় অংশ গড়ে ওঠে ব্যবহৃত ভাষার ভেতর দিয়ে। নৃতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা যায়, আদিবাসী সমাজগুলোতে ভাষা হারানো মানে শুধু শব্দ হারানো নয়; মানে স্মৃতি, জীবনদর্শন ও প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক হারানো। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী ভাষাগুলোর বিলুপ্তি নিয়ে করা গবেষণায় ভাষাবিদরা দেখিয়েছেন, প্রতিটি ভাষা হারানোর সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে গেছে পরিবেশ বোঝার একটি অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি।
এই বাস্তবতা আধুনিক রাষ্ট্রেও দেখা যায়। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস কেবল রাজনৈতিক দাবি নয়, এটি অস্তিত্বের প্রশ্ন। মানুষ যখন মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার চায়, তখন সে আসলে সম্মানের দাবি জানায়। সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, ভাষার মাধ্যমে মানুষ নিজেকে দৃশ্যমান করে। যে ভাষা রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে জায়গা পায় না, সেই ভাষাভাষীরা ধীরে ধীরে প্রান্তিক হয়ে পড়ে।
গবেষণামূলকভাবে ভাষা ও চিন্তার সম্পর্ক নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত তত্ত্ব হলো সাপির- ওয়ার্ফ হাইপোথিসিস। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ যে ভাষায় কথা বলে, সেই ভাষা তার চিন্তার ধরনকে প্রভাবিত করে। যদিও আধুনিক গবেষণা এটিকে আংশিক সত্য বলে মনে করে, তবু বাস্তব উদাহরণ অস্বীকার করা যায় না। কিছু ভাষায় সময়কে ভবিষ্যৎ-বর্তমান-অতীত হিসেবে ভাগ করা হয় না, বরং ঘটনার ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হয়। ফলে সেই ভাষাভাষীদের সময়বোধ ভিন্নভাবে গড়ে ওঠে।
মানুষের আবেগ ভাষার মাধ্যমে সবচেয়ে স্পষ্ট হয়। মনোবিজ্ঞানে দেখা যায়, কেউ যখন নিজের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করতে পারে, তখন মানসিক চাপ কমে। থেরাপিউটিক কনভারসেশন বা কথা–ভিত্তিক চিকিৎসার ভিত্তিও ভাষা। একজন মানুষ যখন জীবনের জটিলতা শব্দে ফেলতে শেখে, তখন সে নিজের অভিজ্ঞতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে।
প্রযুক্তির যুগে ভাষার চরিত্র বদলেছে, কিন্তু গুরুত্ব কমেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বাক্য মুহূর্তে বিতর্ক তৈরি করতে পারে, আবার একটি লাইন সহমর্মিতার ঢেউ তুলতে পারে। গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন, অনলাইনে ব্যবহৃত ভাষা ধীরে ধীরে মানুষের অফলাইন আচরণেও প্রভাব ফেলছে। সংক্ষিপ্ততা বাড়ছে, ধৈর্য কমছে, কিন্তু একই সঙ্গে নতুন ধরনের সৃজনশীলতা জন্ম নিচ্ছে।
এখানে একটি সূক্ষ্ম প্রশ্ন উঠে আসে: ভাষা কি মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে, নাকি মানুষ ভাষাকে? ইতিহাস বলছে- দুটোই সত্য। মানুষ ভাষা তৈরি করে, আবার ভাষাই মানুষকে গড়ে তোলে। ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো দেখিয়েছেন, জ্ঞান ও ভাষা ক্ষমতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কী বলা যাবে, কী বলা যাবে না- এই সীমারেখা ভাষার মাধ্যমেই নির্ধারিত হয়।
এই কারণে ভাষার অবক্ষয় কখনো নিরীহ ঘটনা নয়। যখন শব্দের মানে হালকা হয়ে যায়, যখন মিথ্যা বারবার বলা হয়, তখন সমাজ ধীরে ধীরে সত্যের প্রতি অসাড় হয়ে পড়ে। সমসাময়িক গবেষণা বলছে, বারবার মিথ্যা শুনলে মস্তিষ্ক সেটিকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে।
তবু ভাষার আশার দিকটাও প্রবল। ইতিহাসে প্রতিটি বড় পরিবর্তনের আগে এসেছে নতুন ভাষা, নতুন বয়ান। দাসপ্রথা বিলুপ্তির আন্দোলন, নারী অধিকার, শ্রমিক অধিকার- সবখানেই ভাষা মানুষকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে।
শেষ পর্যন্ত ভাষা কোনো বিমূর্ত ধারণা হয়ে থাকে না। এটি মানুষের ঘরে ফেরার পথ। সভ্যতার সব উত্থান- পতনের মাঝেও মানুষ যখন কাউকে ডাকতে চেয়েছে, প্রতিবাদ করতে চেয়েছে, ভালোবাসা জানাতে চেয়েছে- ভর করেছে শব্দের ওপরই। ভাষা তাই ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি নয়; এটি চলমান মানবতার শ্বাস।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0