রক্তাক্ত প্রতিশোধ (পর্ব : ০৬)
একটা রহস্যময় খুন, সন্দেহের তীর জাকিয়ার দিকে। সে কি সত্যিই খুনী? নাকি তাকে তুর্পের তাস বানিয়ে আসলে খেলা খেলছে অন্য কেউ?
রক্তাক্ত প্রতিশোধ
খাদিজা আরুশি আরু
পর্বঃ৬
১০
হাসিবের চোখে চোখ রেখে বসে আছে জাকিয়া... গত দুই দিনে মেয়েটা অনেক তিক্ত সত্যের সম্মুখীন হয়েছে... সে এটুকু বুঝেছে যে, এ জীবনে আর কাউকে সে বিশ্বাস করতে পারবে না। তবে মনে মনে সে একজন মানুষের কাছে চির কৃতজ্ঞ, সে মানুষটা আর কেউ নয় সয়ং এস.আই. তন্ময়। মানুষটাকে যতোটা খারাপ ভেবেছিলো ততোটা খারাপ নয় বরং অতিশয় ভদ্র এবং ভালো মানুষ। কুঞ্জ বাইরে দাঁড়িয়ে জাকিয়ার জন্য অপেক্ষা করছে, কিছু কাগজে তার সই নিতে হবে। কোনো প্রকার ভূমিকা ছাড়াই জাকিয়া সামনের মানুষটাকে জিজ্ঞেস করলো,
-কেমন আছো হাসিব?
হাসিবকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে বিদ্রুপের হাসি হাসলো জাকিয়া, তারপর বললো,
-ভালো নেই তুমি তাই না? বলতে হবে না, জানি ভালো নেই তুমি। তোমার মনে আমার জন্য এতো ক্রোধ ছিলো! বেশ অবাক হচ্ছি জানো... এই যে তুমি, বিয়ের কনে পালিয়ে যাওয়ায় নিজের এবং পরিবারের সম্মান নষ্ট হলো বলে প্রতিশোধপরায়ন হয়ে উঠলে... সেই তুমিই কিনা আবার নিজেকে সংযত করতে না পেরে একজন সামান্য কাজের লোককে ধর্ষণ করে অন্তঃস্বত্তা করার পর খুন করে তাকে আত্মহত্যা প্রমান করে দিলে! কি নীতিবোধ তোমার হাসিব... ওভাবে তাকিও না, আমি সব জানি। তুসি মিতুকে মানসিকভাবে এতোটা অসুস্থ করে তুলেছিলে যে ও আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছিলো। প্রত্যক্ষভাবে হোক বা পরোক্ষভাবে তুমি তো মিতু আর তার সন্তানেরও খুনী!
-তুমি কি আমাকে কথা শুনাতে এসেছো জাকিয়া? আমি কিন্তু তোমাকে সত্যিই ভালোবেসেছিলাম...
-হাহ, ভালোবাসা? তুমি ভালোবাসা মানে বোঝো হাসিব? আমি পালিয়ে গিয়েছিলাম, তারপর যদি তুমি নিজেকে শুধরে আমার কাছে ক্ষমা চাইতে তবে নিশ্চয়ই আমি তোমাকে মাফ করে দিতাম। আরে তোমাকে চোখের সামনে শাস্তি পেতে দেখতে পারবো না বলেই তো তোমার ধর্ষণের মতো এতো বড় অপরাধটা চেপে গেলাম... কিন্তু তুমি কি করলে? আমার বান্ধবী সুগন্ধাকেও তোমার দলে টেনে নিলে! ওর দ্বারা প্রতিনিয়ত আমাকে ড্রাগস দিতে লাগলে? এতোটুকুতেও তো তুমি থামো নি হাসিব... তুমি আমাকে বদনাম করার জন্য একটা নবজাতকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করলে! হাসিব, হাসপাতালে তো মৃত বাচ্চাও পাওয়া যেতো, তুমি তাদের কাউকে আনতে... একটা নিষ্পাপ বাচ্চাকে মারতে তোমার হাত কাঁপলো না? তুমি মানুষ না পশু?
এ পর্যায়ে হাসিব ক্রুদ্ধ হয়ে গেলো, জাকিয়ার দিকে ঝুঁকে চিৎকার করে বললো,
-হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি পশু... তুমি একটা জানোয়ারকে ভালোবেসেছিলে জাকিয়া। জানোয়ারকে ভালোবাসবে আর তারপর দূর দূর করবে সেটা কি সে মেনে নেবে? তোমার উপর, তোমার শরীরের উপর আমার বরাবরই নজর ছিলো... অথচ তুমি বারবার বাঈম মাছের মতো হাত ফসকে বের হয়ে যাচ্ছিলে... আরে তোমাকে পাবার জন্য আমি হাসিব বিয়ে অবধি করতে রাজি হয়েছিলাম আর তুমি!
শ্লেষের হাসি হাসলো জাকিয়া, শান্ত ভঙ্গিতে বললো,
-চিৎকার করো না হাসিব, তোমার চিৎকার করা সাজে না...। তুমি তো একটা নয়, দু, দু'টো বাচ্চাকে খুন করেছে। পুরান ঢাকা ছাড়ার পর প্রতিনিয়ত নাসিমার মাধ্যমে আমাকে ড্রাগ দিয়েছো, আর তারপর আমার আনা পথশিশুগুলোর একজনকে নৃসংশতার সঙ্গে খুন করে তাকে বস্তা ভরে পানির টাংকিতে ফেলে দিয়েছো। আমি না প্রায়ই চাইতাম তোমার সঙ্গে আমার অন্তত একবার দেখা হোক, কিন্তু সে দেখাটা এমন হোক তা কখনোই চাই নি। তুমি আমার এপার্টমেন্টে প্রতি সপ্তাহে আসতে, আমার উপর নজর রাখতে... আমার ঘরে তোমার দেয়া ক্যামেরা, প্রজেক্টর নাসিমা ফিট করে রেখেছিলো... আমার অগোচরে এতোবছর যাবত আমার বিরুদ্ধে যড়যন্ত্র চলছিলো, অথচ আমি জানতেও পারি নি! তুমি কতো মেধাবী হাসিব, কেনো নিজের মেধা এসব করে নষ্ট করলে? নিজে তো শেষ হলেই সঙ্গে সুগন্ধা, নাসিমা ওদেরও শেষ করে দিলে। জানো, সুগন্ধাকে গ্রেফতার করার পর ওর বাবা স্ট্রোক করেছে... নাসিমার স্বামী নেশাখোর, নাসিমা জেলে... ছোট ছোট বাচ্চাদুটোর ভবিষ্যত নষ্ট হয়ে গেলো! তারাও হয়তো এভাবেই খারাপ কারো মাধ্যমে অপরাদ জগতে ঢুকে পড়বে... আসলে ভুলটা আমার, ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে আমি একজন রেপিস্টকে ক্ষমা করে দিয়েছিলাম, তাকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমি আমার জীবন দিয়ে আমার পাপের শাস্তি পেয়েছি। আজকের পর আর কখনো আমি অন্যায় সহ্য করবো না...
কথাটা বলেই বেরিয়ে গেলো জাকিয়া... কুঞ্জর সঙ্গে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজে সই করে বের হবার সময় কুঞ্জ বললো,
-ম্যাডাম, তন্ময় স্যার আপনাকে দেখা করতে বলেছে। ডান দিকে গিয়ে হাতের বাম দিকের ঘরটাই স্যারের।
জাকিয়া মুচকি হেসে তন্ময়ের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলো, রুমের দরজায় উঁকি দিয়ে জাকিয়া মিষ্টি করে বললো,
-মি. তন্ময়, আসবো?
তন্ময় জানলার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলো, জাকিয়ার গলার স্বর পেয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললো,
-মিস. জাকিয়া যে! আসুন, ভেতরে আসুন...
-আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আমাকে আপনি একজন অভিশপ্ত মানুষের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। কি করে যে আপনার ঋণ শোধ করবো!
-বাপরে! আজ তো দেখছি মিস জাকিয়া আমার সুনামের ঝাপি খুলে বসেছে! তা বলুন, বলুন...
জাকিয়া মুচকি হেসে তন্ময়ের সামনের চেয়ারে বসতে বসতে বললো,
-না, আসলে আপনাকে খুব বাজে ভেবেছিলাম। ভেবেছিলাম আপনার চরিত্রে দোষ আছে, নিষ্ঠুর, নির্দয়, অহংকারী, আরও কতো কি! কিন্তু আপনি যেভাবে আসল অপরাধীকে ধরলেন তা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। আচ্ছা, কি করে বুঝলেন যে হাসিব খুনটা করেছে?
তন্ময় মুচকি হেসে জাকিয়ার হিরার লকেটওয়ালা চেইনটা তার সামনে ধরে বললো,
-বাচ্চাটার লাশ যে বস্তায় ছিলো সে বস্তায় হুবহু এরকম দেখতে একটা চেইন ছিলো। প্রথম দেখায় যে কেউ বলবে, চেইনটা আপনার এবং আপনিই খুনী। নিজেকে বাঁচাতে হুবহু লকেট বানিয়েছেন... আমিও সর্বসম্মুখে তাই বলেছি, আর নিরবে আসল অপরাধীর খোঁজ করেছি। দেখুন, লকেটটা হুবহু দুজন মানুষ বানাতে পারে, যে আপনাকে লকেট টা দিয়েছে সে বা আপনি। আপনি সেইম দুটো লকেট বানাবেন না, সুতরাং বাকি থাকলো হাসিব। আপনার বাড়ির কাজের লোকের মৃত্যু, পুরান ঢাকায় নবজাতকের মৃত্যু সব মিলিয়ে আমি বুঝে গিয়েছিলাম আপনি বড়সড় একটা ট্রাপে ফেঁসে আছেন। মূলত সে কারনেই আপনাকে গ্রেফতার করি এবং আপনার গলার লকেটটা সংগ্রহ করি। আপনাকে গ্রেফতার না করে নিশ্চয়ই আপনার জিনিসে হাত দিতে পারতাম না। তারপর কেইসটা আপনা আপনিই সমাধান হয়ে গেলো।
-মানে? কিভাবে?
-আপনার বড্ড বেশি কৌতুহল... লকেটের পেছনে জে.এ.এম এই মার্কটা, হাসিবের ভার্সিটির সার্টিফিকেটে জাবেদ আল মামুন নামটা, জাবেদের সঙ্গে আপনার এপার্টমেন্টের সিঁড়িতে আমাদের পরিকল্পিত দেখাটা এবং সর্বশেষে জাবেদের আপনার পূর্বপরিচিত না হবার নিঁখুত অভিনয়টা... সব মিলিয়ে আমি বুঝে গিয়েছিলাম যে সে'ই আসল খুনী।
-কিন্তু ওকে ধরলেন কি করে?
-আপনি গ্রেফতার হবার পর ও আর সুগন্ধা মিলে নাসিমাকে চুক্তি অনুযায়ী টাকা দিতে যায় এবং সে মুহূর্তেই আমরা ওদের হাতেনাতে ধরি। তবে এ কেইসটা আরও আগেই সলভ হয়ে যেতো যদি ফেঁসে যাবার ভয়ে শিহাব সে রাতে জাবেদ এর ওই ফ্লাটে থাকার ব্যাপারে মিথ্যে না বলতো, দারোয়ান চাকরি যাবার ভয়ে তার দুপুরে ঘুমিয়ে পড়ার ব্যাপারটা না লুকাতো... প্রত্যেকেই নিজ স্বার্থে সত্য লুকিয়েছে, অথচ এ সত্য লুকানোর জন্য যে একজন নিরপরাদ মানুষ শাস্তি পেতে যাচ্ছিলো তা তারা ভেবেও দেখে নি!
-সুগন্ধা কেনো এমনটা করেছে কিছু বলেছে?
-আপনি নিজেই তো দেখা করে জিজ্ঞেস করতে পারতেন... দেখা করেন নি কেনো ওর সঙ্গে?
-যে মানুষটা বন্ধুত্বের মতো সম্পর্ককে মূল্য দিতে জানে না তার মুখ দেখতে চাই না আমি।
-হুম, আসলে সে হাসিবকে ভালোবাসতো তাই অন্ধের মতো হাসিবের সব ডিরেকশন ফলো করেছে। সুগন্ধা ছিলো হাসিবের হাতের পুতুল...
-আর নাসিমা?
-সুগন্ধা ওকে মোটা অঙ্কের টাকা অফার করেছিলো, নিজের বাচ্চাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ও রাজি হয়ে যায়।
-শুনলাম আমার ঘরে ক্যামেরা, মিনি প্রজেক্টর আছে, সেটা আপনারা কখন জানলেন?
-আমি একদিন আপনার ঘরে গিয়েছিলাম, আপনি গেট খুলেই সোফায় ঘুমিয়ে পড়েন... তখন আপনার ঘর তল্যাশী করার সময় দেখেছিলাম। আসল অপরাধী সাবধান হয়ে যাবে বিধায় ওগুলো সরাই নি এবং আপনাকেও জানাই নি। তবে হাসিবকে গ্রেফতার করার পর কুঞ্জ গিয়ে আপনার ঘরের ক্যামেরাগুলো সরিয়ে দিয়েছে। এমনকি আপনার পরিবারকেও সবটা জানানো হয়েছে এবং তারা আপনার জন্য আপনার ফ্লাটে অপেক্ষা করছে। ওহ, আপনার চেইনটা...
জাকিয়া মুচকি হেসে তন্ময়ের হাত থেকে চেইনটা নিয়ে জানলা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিলো, তারপর বললো,
-একজন জঘন্য মানুষের কোনো চিহ্ন আমি আর আমার জীবনে রাখতে চাই না। আসছি, আপনাকে আবারও ধন্যবাদ।
কথাটা বলেই মুচকি হেসে বেরিয়ে যাচ্ছিলো ঠিক তখন তন্ময় পিছু ডেকে বললো,
-অভিনন্দন মিস জাকিয়া, হাসিব নামক অভিশাপবিহীন স্বাধীন জীবনটার শুভকামনা রইলো। ভালো থাকবেন...
-আপনিও ভালো থাকবেন, আসছি।
কথাটা বলে যেতে যেতে আবার ফিরে তাকালো জাকিয়া... জিজ্ঞেস করলো,
-আমাকে যে ড্রাগস টা দেয়া হচ্ছিলো তার নাম কি মি. তন্ময়?
-সে নামটা আপনার অজানাই থাক মিস. জাকিয়া কারন নামটা জানলে আপনি নিজেকে সামলাতে না পেরে আবার উক্ত ড্রাগস এর স্মরণাপন্ন হতে পারেন কিন্তু...
জাকিয়া মুচকি হাসলো তারপর যেতে যেতে বললো,
-আমার ধৈর্য্য সম্বন্ধে আপনার বিন্দুমাত্র ধারনা নেই মি. তন্ময়...
চলবে...
What's Your Reaction?
Like
1
Dislike
0
Love
1
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0