ঘরকুণো নীরব মেয়েটার হাতেই গড়ে উঠল রঙরভা!

একটি নীরব মেয়ের চুপচাপ সংগ্রাম ও স্বপ্নের গল্প, যিনি নিজের হাতের কাজের মাধ্যমে আত্মবিশ্বাস ও "রঙরভা" ব্র্যান্ডের জন্ম দিয়েছেন।

ফেব্রুয়ারী 11, 2026 - 18:13
ফেব্রুয়ারী 6, 2026 - 01:39
 0  1
ঘরকুণো নীরব মেয়েটার হাতেই গড়ে উঠল রঙরভা!
একটি নীরব মেয়ের চুপচাপ সংগ্রাম ও স্বপ্নের গল্প, যিনি নিজের হাতের কাজের মাধ্যমে আত্মবিশ্বাস ও রঙরভা ব্র্যান্ডের জন্ম দিয়েছেন।

ঘরকুণো নীরব মেয়েটার হাতেই গড়ে উঠল “রঙরভা”!

সবার খুব সহজে বোঝা যায় না, সে আসলে কে।
কিছু মানুষ আছে, যারা অল্প বয়সেই নিজের জায়গা ঠিক করে ফেলে। আর কিছু মানুষ আছে, যারা চুপচাপ নিজের ভেতরে প্রশ্ন জমাতে জমাতে বড় হয়। এই দ্বিতীয় দলের মানুষগুলো সাধারণত আলোচনায় আসে না। তারা কথা কম বলে, ভিড়ে অস্বস্তি বোধ করে, নিজের সক্ষমতা নিয়ে নিজেই সন্দেহে ভুগে।

পড়াশোনায় খুব ভালোদের তালিকায় নামটি থাকতো না। আবার একেবারে পিছিয়েও না। খাতায় ফলাফল যেটুকু বলত, তার চেয়ে বেশি বলত মানুষের দৃষ্টি। “মোটামুটি”- এই শব্দটি ধীরে ধীরে পরিচয় হয়ে উঠেছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিচয় থেকেই জন্ম নেয় হীনমন্যতা। মনে হতো, “আমি কোথাও পুরোপুরি মানানসই নই।”

আড্ডায় চুপ করে থাকলে মানুষ ধরে নিত- তার হয়তো কিছু বলার নেই।
নিজের কথা জোর দিয়ে না বললে সমাজ ধরে নিত- তার হয়তো নিজের জন্য কিছুই বলার নেই।

এই ভুল বোঝাবুঝির ভেতর দিয়েই দিন কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু ভেতরের কোথাও একটা জায়গা ছিল, যেখানে সবসময় একটুখানি আলোর ছটাক থাকত। রঙের প্রতি ছিল সূক্ষ টান, কাপড়ের প্রতি ছিল আলাদা একটা অনুভব। বাজারে গেলে চোখ চলে যেত থানে থানে সাজানো কাপড়ের দিকে। কেন জানি না, কোন রঙটা কেন ভালো লাগছে- এটা বোঝার চেষ্টা চলত নিঃশব্দে।

এগুলো তখন কোনো পরিকল্পনা ছিল না। কোনো লক্ষ্যও ছিল না।
ছিল শুধু নিজের সঙ্গে নিজের একটা সংযোগ।

সময় গড়াল। পড়াশোনা শেষ হলো। চারপাশে তখন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার তাড়া। কে কী করছে, কে কোথায় চাকরি পেয়েছে- এই হিসেবের ভেতর নিজের নামটি ঠিকঠাক বসছিল না। তখনই প্রথমবার প্রশ্নটি স্পষ্ট হয়ে উঠল- “আমি আসলে নিজে থেকে কী পারি?”

এই প্রশ্নের উত্তর কোনো বই দেয়নি। উত্তর আসতে শুরু করল হাতে কাজ ধরলে। কাপড় কাটা, সেলাই বসানো, ডিজাইন ঠিক করা- সবকিছু ধীরে ধীরে এগোতে লাগল। প্রথমদিকে কাজগুলো ছিল খুবই ছোট, নিজের ঘরের ভেতরেই সীমাবদ্ধ। কেউ খুব একটা লক্ষ্য করত না। কেউ খুব উৎসাহও দিত না।

কিন্তু কাজ করতে করতে একটা জিনিস বদলাতে শুরু করল- নিজের ওপর বিশ্বাস।

এই বিশ্বাস থেকেই জন্ম নিল “রঙরভা”।
কোনো বড় ঘোষণা দিয়ে নয়।
কোনো বিশাল বিনিয়োগ দিয়েও নয়।
শুধু নিজের কাজকে আর লুকিয়ে না রাখার সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে।

প্রথমে রঙরভা শুরু হয় স্টিচ ও আন-স্টিচ থ্রি-পিস দিয়ে। এরপর আসে টু-পিস এবং ওয়ান-পিস। প্রতিটি পোশাক বেছে নেবার পেছনে লাগে সীমাহীন সময়। তাড়াহুড়ো করলে মনমতো পোশাক আনা যায় না। প্রতিটি ডিজাইনের একটি নিজস্ব ছন্দ থাকে, যেটা বোঝার জন্য লাগে সময় এবং ধৈর্য।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর সঙ্গে যুক্ত হলো নিজের হাতে তৈরি গহনা- কানের দুল, রিং, কান-গলার সেট, ব্রেসলেট। অনেক সময় একটি ডিজাইন ভালো লাগে না। ভেঙে আবার নতুন করে শুরু করতে হয়। তাছাড়া সুতার কাজ করা ব্লাউজ পিসে একেকটি ফোঁড় বসাতে বসাতে সময়ের হিসাব থাকে না। আঙুলের মাথায় ব্যথা, সুঁচের গুঁতো, চোখের জ্বালা, ঘাড়-পিঠে ব্যথা- তবু থামা যায় না। কারণ থামলেই ফিরে আসে সেই পুরনো ভয়- “আমি বুঝি কিছুই পারি না, আমার দ্বারা কিছুই হবে না।”   

              

এই পথটা সহজ ছিল না। অনেক দিন গেছে, যখন কোনো অর্ডার আসেনি। পোস্ট দিয়ে অপেক্ষা করতে হয়েছে দিনের পর দিন। তবু সেই অপেক্ষার ভেতর দিয়েই একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেছে- রঙরভা শুধু বিক্রির জায়গা নয়, রঙরভা একটি আত্মপরিচয়ের জায়গা।

এই জার্নিতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটেছে নিজের ভেতরে। যে মেয়েটা একসময় নিজেকে ছোট ভাবত, সে ধীরে ধীরে নিজের কাজের দ্বারা সোজা হয়ে দাঁড়াতে শিখেছে। আয়নায় তাকালে আর আগের মতো অস্বস্তি হয় না। কারণ সে জানে- সে চেষ্টা করছে।

রঙরভা এখনো খুব বড় কিছু নয়। এখনো শেখার অনেক বাকি, সামনে পড়ে আছে এক অন্তহীন রাস্তা। প্রতিদিন হাজারো ভুল হচ্ছে, আবার তা সংশোধনের মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন সম্ভাবনা। কিন্তু এই চলার মধ্যেই নিহিত রঙরভার শক্তি। এখানে সফলতা কোনো শেষ গন্তব্য নয়। সফলতা এখানে প্রতিদিন নিজের ভয়কে অতিক্রম করা।

এই গল্পটা শুধু রঙরভার নয়।
এই গল্পটা তাদের সবার, যারা একসময় নিজেকে নিয়ে সন্দেহে ভুগেছে। যারা চুপচাপ নিজেদের যুদ্ধ লড়েছে, লড়ছে প্রতিনিয়ত। যারা হঠাৎ অনুভব করেছে- নিজেকে আবিষ্কার করাই সবচেয়ে বড় অর্জন।

ঘরকুণো নীরব মেয়েটার হাতেই গড়ে উঠল রঙরভা- এটি শুধু একটি শিরোনাম নয়। এটি একটি সময়ের সত্য।

এবং তুমি যদি কখনো নিজের স্বপ্ন নিয়ে ভীষণ দ্বিধায় থাকো, তাহলে মনে রেখো- একটি ছোট চেষ্টা, এক কাপড়ের ভাঁজ, একটি সুক্ষ সেলাই, এক মুহূর্তের সাহস, সব মিলিয়ে নতুন কিছুর শুরু হতে পারে। তোমার মধ্যেই লুকিয়ে আছে তোমার সফলতার পথযাত্রা, কেবল অনুভবের অপেক্ষা! 

ফেইজবুক- https://www.facebook.com/profile.php?id=61578690543426#

ইন্সটাগ্রাম- https://www.instagram.com/rong.rova/

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0
Khadiza Arushi Aru সখের বশে লেখালেখি শুরু করলেও বর্তমানে তা আর সখ নেই, নেশা হয়ে গেছে। নিজের অনুভূতি, চিন্তাধারা, অভিজ্ঞতাকে অন্যের দ্বারপ্রান্তে সুকৌশলে পৌঁছে দেয়াই হয়তো আমার লিখে যাবার অনুপ্রেরণা! আমার প্রথম সম্পাদিত বই, "নবধারা জল" এবং প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস, "সূর্যপ্রভা"