রক্তাক্ত প্রতিশোধ (পর্ব : ০৭-শেষ পর্ব)

একটা রহস্যময় খুন, সন্দেহের তীর জাকিয়ার দিকে। সে কি সত্যিই খুনী? নাকি তাকে তুর্পের তাস বানিয়ে আসলে খেলা খেলছে অন্য কেউ?

ফেব্রুয়ারী 9, 2026 - 18:21
ফেব্রুয়ারী 7, 2026 - 00:49
 0  2
রক্তাক্ত প্রতিশোধ  (পর্ব : ০৭-শেষ পর্ব)
একটা রহস্যময় খুন, সন্দেহের তীর জাকিয়ার দিকে। সে কি সত্যিই খুনী? নাকি তাকে তুর্পের তাস বানিয়ে আসলে খেলা খেলছে অন্য কেউ?

রক্তাক্ত প্রতিশোধ
খাদিজা আরুশি আরু
পর্বঃ৭ (অন্তিম পর্ব)

১১
আকাশে ঘন কালো মেঘের ঘনঘটা, না চাইতেও তন্ময়ের দৃষ্টি বারংবার রাস্তার অপর পাশে দাঁড়ানো সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত মেয়েটার দিকে যেতে চাইছে... তার দৃষ্টিতে কাতরতা স্পষ্ট, তবে কি এমন দুর্লভ বস্তু পাবার এ কাতরতা তা তার নিজেরও অজানা। বসে থাকতে পারছে না তন্ময়, কাজে মনও বসছে না। বারংবার মনে হচ্ছে, খুব শীঘ্রই বৃষ্টি পড়বে আর সে বৃষ্টি আলতো করে জাকিয়াকে ছুঁয়ে দেবে। হিংসা ব্যাপারটা বরাবরই তন্ময়ের চরিত্রে অনুপস্থিত তবে আজ অনেকদিন পর তার মনে হচ্ছে আসন্ন বৃষ্টি এবং তার অপ্রতিরোধ্য বারিধারাকে তন্ময়ের হিংসে হচ্ছে...

নিজের এরূপ অদ্ভুত আচরনে নিজেই বিস্ময়ের সপ্তমে পৌঁছে যাচ্ছে তন্ময়। নিজেকে যতোবার সামলানোর চেষ্টা করছে ততোবারই বেহায়া দৃষ্টি জাকিয়ার দিকে চলে যাচ্ছে। তার এতো বছরের ক্যারিয়ারে কম জটিল কেইস তো সমাধান করে নি, অথচ এ মেয়েটা যেনো তাকে চুম্বকের মতো নিজের দিকে টানছে... নিজেকে যারপরনাই সামলানোর চেষ্টা করে ব্যার্থ হয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এলো তন্ময়। উদ্দেশ্য কুঞ্জকে খোঁজা... 

বের হতেই দরজার সামনে কুঞ্জকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসতে দেখে সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকালো তন্ময়। তন্ময়ের দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে এবার হো হো করে হেসে দিলে কুঞ্জ, তনয় তাতে বেশ ক্ষেপে গেলো। চোখ পাকিয়ে তাকালো কুঞ্জর দিকে। এদিকে কুঞ্জর হাসির বেগ বাড়ছে তো বাড়ছেই... 

তন্ময় এক প্রকার বিরক্ত হয়ে নিজের রুমে চলে গেলো, কুঞ্জ তার পেছন পেছন ভেতরে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

-স্যার, আপনার মিস. জাকিয়া বেশ কিছুক্ষণ যাবত বাইরে রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে আছেন। বৃহস্পতিবার দিন, তার উপর আকাশের যে দশা, রিকশা পাবেন বলে তো মনে হচ্ছে না...

তন্ময় ভ্রু কুঁচকে কুঞ্জর দিকে তাকালো, তারপর একটা ফাইলে মুখ গুঁজে গম্ভীরভাবে বললো,

-বলছি... তুমি তো একটা কেইসের কাজে ওইদিকেই যাচ্ছো, তো মিস. জাকিয়াকে তার বাসার গলির মোড়ে নামিয়ে দিতে পারো তো। হাজার হোক, জনগনের সেবা করা আমাদের কর্তব্য। 

কুঞ্জ এখনও ঠোঁট টিপে হাসছে, হাসি লুকোনোর ব্যর্থ চেষ্টা করে বললো,

-স্যার, আজকাল যাত্রী বহন করাও বুঝি পুলিশের কর্তব্য?

তন্ময় রাগী চোখে কুঞ্জকে দেখলো, কুঞ্জ মুচকি হেসে বললো,

-আপনার মিস. জাকিয়াকে পৌঁছে কল দিবো স্যার?
-বারবার আপনার মিস. জাকিয়া, আপনার মিস. জাকিয়া করছো কেনো? আমি কখন বললাম সে আমার?
-সব কথা কি বলতে হয় স্যার?

কথাটা বলে তন্ময়ের উত্তরের অপেক্ষা না করে কুঞ্জ বেরিয়ে গেলো। তন্ময় মুচকি হেসে জানলার বাহিরে তাকালো... জাকিয়া এখনো আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে তবে তার চোখে মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট... অন্যদিকে ঘন কালো মেঘের গর্জন আর কড়ই গাছের শুকনো পাতার শব্দ যেনো কোনো মধুর সুর তুলছে... প্রকৃতি যেনো পাগলপারা... 

তন্ময় জাকিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তখনকার কুঞ্জর ব্যবহারের কথা ভাবলো, কেমন পাগলের মতো হাসছিলো সে... নিশ্চইয় তন্ময়ের চোরা চোখের চাহনী কুঞ্জর কাছে ধরা খেয়ে গেছে... ইস, তার রাগী আর গম্ভীর ইমেজটা নষ্ট হয়ে গেলো! প্রকৃতি বর্ষার নবধারায় সিক্ত হবার প্রস্তুতি নিচ্ছে, হয়তো এতো বছর পর দুটো মানবের মুক্তির উল্লাসই এই হঠাৎ বৃষ্টি!

১২
জাকিয়া গাড়িতে উঠে বসেছে, কুঞ্জ গাড়ী স্টার্ট দেবার আগে একবার তন্ময়ের জানলার দিকে তাকালো তারপর গাড়ি নিয়ে চলে গেলো... যতোক্ষণ তাদের দেখা যাচ্ছিলো ততোক্ষণ তন্ময় অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো গাড়ীটার দিকে। আজ অনেক বছর পর তন্ময়ের মনে হচ্ছে মনের কার্নিশে উঁকি দেয়া অবাধ্য স্মৃতিদের একটু আশকারা দিলে মন্দ হয় না!

চেয়ার টেনে বসলো তন্ময়, নিজের ওয়ালেট খুলে সামনে ধরে রাখা হাস্যজ্জ্বল মুখটা দেখে নিমিষেই তন্ময়ের বুকের বা পাশটা ধক করে উঠলো। সেদিনও এমন ঘোর বরষা ছিলো, আর তার পাশে ছিলো ছবির মিষ্টি হাসির মেয়েটি, মিথিলা! আজও ছবিটি আছে, তার মিষ্টি হাসি আছে কিন্তু এই অদ্ভুত সুন্দর হাসির অধিকারী মানবীটি কোথাও নেই!

ওয়ালেটের পকেট থেকে একটা হলদেটে ভাজ পড়ে যাওয়া চিঠি বের করতেই তন্ময়ের মনটা হুহু করে কেঁদে উঠলো। চোখের কান্না তো দৃশ্যমান কিন্তু মনের কান্না যে অদৃশ্য! সে যে কেবল ভুক্তভুগীকেই অনন্তকাল ভোগানোর পণ করে নিরবে জীবনে অনুপ্রবেশ ঘটায়...

প্রতিটা কেইস সফলভাবে সমাধান করার পর তন্ময় এ চিঠিটা একবার করে পড়ে, এ যেনো তার অনুপ্রেরণা! তবে ছবিটার দিকে তাকায় না, আজ অনেক বছর পর ছবিটার দিকে তাকাতেই পুরোনো স্মৃতিগুলো যেনো জাগ্রত হয়ে গেলো...

চিঠিটার প্রতিটি শব্দ তন্ময়ের রক্তে রক্তে মিশে আছে অথচ তবুও বারংবার তার এ চিঠিটিকে ছুঁয়ে দিতে মন চায়... তন্ময় চিঠির ভাজ খুলতেই একটা মিষ্টি সুবাস তার নাকে লাগলো। মিথিলা বকুল ফুল খুব ভালোবাসতো, তার পড়ার টেবিলের আশেপাশে সর্বদা ঝুড়ি ভর্তি বকুল ফুল থাকতো... তার সব জিনিস বকুলের সুবাসে মৌ মৌ করতো, তন্ময় তো একবার মজা করে তাকে বকুলকন্যাও ডেকেছিলো! ইস, সে কি রাগ মিথিলার...

বৃষ্টির শব্দে চারদিক ঝুম ঝুম করছে, তন্ময়ের দৃষ্টি চিঠিতে নিবদ্ধ... যেখানে তার জন্য অনেকগুলো উপদেশ আছে যা তন্ময় আদেশ হিসেবে পালন করে আসছে দীর্ঘদিন যাবত...

তন্ময়,
তুই একদম আমার লাশ দেখে কাঁদবি না, আমি নিজে মরার আগে কাঁদি নি তবে তুই কাঁদবি কেনো? কাঁদে কারা জানিস? বোকারা, ভিতুরা... আমি, তুই, আমরা বোকা বা ভিতু নাকি? শোন, আমি মরছি কারন আমার বাপ-ভাইয়ের টাকা নেই... নিজের সম্মান হারিয়ে আচলে মুখ গুঁজে ঘরকুনো হয়ে বসে থাকবে এমন তো তোর মিথিলা না, তাই না? হ্যাঁ জানি বলবি যে, যাবার আগে অন্তত আমাকে বলতি... কি করে বলি বলতো? আমার একার সমস্যা সমাধানের জন্য দেশের দশের ক্ষতি করবো? মোটেই না... তুই ট্রেনিং করছিস, বড় পুলিশ হবি... নির্দোষ মানুষের পাশে দাঁড়াবি, আর সেই তোকে কি না আমার মতো সামান্য মানুষের সমস্যার সমাধান করার জন্য ডেকে আনবো! দেশের এতো বড় ক্ষতি কি তোর মিথিলা করতে পারে? শোন, সমাজের অন্তত একটা মেয়েকে মিথিলা হওয়া থেকে যেদিন বাঁচাতে পারবি সেদিন বুঝবি তোর মিথিলা ওপারে ভালো আছে। শোন, একদম অনিয়ম করবি না... শরীরে বল না থাকলে দেশের দশের সেবা করবি কি করে? কাজ না থাকলে কখনোই রাত জাগবি না, এক রাতের ঘুম তিন রাত ঘুমালেও পূরণ হয় না বুঝলি? যখন আমার মতো কোনো অসহায় মেয়ে দেখবি তার পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়াবি, আমি কাউকে পাশে পাই নি রে... নিজের প্রতি হওয়া অন্যায়ের বিচার চাইতে গিয়ে দফায় দফায় অপমানিত হয়েছি। অপমান তোর মিথিলা সহ্য করতে পারে না জানিস তো... শোন কাউকে অপমান করবি না, তবে চেহারার গাম্ভীর্য বজায় রাখবি... পুলিশ মানুষ, চেহারায় কাঠিন্য না রেখে চকলেট বয়, চকলেট বয় লুক রাখলে ক্রিমিনাল দূর তোর জুনিয়াররাও তোকে পাত্তা দেবে না। তোর বিয়ের পর তোর বউকে আমার চিঠিটা দিবি, দিয়ে বলবি, "শোনো, আমার সবকিছুর উপর তোমার অধিকার আছে কিন্তু ওয়ালেটে মিথিলার ছবিই থাকবে"! কিরে? বলতে পারবি তো? নাকি তখন মিথিলা পর আর বউ আপন হয়ে যাবে? শোন, মিথিলার সঙ্গে কোনো অন্যায় হলে না... এই মিথিলা ঘুমের মধ্যে তোর ঘাড় মটকে মারবে, হুহ... আমার জায়গা আমারই, তা এরপর তোর জীবনে একটা না দশটা বউ আসুক তাতে আমার বয়েই গেছে। আবারও বলছি, একদম বোকাদের মতো কাঁদবি না তন্ময়... তোর কান্না মোছার জন্য তো তোর কাছে মিথিলা থাকবে না... ভালো থাকার চেষ্টা করিস রে... আমি জানি, আমার তন্ময় চাইলেই ভালো থাকতে পারবে।
ইতি,
তোকে কিছু জ্ঞানের বানী শুনিয়ে একা ফেলে যাওয়া স্বার্থপর মিথিলা।

প্রত্যেকবার চিঠিটা পড়ে কাঁদবে না, কাঁদবে না করেও কেঁদে ফেলে তন্ময়। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না, কেবল পার্থক্য এই যে, সে আজ মিথিলার মতো মিষ্টি হাসির এক রমনীকে খুব কাছ থেকে দেখেছে! একটা টোল পড়া মিষ্টি হাসি আর সঙ্গে দুর্দান্ত ব্যক্তিত্ব... সে জানে না তার আর কখনো জাকিয়ার সঙ্গে দেখা বা কথা হবে কি না, তবে এটুকু জানে আজ সে মিথিলার মতোই একজন নিষ্পাপ নারীকে অপরাধীর সিলমোহরের হাত থেকে বাঁচিয়েছে। তার মিথিলা নিশ্চয়ই আজ ভীষণ খুশি... আচ্ছা, এ ঝুম ঝুম তাল তোলা বৃষ্টিটা কি জাকিয়ার মুক্তি আর তন্ময়ের তার মিথিলাকে দেয়া কথা রাখার আনন্দধ্বনি! ভেবে পায় না তন্ময়, তার কেবল এই ঝুম বৃষ্টিতে গা ভেজাতে মন চাইছে... ঝুম বৃষ্টির মাঝেই বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়লো তন্ময়। 

কোনো এক বরষায় তার পাশে মিথিলা ছিলো, মিথিলার খিলখিল হাসি ছিলো, বৃষ্টিতে স্নিগ্ধ আঁখি পল্লব, আর তার মন মাতানো বকুলের সুবাস... আজ মিথিলা নেই তবে তার স্মৃতি আছে, তন্ময়ের সর্বাঙ্গে তার অনুভূতি আছে... বাইকের গতি বাড়তে লাগলো, গন্তব্য ঠিকানাহীন... বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটাগুলো তন্ময়ের সর্বাঙ্গ ছুঁয়ে দিচ্ছে, তন্ময় মুচকি হেসে সামনের পথে দৃষ্টি স্থির করলো। কে বলেছে মিথিলা নেই, এইতো মিথিলা আছে... ঝুম বরষায়, বৃষ্টির ফোঁটাতে, তন্ময়ের সফলতায়, জাকিয়ার মতো বোকা, নিষ্পাপ মেয়েদের স্বাধীনতার মাঝে আজও মিথিলা আছে... তন্ময় তাকে ছুঁতে পারে না তাতে কি, তাকে অনুভব তো করতে পারে! 

"সমাপ্ত"

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 1
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0
Khadiza Arushi Aru সখের বশে লেখালেখি শুরু করলেও বর্তমানে তা আর সখ নেই, নেশা হয়ে গেছে। নিজের অনুভূতি, চিন্তাধারা, অভিজ্ঞতাকে অন্যের দ্বারপ্রান্তে সুকৌশলে পৌঁছে দেয়াই হয়তো আমার লিখে যাবার অনুপ্রেরণা! আমার প্রথম সম্পাদিত বই, "নবধারা জল" এবং প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস, "সূর্যপ্রভা"