জেফরি এপস্টাইন: ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সাথে সংযোগের এক কলঙ্কিত ইতিহাস
জেফরি এপস্টাইনের অন্ধকার জগত, ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সাথে তার সংযোগ এবং ২০২৬ সালে প্রকাশিত গোপন ফাইলগুলোর বিশদ বিশ্লেষণ। জানুন প্রিন্স অ্যান্ড্রু, বিল গেটস এবং অন্যান্য প্রভাবশালীদের সাথে তার সম্পর্কের আসল সত্য।
জেফরি এপস্টাইন - এই নামটি বিশ্বব্যাপী একটি কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে পরিচিত। একজন আমেরিকান ধনকুবের এবং আর্থিক উপদেষ্টা হিসেবে পরিচিত এপস্টাইন শুধুমাত্র তার অপরাধের জন্যই নয়, বরং বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের সাথে তার সংযোগের জন্যও আলোচনায় এসেছেন। ২০১৯ সালে কারাগারে তার মৃত্যুর পর থেকে, তার জীবন এবং কার্যকলাপ নিয়ে নতুন নতুন তথ্য প্রকাশ পেয়ে চলেছে।
এপস্টাইন কে ছিলেন?
জেফরি এপস্টাইন ১৯৫৩ সালে নিউ ইয়র্ক সিটিতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন গণিত শিক্ষক হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করলেও পরবর্তীতে আর্থিক জগতে প্রবেশ করেন এবং বিশাল সম্পদের মালিক হন। ১৯৮০ এবং ১৯৯০-এর দশকে তিনি ধনী ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের জন্য একজন আর্থিক পরামর্শদাতা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।
কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে ছিল এক ভয়াবহ অন্ধকার। এপস্টাইনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের যৌন নির্যাতন ও পাচারের সাথে জড়িত ছিলেন। ২০০৮ সালে তিনি প্রথমবারের মতো এই ধরনের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন। ২০১৯ সালে পুনরায় গ্রেফতার হওয়ার পর কারাগারে থাকাকালীন তার মৃত্যু হয়, যা আত্মহত্যা বলে ঘোষণা করা হয়।
ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সাথে সংযোগ
এপস্টাইনের কেসের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো তার বিস্তৃত সামাজিক নেটওয়ার্ক। তিনি রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী নেতা, বিজ্ঞানী, এবং বিনোদন জগতের তারকাদের সাথে সম্পর্ক রাখতেন।
রাজনৈতিক সংযোগ
এপস্টাইনের সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সংযোগের কথা জানা যায়। তার মধ্যে রয়েছেন:
- প্রিন্স এন্ড্রু: ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য প্রিন্স এন্ড্রুর সাথে এপস্টাইনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এই সংযোগ এতটাই বিতর্কিত হয়ে ওঠে যে প্রিন্স এন্ড্রুকে তার রাজকীয় দায়িত্ব থেকে সরে আসতে হয়।
- বিল ক্লিনটন: প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এপস্টাইনের ব্যক্তিগত বিমানে একাধিকবার ভ্রমণ করেছেন বলে জানা যায়। তবে ক্লিনটনের মুখপাত্র এপস্টাইনের অপরাধমূলক কার্যকলাপ সম্পর্কে কোনো জ্ঞান থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।
- ডোনাল্ড ট্রাম্প: ট্রাম্প এবং এপস্টাইন ১৯৮০ এবং ১৯৯০-এর দশকে সামাজিক অনুষ্ঠানে একসাথে দেখা গেছে। তবে ট্রাম্প পরবর্তীতে দাবি করেন যে তারা বন্ধুত্ব ছিন্ন করেছেন।
ব্যবসায়িক ও বৈজ্ঞানিক জগতের সংযোগ
- বিল গেটস: মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস এপস্টাইনের সাথে একাধিকবার সাক্ষাৎ করেছেন বলে জানা যায়। গেটস পরে এই সংযোগকে একটি ভুল বলে স্বীকার করেন।
- লেস্লি ওয়েক্সনার: ভিক্টোরিয়াস সিক্রেটের প্রতিষ্ঠাতা ওয়েক্সনার দীর্ঘদিন এপস্টাইনের ক্লায়েন্ট ছিলেন এবং তাকে তার আর্থিক বিষয়ের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দিয়েছিলেন।
সাম্প্রতিক ফাইল প্রকাশ
২০২৫ সালের নভেম্বরে মার্কিন কংগ্রেস "এপস্টাইন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট" পাস করে, যা সরকারকে এপস্টাইন সংক্রান্ত সকল নথি প্রকাশ করতে বাধ্য করে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে, মার্কিন বিচার বিভাগ ৩০ লাখেরও বেশি পৃষ্ঠা, ২০০০টিরও বেশি ভিডিও এবং ১,৮০,০০০টি ছবি প্রকাশ করে।
এই নথিগুলোতে এপস্টাইনের বিভিন্ন ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ, ইমেইল এবং ফটোগ্রাফ রয়েছে। তবে অনেক নথিতে ব্যাপক কালিকাটা (redaction) করা হয়েছে, যা নিয়ে সমালোচনা হয়েছে।
প্রশ্ন যা থেকে যায়
এপস্টাইনের মৃত্যুর পরও অনেক প্রশ্ন অমীমাংসিত রয়ে গেছে:
১. তার অপরাধমূলক কার্যকলাপে আর কে কে জড়িত ছিল? ২. কীভাবে তিনি এত দীর্ঘ সময় ধরে আইনের হাত এড়িয়ে যেতে পেরেছিলেন? ৩. তার ক্ষমতাবান বন্ধুরা কি তার অপরাধ সম্পর্কে জানতেন? ৪. সরকারি নথিতে এত বেশি তথ্য কালিকাটা করার পেছনে কী কারণ?
জেফরি এপস্টাইনের কেস শুধুমাত্র একজন অপরাধীর গল্প নয়। এটি ক্ষমতা, সম্পদ এবং প্রভাব কীভাবে ন্যায়বিচারকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে তার একটি উদাহরণ। তার সাথে সম্পর্কিত ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের নাম প্রকাশ পাওয়ায় সমাজে এই বার্তা গেছে যে, কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
এপস্টাইনের শিকার নারীদের ন্যায়বিচার পাওয়া এবং সত্য প্রকাশ পাওয়ার সংগ্রাম এখনও চলছে। সাম্প্রতিক ফাইল প্রকাশ এই দিকে একটি পদক্ষেপ, তবে সম্পূর্ণ সত্য প্রকাশের জন্য এখনও অনেক পথ বাকি।
এই কেসটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা একটি ন্যায়সংগত সমাজের ভিত্তি। এপস্টাইনের গল্প যেন ভবিষ্যতে এমন অপরাধ প্রতিরোধে এবং শক্তিশালী ব্যক্তিদেরও আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে শিক্ষা হিসেবে কাজ করে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0