রক্তাক্ত প্রতিশোধ (পর্ব : ০৫)
একটা রহস্যময় খুন, সন্দেহের তীর জাকিয়ার দিকে। সে কি সত্যিই খুনী? নাকি তাকে তুর্পের তাস বানিয়ে আসলে খেলা খেলছে অন্য কেউ?
রক্তাক্ত প্রতিশোধ
খাদিজা আরুশি আরু
পর্বঃ৫
-দেড় মাস আগে সে রাতে আমি ছাদ থেকে পালিয়ে আসার পর হাসিব মিতুকে রেপ করেছিলো!
কথাটা বলেই হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠলো জাকিয়া... তার কান্নার বেগ বাড়ছে। কিছুক্ষণ পর সে নিজেই আবার বলতে শুরু করলো,
-হাসিব এমনটা করতে পারে আমি স্বপ্নেও ভাবি নি... মিতু সত্যিটা বলতে গিয়ে ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছিলো বারংবার। আমি ওকে ঠিকমতো স্বান্তনাও দিতে পারি নি। আমি তখন ঠিক কি করবো বা কি করা উচিত বুঝতে পারছিলাম না। আমি দিগ্বিদিক ভুলে কেবল পালাতে চাইছিলাম তখন পরিস্থিতি থেকে। কিন্তু পুরো বাড়ি ভর্তি মেহমান, বিয়ের এতো তোড়জোড় কি করে পালাবো বুঝতে পারছিলাম না। একবার ভাবলাম হাসিবকে পুলিশের কাছে ধরিয়ে দেই কিন্তু পরমুহূর্তে আমার প্রেমিক মন বাদ সাধলো। আমি সব ছেড়ে পালানোর সিদ্ধান্ত নিলাম এবং বিয়ের আগের দিন পালিয়েও গেলাম। আমি তখন অবধি জানতাম না যে মিতু অন্তঃসত্ত্বা। জানলে হয়তো ওকে এভাবে একা ফেলে পালিয়ে যেতাম না...
-হাসিবের সঙ্গে আপনার আর দেখা হয়েছিলো?
-না, আমার এক বান্ধবী বলেছিলো হাসিব নাকি বিয়ে ভাঙ্গার দেড় মাসের মাথায় দেশের বাহিরে চলে গেছে তারপর আর ওর কোনো খোঁজ আমি নেই নি।
-আপনি কি এখনো হাসিবকে ভালোবাসেন?
-ভালোবাসি কি না জানি না, তবে এখনও ওর ভালো স্মৃতিগুলো মনে করে কষ্ট পাই... মাঝে মাঝে ওকে খুব দেখতে ইচ্ছে করে, কি করে যে নিজেকে সামলাই আপনাকে বোঝাতে পারবো না।
-আপনি কি করে নিজেকে সামলান সে খোঁজও আমরা নিয়েছি।
-মানে?
-ড্রাগস নেন তো, নিশ্চয়ই হাসিবকে ভুলতেই এই ড্রাগস নেন তাই না?
জাকিয়া অবাক হয়ে তন্ময়ের দিকে তাকালো তারপর তার দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বললো,
-বিশ্বাস করুন, আমি ড্রাগস নেই না।
তন্ময় তার হাতের ফাইল থেকে জাকিয়ার মেডিক্যাল রিপোর্টটা বের করে তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
-রিপোর্টটা না থাকলে হয়তো আপনার কথা বিশ্বাস করতাম মিস. জাকিয়া।
রিপোর্টটার দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে রইলো জাকিয়া, মুখ দিয়ে কোনো শব্দ করতেও যেনো সে ভুলে গেলো। জীবনে এতো এতো বাজে পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে তবুও কখনো সজ্ঞানে নেশাদ্রব্য ছুঁয়ে দেখে নি অথচ আজ তার মেডিক্যাল রিপোর্ট বলছে সে ড্রগস নেয়! কিছু বললো না জাকিয়া কেবল অপলক রিপোর্টটার দিকে তাকিয়ে রইলো... এ জীবনে তার আর যেনো কিছুই বাকি রইলো না! জাকিয়াকে চুপ করে থাকতে দেখে তন্ময় বললো,
-ওই বাচ্চাটা কি সত্যিই আপনার ছিলো না?
জাকিয়া নিষ্প্রান স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
-কোন বাচ্চাটা?
-যে বাচ্চাটাকে জড়িয়ে আপনাকে বদনাম করা হয়েছিলো... আপনি পুরান ঢাকায় থাকাকালীণ... মনে করার চেষ্টা করুন...
জাকিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে মেঝের দিকে তাকিয়ে শান্তস্বরে বললো,
-মনে পড়েছে, আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে প্রথমে এক বান্ধবীর বাসায় উঠি তারপর ওর মামার দ্বারা একটা চাকরি জোগাড় করি। তখনই পুরান ঢাকায় একটা দুই রুমের বাসা নেই... কিন্তু সেখানেও আমার শান্তি মেলে নি... একদিন সকালে আশেপাশের সবাই মিলে আমার ঘরে এসে খুব বাজে বাজে ভাষায় আমাকে নানা কথা শুনাতে থাকে... আমি বুঝতে পারছিলাম না ঠিক কি কারনে আমাকে কথাগুলো শুনতে হচ্ছে। তবে পুলিশ আসার পর যা শুনলাম তাতে আমি বাকরূদ্ধ হয়ে গেলাম। আমি যে বাসায় থাকতাম তার পেছনের দিকটা প্রতিদিনই সকালে পরিস্কার করা হতো। সেদিন পরিষ্কার করতে গিয়ে একটা মুখবন্ধ পলিথিনে মৃত নবজাতকের লাশ পাওয়া গিয়েছিলো। আর সকলের ধারনা বাচ্চাটা আমার সন্তান এবং আমি অবিবাহিত মা হওয়ায় নিজের দোষ ঢাকতে বাচ্চাটাকে আমি ফেলে দিয়েছি! কারন বাচ্চাটা যে দিকটায় পড়ে ছিলো তার বরাবর উপরেই আমার বারান্দা ছিলো। অবশ্য পরে পুলিশ ডিএনএ টেস্ট করার পর আমার সঙ্গে না মিলায় আমাকে ক্লিন চিটে ছেড়ে দিয়েছিলো কিন্তু সমাজের মানুষ বিশ্বাস করে নি। তাদের ভাষ্যমতে আমি পুলিশকে টাকা দিয়ে রিপোর্ট চেঞ্জ করিয়েছি। তারপর আমি বলতে গেলে বাধ্য হয়ে বাড়িটা ছেড়ে দিয়ে আমার বান্ধবীর বাসায় উঠি, আর তার দুইমাস পর আমার বর্তমান ফ্লাটটা কিনি।
-এ ফ্লাটে আপনি বাচ্চাগুলোকে কেনো আনতেন?
-আসলে আমার পরিবারতো আমি বাড়ি থেকে পালানোর পর আর কোনো যোগাযোগ রাখে নি। নিজের বলতে কেউ ছিলো না, তাই বাচ্চাগুলোর মাঝে নিজের পরিবারকে খুঁজার চেষ্টা করতাম।
-আপনার এই শুভাকাঙ্ক্ষী বান্ধবীর নাম কি ছিলো? সুগন্ধা?
-হুঁ... হ্যাঁ, সুগন্ধা...
কথাটা বলেই তন্ময়ের দিকে তাকালো জাকিয়া, সে প্রথমদিনই বুঝেছিলো যে এ লোকটা খুব চালাক কিন্তু এতো খোঁজ নিয়ে ফেলবে তার সম্বন্ধে এটা ভাবে নি কখনোই... তন্ময় জাকিয়ার দিকে আবারও পানির গ্লাসটি এগিয়ে দিলো, জাকিয়া পানিতে একবার চুমুক দিতেই তন্ময় মুচকি হেসে বললো,
-আপনি কি জানেন আপনি যে পানিটা খাচ্ছেন তাতে আপনার ব্লাডে যে ড্রাগস পাওয়া গেছে তা মেশানো আছে?
জাকিয়ার হাতে ধরে রাখা গ্লাসটা ছিটকে মেঝেতে পড়ে গেলো, স্টিলের গ্লাস মাটিতে পড়ে এক বিদঘুটে শব্দ করে লাফাতে লাফাতে গড়াগড়ি খাচ্ছিলো... জাকিয়া কিছুটা উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
-আ...আপনি আমাকে ড্রাগস কেনো দিলেন?
-আপনি যে ড্রাগ এডিক্টেড তা প্রমাণ করার জন্য...
-মানে?
-মানে আপনাকে যদি প্রথমবার ড্রাগ দেয়া হতো তবে নিশ্চয়ই আপনার মধ্যে কোনো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যেতো কিন্তু আপনি স্বাভাবিকভাবে কথা বলছিলেন। বরং আপনি এখানে যতোটা দুর্বল অবস্থায় এসেছিলেন ততোটা দুর্বল আপনাকে দেখাচ্ছিলো না পানিটা খাবার পর। রিপোর্ট বলছে বাচ্চাটা মারা যাবার ডেট এর পর থেকে আপনার শরীরে ড্রাগ যায় নি অর্থ্যাৎ আপনি ড্রাগ নেন নি। ঠিক সে কারনেই হয়তো আপনি আপনার অফিসে গিয়ে সামান্য পিওনের সঙ্গে উদ্ধত আচরন করেছেন... কি সত্যি তো?
-না...না... না... আমি ড্রাগস নেই না... প্লিজ বিশ্বাস করুন...
তন্ময় ক্রুর হাসলো, তারপর বললো,
-মিস জাকিয়া, আপনি নেশায় বুদ হয়ে বাচ্চাটাকে সেদিন আপনার নৃশংসতার স্বীকার বানিয়েছিলেন তাই না?
-না... আমি ওকে মারি নি। হ্যাঁ ওকে বকেছিলাম কিন্তু আমি ওকে খুন করি নি...
-মিথ্যে বলছেন আপনি, সত্যি করে বলুন...
-আ...আমি সত্যি...
তন্ময় বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো, জাকিয়ার সামনে ঝুঁকে এসে টেবিলে হাত দিয়ে বাড়ি দিয়ে চিৎকার করে বললো,
-আপনি বাচ্চাটাকে খুন করেছেন এবং নেশার ঘোরে করেছেন... বলুন আপনি খুন করেছেন, স্বীকার করুন... কাম অন, একসেপ্ট ইওর ক্রাইম... কাম অন, মিস জাকিয়া...
তন্ময়ের চিৎকারে থরথর করে কাঁপতে লাগলো জাকিয়া, তার কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে অনবরত... তন্ময়কে এতোদিন চরিত্রহীন মনে হলেও এখন তাকে নিষ্ঠুরও মনে হচ্ছে... জাকিয়ার মন চাচ্ছে তন্ময়কে নিজের সব শক্তি দিয়ে ঠেলে নিজ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে। তাকে চুপ থাকতে দেখে তন্ময় আবারও চিৎকার করে বললো,
-কি হলো মিস জাকিয়া? স্বীকার করুন...
-হ্যাঁ... আমি খুন করেছি ওকে...
তন্ময়ের জেরার মুখে পড়ে চিৎকার করে কথাটা বলেই ওড়নায় মুখ গুঁজে কাঁদতে শুরু করলো জাকিয়া... কাঁদতে কাঁদতে এক সময় একদম শান্ত হয়ে গেলো সে। শান্ত স্বরে বললো,
-আমি স্বীকার করছি, আমি খুন করেছি... এখন কি করতে হবে আমাকে? জেলে থাকতে হবে? আচ্ছা, আমার কি ফাঁসি হবে? ফাঁসি না হলেও আমি আর কখনো মুক্তি পাবো না তাই না? শুনুন, প্লিজ আপনি জজ কে আমার হয়ে একটা অনুরোধ করবেন?
এ শান্ত জাকিয়া আর কিছুক্ষণ আগের জাকিয়া যেনো একদম ভিন্ন। তন্ময় তার দিকে তাকিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই চোখ ফিরিয়ে নিলো... এ জাকিয়ার দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না, মনের মধ্যে অন্যরকম অনুভূতির শিহরণ জাগে... তন্ময়কে চুপ থাকতে দেখে জাকিয়া আবার বললো,
-আমি আর বাঁচতে চাই না। অনেক লড়েছি... নিজের সঙ্গে, পরিবারের সঙ্গে, আপনজনের সঙ্গে, সমাজের সঙ্গে... আমার মাঝে আর বিন্দুমাত্র জীবনীশক্তি অবশিষ্ট নেই। আমাকে ফাঁসির শাস্তি দেয়ার অনুরোধ করবেন জজ কে? এটুকু উপকার করলে আমি আপনার কাছে চির ঋনী থাকবো... আমি খুনী... আমি মানুষ নই, আমি খুনী...
বিড়বিড় করতে করতে চেয়ারের বাম পাশে হেলে পড়লো জাকিয়ার মৃতপ্রায় দেহটা... না চাইতেও তন্ময় জাকিয়ার মাথার নিচে নিচের হাতটা রাখলো। কুঞ্জকে বলে একজন লেডি কন্সটেবলকে ডাকিয়ে আনলো। জাকিয়ার জ্ঞান ফিরলে তার সকল জিনিসপত্র পুলিশ হেফাজতে নিয়ে তাকে গ্রেফতার করার আদেশ দিয়ে বেরিয়ে গেলো তন্ময়... তার দম বন্ধ লাগছে, মনে হচ্ছে ওখানে আর এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকলে সে দুর্বল হয়ে পড়বে। অতীত তার মনের কার্নিশে কড়া নাড়ছে, তন্ময় এ কড়াঘাতের শব্দ উপেক্ষা করতে চায় কিন্তু আজ যে মনও বারণ শুনছে না!
চলবে...
What's Your Reaction?
Like
1
Dislike
0
Love
2
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
1