ডিগ্রির বাইরেও যে দক্ষতাগুলো এখন সত্যিই জীবন ও ক্যারিয়ার গড়ে দেয়
ডিগ্রির বাইরে দাঁড়িয়ে বাস্তব দক্ষতা কীভাবে আজকের পরিবর্তনশীল কর্মজীবনে মানুষের টিকে থাকা ও এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করছে—এই লেখাটি তার গভীর বিশ্লেষণ।
ডিগ্রির বাইরেও যে দক্ষতাগুলো এখন সত্যিই জীবন ও ক্যারিয়ার গড়ে দেয়
সামরাজ আফরিন মীম
শিক্ষা মানেই দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট ধারণা সমাজকে শাসন করে এসেছে-ডিগ্রি থাকলে ভবিষ্যৎ আছে, না থাকলে অনিশ্চয়তা। এই ধারণা তৈরি হয়নি একদিনে। ঔপনিবেশিক আমল থেকে শুরু করে শিল্পবিপ্লব-পরবর্তী সময় পর্যন্ত রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মী বাছাই করেছে কাগজের সার্টিফিকেট দেখে। ফলে ডিগ্রি হয়ে উঠেছিল নিরাপত্তার প্রতীক। কিন্তু সময় বদলেছে। প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কাজের ধরনও বদলেছে। আজ প্রশ্ন উঠছে-ডিগ্রি না থাকলেও কি টিকে থাকা যায়? বাস্তবতা বলছে, যায়। শুধু যায় না, অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকা যায়।
ঢাকার কোনো এক গলিতে সকালবেলা দোকানের ঝাঁপ খোলা হয়। একজন তরুণ অনলাইন অর্ডারের লিস্ট মিলিয়ে নেয়। পণ্য প্যাকেট করা, কুরিয়ার বুকিং, কাস্টমার মেসেজের উত্তর-সবই তার নিজের হাতে। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি তার নেই। কিন্তু ডিজিটাল মার্কেটিং, কাস্টমার কমিউনিকেশন আর ডাটা বোঝার ক্ষমতা তাকে মাস শেষে সম্মানজনক আয়ে পৌঁছে দিয়েছে। এই দৃশ্য কল্পনা নয়, নগরের বাস্তব প্রতিদিনের ছবি। এখানে ডিগ্রি নয়, স্কিলই মূল চালিকাশক্তি।
বিশ্ব অর্থনীতির গবেষণা বলছে, দক্ষতার চাহিদা দ্রুত বদলাচ্ছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের “Future of Jobs Report” জানায়, আগামী দশকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে সমস্যা সমাধান, বিশ্লেষণী চিন্তা, ডিজিটাল দক্ষতা এবং মানুষের সঙ্গে কাজ করার ক্ষমতা। এই দক্ষতাগুলোর অনেকটাই ডিগ্রিভিত্তিক নয়, বরং অভ্যাস ও চর্চাভিত্তিক। অর্থনীতিবিদ গ্যারি বেকার তার মানব পুঁজি তত্ত্বে দেখিয়েছিলেন-মানুষের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানই আসল সম্পদ। সেই তত্ত্ব আজ আরও বাস্তব।
ইতিহাসে তাকালেও একই চিত্র দেখা যায়। মাইকেল ফ্যারাডে কোনো প্রথাগত উচ্চশিক্ষা ছাড়াই বিদ্যুৎ ও চুম্বকত্বে যুগান্তকারী কাজ করেছিলেন। তার শেখা ছিল বই বাঁধাইয়ের দোকানে কাজ করতে করতে। আধুনিক যুগে সেই বইয়ের জায়গা নিয়েছে ইন্টারনেট। ইউটিউব, ওপেন কোর্স, গবেষণা জার্নাল-সবই হাতের মুঠোয়। ফলে শেখার দরজা আর বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে আটকে নেই।
সবচেয়ে কার্যকর স্কিলগুলোর একটি হলো যোগাযোগ দক্ষতা। পরিষ্কারভাবে কথা বলা, লিখতে পারা, অন্যের কথা শোনা-এই ক্ষমতাগুলো যেকোনো পেশায় প্রয়োজন। একটি মিটিংয়ে জটিল বিষয় সহজ করে বোঝাতে পারা কিংবা ক্রেতার সমস্যার ভাষা বুঝে সমাধান দেওয়া-এসবের জন্য কোনো সার্টিফিকেট লাগে না, লাগে সচেতন চর্চা। মনোবিজ্ঞানী কার্ল রজার্স বলেছিলেন, মানুষের সঙ্গে আন্তরিক যোগাযোগই বিশ্বাস তৈরি করে। কর্মক্ষেত্রে সেই বিশ্বাসই মূল্যবান।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তিগত দক্ষতা। কোডিং, ডাটা অ্যানালাইসিস, গ্রাফিক ডিজাইন বা ভিডিও এডিটিং-এসব স্কিল শেখা এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ। গুগল, মেটা বা আইবিএমের মতো প্রতিষ্ঠান নিজেরাই স্কিলভিত্তিক সার্টিফিকেশন চালু করেছে, যেখানে ডিগ্রি বাধ্যতামূলক নয়। এটি প্রমাণ করে, বাজার আসলে কী চায়।
তবে এই পরিবর্তনের ভেতর একটি মানবিক চাপও আছে। ডিগ্রি না থাকলে সমাজের চোখে নিজেকে প্রমাণ করার লড়াইটা কঠিন। পরিবারের প্রশ্ন, আত্মীয়দের তুলনা-সব মিলিয়ে মানসিক ভার বাড়ে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দক্ষতা যখন আয় ও কাজের সুযোগ তৈরি করে, তখন সেই প্রশ্নগুলো ধীরে ধীরে নীরব হয়ে যায়। জীবনের গল্প বদলায় কাজের মাধ্যমে, কাগজের মাধ্যমে নয়।
এই পরিবর্তমান বাস্তবতায় প্রশ্নটি তাই নতুনভাবে ভাবতে হয়-ডিগ্রি নয়, কোন দক্ষতাগুলো মানুষকে টিকিয়ে রাখে? সেই উত্তর খুঁজতেই সামনে আসে আরও কিছু মৌলিক স্কিল, যেগুলো ভবিষ্যতের কাজের দুনিয়ায় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এই দক্ষতাগুলোর মধ্যে প্রথমেই আসে সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা। যন্ত্রের যুগে যান্ত্রিক কাজের চাহিদা কমছে, বাড়ছে চিন্তার প্রয়োজন। একটি প্রতিষ্ঠানে হঠাৎ করে বিক্রি কমে গেলে কেউ যদি বসে থাকে নির্দেশনার অপেক্ষায়, সে পিছিয়ে পড়ে। আর যে ব্যক্তি পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে কারণ খুঁজে বের করে, নতুন উপায় প্রস্তাব করে, সে হয়ে ওঠে অপরিহার্য। হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে-critical thinking এখন আর অতিরিক্ত গুণ নয়, এটি মৌলিক দক্ষতা। এই ক্ষমতা কোনো কোর্সের সিলেবাসে সীমাবদ্ধ নয়, এটি গড়ে ওঠে প্রশ্ন করতে শেখার মধ্য দিয়ে।
এরপর আসে শেখার দক্ষতা। আজ যে স্কিল দিয়ে আয় হচ্ছে, পাঁচ বছর পর তা অচল হয়ে যেতে পারে। ফলে সবচেয়ে বড় স্কিল হয়ে দাঁড়ায় দ্রুত শেখার ক্ষমতা। মনোবিজ্ঞানী ক্যারল ডুয়েকের “growth mindset” ধারণা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। যারা বিশ্বাস করে দক্ষতা চর্চার মাধ্যমে বাড়ানো যায়, তারা পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেয়। কর্মজীবনে দেখা যায়, একই বয়সের দুজন মানুষের একজন নতুন সফটওয়্যার শিখতে ভয় পায়, অন্যজন আগ্রহ নিয়ে বসে পড়ে। কয়েক বছরের ব্যবধানে তাদের অবস্থান সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যায়।
স্বনিয়ন্ত্রণ ও সময় ব্যবস্থাপনাও ডিগ্রির বাইরে থাকা একটি বড় শক্তি। ফ্রিল্যান্সিং, রিমোট কাজ বা উদ্যোক্তা জীবনে কেউ ঘাড়ে দাঁড়িয়ে নির্দেশ দেয় না। নিজের কাজ নিজেকেই সামলাতে হয়। সকালে ঠিক সময়ে কাজ শুরু করা, অপ্রয়োজনীয় স্ক্রলিং থামানো, কাজের অগ্রাধিকার ঠিক করা-এসবই নীরব দক্ষতা। আচরণবিজ্ঞানী বি.এফ. স্কিনারের গবেষণায় দেখা যায়, অভ্যাসই মানুষের দীর্ঘমেয়াদি আচরণ নির্ধারণ করে। এই অভ্যাসগুলোই শেষ পর্যন্ত আয় ও স্থিতিশীলতার ভিত্তি গড়ে দেয়।
মানুষের সঙ্গে কাজ করার দক্ষতা, বা সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। প্রযুক্তি যতই এগোক, মানুষ মানুষকেই নিয়োগ দেয়। সহকর্মীর সঙ্গে মতবিরোধ সামলানো, ক্লায়েন্টের রাগ ঠান্ডা করা, টিমকে অনুপ্রাণিত করা-এসব জায়গায় প্রযুক্তি ব্যর্থ। সমাজবিজ্ঞানী পিয়ের বুর্দিয়ু সামাজিক পুঁজি ধারণার মাধ্যমে দেখিয়েছেন, সম্পর্ক ও নেটওয়ার্কও সম্পদ। এই সম্পদ অর্জন হয় আচরণ, সহানুভূতি ও বিশ্বাসের মাধ্যমে।
ডিজিটাল যুগে তথ্য যাচাইয়ের ক্ষমতাও একটি অপরিহার্য স্কিল হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন অসংখ্য তথ্য ভেসে আসে। কোনটি সত্য, কোনটি ভুল-এটি বুঝতে না পারলে সিদ্ধান্তও ভুল হয়। গবেষণামূলক সাংবাদিকতা ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মূল শিক্ষা হলো প্রমাণ দেখা। এই দক্ষতা শুধু সাংবাদিক বা গবেষকের জন্য নয়, সাধারণ নাগরিকের জন্যও প্রয়োজনীয়।
এই সব দক্ষতার ভেতর একটি সাধারণ সূত্র আছে-এগুলো মানুষকে মানুষ হিসেবেই মূল্যবান করে তোলে। ডিগ্রি অনেক সময় দরজা খুলে দেয়, কিন্তু ভেতরে টিকিয়ে রাখে দক্ষতা। বাস্তব জীবনে তাই দেখা যায়, কেউ হয়তো প্রথম চাকরিটা পায় পরিচয়ের জোরে, কিন্তু পরের পদোন্নতি আসে কাজের দক্ষতায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাগজের মূল্য কমে, মানুষের সক্ষমতার মূল্য বাড়ে।
সম্পাদকীয় দৃষ্টিতে তাই প্রশ্নটি ডিগ্রি বনাম স্কিল নয়, বরং শিক্ষার সংজ্ঞা নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। শিক্ষা মানে শুধু সনদ নয়, শিক্ষা মানে সক্ষমতা। যে সমাজ এই বাস্তবতা বুঝতে পারবে, সে সমাজই ভবিষ্যতের পরিবর্তনের সঙ্গে টিকে থাকবে। আর যে ব্যক্তি নিজের ভেতরের দক্ষতাকে চর্চা করে, সে একা নয়-তার গল্পে প্রতিফলিত হয় সময়ের সত্য।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0