ভোটের বাক্সে নতুন ঢেউ: বাংলাদেশের রাজনীতিতে জেন-জির উত্থানের বাস্তব পাঠ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন প্রজন্ম জেন-জির উত্থান স্পষ্ট হচ্ছে। ১৮–২৩ বছরের তরুণ ভোটাররা স্মার্টফোন, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে রাজনৈতিক তথ্য সংগ্রহ করছে, বিশ্লেষণ করছে এবং অংশগ্রহণ করছে। তারা শুধু দলীয় স্লোগানে নয়, নীতিনির্ধারণ, স্বচ্ছতা, মানবাধিকার ও পরিবেশ নিয়ে সচেতন। যদিও ডিজিটাল তথ্য ভুবনে ভুয়া খবর ও বিভ্রান্তি চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে, তথাপি এই প্রজন্মের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাংলাদেশের গণতন্ত্রে নতুন আলো এনে দিচ্ছে। জেন-জি তাদের ভোট ও সক্রিয় নাগরিকতা দিয়ে রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে তথ্যনির্ভর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার সম্ভাবনা রাখে।

ফেব্রুয়ারী 12, 2026 - 20:00
 0  2
ভোটের বাক্সে নতুন ঢেউ: বাংলাদেশের রাজনীতিতে জেন-জির উত্থানের বাস্তব পাঠ
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন প্রজন্ম জেন-জির উত্থান স্পষ্ট হচ্ছে। ১৮–২৩ বছরের তরুণ ভোটাররা স্মার্টফোন, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে রাজনৈতিক তথ্য সংগ্রহ করছে, বিশ্লেষণ করছে এবং অংশগ্রহণ করছে। তারা শুধু দলীয় স্লোগানে নয়, নীতিনির্ধারণ, স্বচ্ছতা, মানবাধিকার ও পরিবেশ নিয়ে সচেতন। যদিও ডিজিটাল তথ্য ভুবনে ভুয়া খবর ও বিভ্রান্তি চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে, তথাপি এই প্রজন্মের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাংলাদেশের গণতন্ত্রে নতুন আলো এনে দিচ্ছে। জেন-জি তাদের ভোট ও সক্রিয় নাগরিকতা দিয়ে রাজনৈতিক সংস্

ভোটের বাক্সে নতুন ঢেউ: বাংলাদেশের রাজনীতিতে জেন-জির উত্থানের বাস্তব পাঠ

খাদিজা আরুশি আরু

ভোটের দিন ভোরবেলা। রাজধানীর একটা ভোট কেন্দ্রের সামনে দীর্ঘ লাইন। মোবাইল হাতে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। কেউ লাইভ করছে ফেসবুকে, কেউবা বন্ধুকে মেসেজ করছে, আবার কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে- প্রথমবার ভোট দেওয়ার উত্তেজনায় বুক কাঁপছে। এই দৃশ্য নতুন কিছু নয়। কিন্তু যা নতুন, তা হলো এর ভেতরের সুর। যে প্রজন্ম স্বাধীনতার গল্প বইয়ে পড়েছে, গণতন্ত্রের সংকট টিভিতে দেখেছে, আর রাজনৈতিক বিতর্কে বড় হয়েছে ফেসবুকের অ্যালগরিদমের ভেতর দিয়ে—সেই জেন-জি এখন ভোটের বাক্সে নিজের কথা বলছে। জোরে, স্পষ্টভাবে।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশের বেশি তরুণ। নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক ভোটার তালিকায় চোখ রাখলে দেখবেন, নতুন ভোটারদের বিশাল অংশটার বয়স ১৮ থেকে ২৩-এর মধ্যে। এরা জন্মেছে ২০০০ সালের পর, বড় হয়েছে স্মার্টফোন আর ফ্রি ওয়াইফাইয়ের যুগে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের একটা গবেষণা বলছে, সারা বিশ্বেই জেন-জি রাজনৈতিক খবরের জন্য টিভি-পত্রিকার চেয়ে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ওপর বেশি ভরসা করে। বাংলাদেশেও একই গল্প। ফেসবুক লাইভে বিতর্ক, ইউটিউবে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, টিকটকে ব্যঙ্গাত্মক ভিডিও- সবকিছু মিলিয়ে রাজনীতি এখন আক্ষরিক অর্থেই তাদের হাতের মুঠোয়।

এই প্রজন্মের রাজনৈতিক চেতনা তৈরি হয়েছে একেবারে বাস্তবের মাঠে। মনে পড়ে ২০১৮ সালের সড়ক নিরাপত্তা আন্দোলনের কথা? স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা রাস্তায় নেমেছিল। নিজেরাই ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করেছে, লাইসেন্স চেক করেছে, রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি চেয়েছে। আন্দোলনের ভাষা ছিল সোজা, কিন্তু দৃঢ়। এরপর একে একে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা আন্দোলন- শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে, কোটা সংস্কার নিয়ে, পরিবেশ বাঁচানো নিয়ে। প্রতিটা ক্ষেত্রেই তরুণদের উপস্থিতি স্পষ্ট। শুধু প্রতিবাদ নয়, তারা তথ্য খুঁজেছে, আইনের ধারা পড়েছে, আদালতের রায় বিশ্লেষণ করেছে। রাজনীতি তাদের কাছে শুধু স্লোগান নয়—এটা নীতিনির্ধারণের গল্প, নিজের ভবিষ্যতের গল্প।

রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানী রোনাল্ড ইনগেলহার্ট একটা তত্ত্ব দিয়েছিলেন- ‘পোস্ট-ম্যাটেরিয়ালিস্ট ভ্যালুজ’। মোটামুটি বলতে গেলে, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা যখন কিছুটা নিশ্চিত হয়, তখন তরুণ প্রজন্ম মানবাধিকার, পরিবেশ, স্বচ্ছতার মতো বিষয়ে বেশি মনোযোগ দেয়। বাংলাদেশের নগর মধ্যবিত্ত তরুণদের মধ্যে এর প্রতিফলন দেখা যায়। তারা শুধু দলীয় পতাকার পেছনে ছুটছে না। তারা জানতে চায়- এই প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা কী? সম্পদের হিসাব কেমন? দুর্নীতির অভিযোগ আছে কি না? ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের প্রতিবেদন প্রকাশ হলে সামাজিক মাধ্যমে যে ঝড় ওঠে, তার সিংহভাগ চালনা করে এই তরুণরাই।

এই উত্থান শুধু আশাবাদের গল্প নয়, কিছু চ্যালেঞ্জও আছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যেমন তথ্যের দরজা খুলে দিয়েছে, তেমনি ভুয়া খবরের ঝুঁকিও বাড়িয়েছে। অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের গবেষণা অনুযায়ী, সামাজিক মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য দ্রুত ছড়ায়- আর তরুণ ব্যবহারকারীরাই সবচেয়ে বেশি এর শিকার। বাংলাদেশেও নির্বাচনের সময় গুজব ছড়িয়ে উত্তেজনা তৈরির নজির কম নয়। ফলে জেন-জির রাজনৈতিক অংশগ্রহণ একদিকে শক্তি, অন্যদিকে দায়িত্বও। তথ্য যাচাই করা, সত্য-মিথ্যা আলাদা করা- এসব এখন জরুরি দক্ষতা।

গ্রামের এক তরুণ- কৃষকের ছেলে- স্মার্টফোনে ইউটিউব খুলে বাজেট বিশ্লেষণ শুনছে। জানতে চাইছে কৃষি ভর্তুকি কমলে তার বাবার কী প্রভাব পড়বে। শহরের এক তরুণী চাকরিপ্রার্থী- সরকারি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে স্বচ্ছতার বিষয়ে। তারা পেশাদার রাজনীতিবিদ নয়, কিন্তু নীতির প্রভাব তাদের জীবনে সরাসরি পড়ে। এই সংযোগই জেন-জির রাজনীতিকে ব্যক্তিগত করে তুলেছে। ভোট এখন শুধু নাগরিক দায়িত্ব নয়- এটা নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটা উপায়।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখবেন, তরুণদের রাজনৈতিক ভূমিকা নতুন কিছু নয়। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ- প্রতিটা অধ্যায়ে ছাত্রসমাজ ছিল সামনের সারিতে। পার্থক্য শুধু মাধ্যমে। তখন ছিল মাইক আর দেয়াললিখন, এখন হ্যাশট্যাগ আর ভাইরাল ভিডিও। কিন্তু মূল সুর একই- অধিকার আর মর্যাদার দাবি। জেন-জি সেই ধারাবাহিকতার উত্তরাধিকার বহন করছে, শুধু তাদের ভাষা আর কৌশল ভিন্ন।

অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছিলেন, গণতন্ত্র শুধু ভোটের প্রক্রিয়া নয়- এটা আলোচনার পরিসর। জেন-জির রাজনীতি সেই আলোচনাকে আরও বিস্তৃত করছে। অনলাইন পিটিশন, ওপেন ডেটা বিশ্লেষণ, নাগরিক সাংবাদিকতা- সব মিলিয়ে তারা রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে। তবে শুধু প্রশ্ন তোলাই শেষ কথা নয়। প্রয়োজন সংগঠিত আর নীতিনির্ভর অংশগ্রহণ। এখানে রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব আছে- তরুণদের জন্য বাস্তব কর্মসূচি আর নেতৃত্বের সুযোগ তৈরি করা।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে জেন-জির প্রভাব কতটা গভীর হবে? সেটা নির্ভর করবে তাদের ধারাবাহিকতার ওপর। যদি তারা ক্ষণিকের আবেগে নয়, তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণে অবিচল থাকে- তাহলে এই পরিবর্তন স্থায়ী হবে। যদি তারা মতভেদকে সহনশীলতার সঙ্গে গ্রহণ করে, ব্যক্তিপূজার বদলে প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে চায়- তবে এই ঢেউ সাময়িক নয়, স্থায়ী রূপ নেবে। ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই তরুণদের চোখে যে প্রত্যাশা জ্বলজ্বল করছে, সেটা কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়। এটা রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের স্বপ্ন। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পথচলায় এই প্রজন্মই হয়তো নতুন অধ্যায়ের সূচনা লিখছে- একটা অধ্যায় যেখানে তথ্য, স্বচ্ছতা, আর জবাবদিহিতা হবে মূল কথা।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0
Khadiza Arushi Aru সখের বশে লেখালেখি শুরু করলেও বর্তমানে তা আর সখ নেই, নেশা হয়ে গেছে। নিজের অনুভূতি, চিন্তাধারা, অভিজ্ঞতাকে অন্যের দ্বারপ্রান্তে সুকৌশলে পৌঁছে দেয়াই হয়তো আমার লিখে যাবার অনুপ্রেরণা! আমার প্রথম সম্পাদিত বই, "নবধারা জল" এবং প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস, "সূর্যপ্রভা"