সিলিকন বনাম স্নায়ু: অসম প্রযুক্তির যুগে মানুষের অসমাপ্ত কথোপকথন

প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির মাঝেও মানুষের আবেগ, নৈতিকতা ও অভিজ্ঞতার গভীরতা যন্ত্রের সীমা অতিক্রম করে- সিলিকন গণনা করে, কিন্তু অর্থ দেয় স্নায়ু।

ফেব্রুয়ারী 12, 2026 - 19:00
 0  1
সিলিকন বনাম স্নায়ু: অসম প্রযুক্তির যুগে মানুষের অসমাপ্ত কথোপকথন
প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির মাঝেও মানুষের আবেগ, নৈতিকতা ও অভিজ্ঞতার গভীরতা যন্ত্রের সীমা অতিক্রম করে- সিলিকন গণনা করে, কিন্তু অর্থ দেয় স্নায়ু।

সিলিকন বনাম স্নায়ু: অসম প্রযুক্তির যুগে মানুষের অসমাপ্ত কথোপকথন

খাদিজা আরুশি আরু


ভোরের আলো ফোটার আগেই শহরের অসংখ্য জানালায় নীলচে আলো জ্বলে ওঠে। অ্যালার্ম বন্ধ করতে হাত বাড়ায় মানুষ, আর তার আঙুলের ছোঁয়ায় জেগে ওঠে সিলিকনের পৃথিবী। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আর কল্পবিজ্ঞান নয়; এটি অর্থনীতি, চিকিৎসা, কৃষি, শিক্ষা- সবখানেই প্রবেশ করেছে। তবু এই অগ্রগতির ভেতরে এক নীরব পার্থক্য কাজ করে: যন্ত্রের গণনা ও মানুষের অনুভবের পার্থক্য।

১৯৫৬ সালে ডার্টমাউথ সম্মেলনে “Artificial Intelligence” শব্দবন্ধটি আনুষ্ঠানিকভাবে উচ্চারিত হয়। জন ম্যাকার্থি ও তাঁর সহকর্মীরা ভেবেছিলেন, মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক কাজকে মেশিনে রূপ দেওয়া সম্ভব। এরপর থেকে নিউরাল নেটওয়ার্ক, ডিপ লার্নিং, জেনারেটিভ মডেল- প্রযুক্তি এগিয়েছে বিস্ময়কর গতিতে। ২০২৩ সালের একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, বড় ভাষা মডেল জটিল প্রশ্নের উত্তর দিতে এবং চিকিৎসা পরীক্ষায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখাতে পারে। কিন্তু গবেষকরাই সতর্ক করেছেন- এই সাফল্য পরিসংখ্যানগত প্যাটার্ন চেনার ফল, মানবীয় উপলব্ধির নয়।

একটি সরকারি হাসপাতালে দুপুরবেলা লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে মানুষ। চিকিৎসক রোগীর রিপোর্ট হাতে নিয়ে কেবল সংখ্যার দিকে তাকান না; তিনি চোখের ভাঁজে জমে থাকা আতঙ্ক পড়েন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চিকিৎসা- সিদ্ধান্তে সহানুভূতি রোগীর আরোগ্যে প্রভাব ফেলে। মেশিন রক্তচাপ মাপতে পারে, অ্যালগরিদম ঝুঁকি নির্ণয় করতে পারে, কিন্তু রোগীর নিঃশব্দ প্রশ্নের উত্তরে যে আশ্বাস দরকার- তার কোনো কোড নেই।

শিক্ষাক্ষেত্রেও একই দৃশ্য। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করে, শেখার দুর্বলতা চিহ্নিত করে। অথচ শ্রেণিকক্ষে একজন শিক্ষক বোঝেন, কার খাতা ভেজা কালি দিয়ে লেখা, কার চোখ লাল ঘুমের অভাবে। হার্ভার্ডের শিক্ষাবিষয়ক গবেষণায় প্রমাণ হয়েছে, শিক্ষার্থীর মানসিক নিরাপত্তা শেখার গতিকে বাড়ায়। এই নিরাপত্তা তৈরি হয় মানবিক সম্পর্ক থেকে, ডেটা থেকে নয়।

অর্থনীতির ময়দানেও যন্ত্রের ক্ষমতা বিস্ময়কর। অ্যালগরিদমিক ট্রেডিং সেকেন্ডের ভগ্নাংশে সিদ্ধান্ত নেয়। তবু ২০০৮ সালের আর্থিক সংকট স্মরণ করিয়ে দেয়, সংখ্যার বাইরে মানুষের লোভ, ভয় ও আস্থাহীনতা কত বড় ভূমিকা রাখে। আচরণগত অর্থনীতির গবেষক ড্যানিয়েল কাহনেমান দেখিয়েছেন, মানুষের সিদ্ধান্ত প্রায়ই যুক্তির চেয়ে অনুভূতির দ্বারা প্রভাবিত। এই মানবিক অনিশ্চয়তাই বাজারকে শুধু সমীকরণে বন্দি হতে দেয় না।

গ্রামের মাঠে কৃষক আবহাওয়ার পূর্বাভাস শোনেন মোবাইলে। স্যাটেলাইট ডেটা তাঁকে বৃষ্টির সম্ভাবনা জানায়। কিন্তু মাটির গন্ধ, বাতাসের আর্দ্রতা, গত বছরের ক্ষতির স্মৃতি- এসব মিলিয়ে যে সিদ্ধান্ত তিনি নেন, তা কেবল তথ্যের যোগফল নয়। খাদ্য ও কৃষি সংস্থার গবেষণায় বলা হয়েছে, স্থানীয় অভিজ্ঞতা টেকসই কৃষিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সিলিকন চিপ গণনা করে, নিউরন স্মৃতি ও আবেগের জাল বোনে। স্নায়ুবিজ্ঞানী আন্তোনিও দামাসিও দেখিয়েছেন, আবেগ ছাড়া সিদ্ধান্ত অসম্পূর্ণ। তাঁর গবেষণায় দেখা গেছে, মস্তিষ্কের আবেগ- সম্পর্কিত অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে যুক্তি থাকলেও কার্যকর সিদ্ধান্ত নষ্ট হয়। প্রযুক্তি নিখুঁত হতে চায়, মানুষ অসম্পূর্ণ হয়েও সম্পূর্ণ। এই অসমতার ভেতরেই চলতে থাকে এক অনন্ত কথোপকথন, যেখানে যন্ত্র প্রশ্নের উত্তর দেয়, আর মানুষ উত্তরকে অর্থ দেয়।

শহরের একটি সংবাদকক্ষে সন্ধ্যার ব্যস্ততা। বড় পর্দায় রিয়েল-টাইম ডেটা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রবণতা, ভোটের হিসাব। অ্যালগরিদম বলে দেয় কোন খবর বেশি পড়া হচ্ছে। তবু সম্পাদক জানেন, সংখ্যার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষের নীরব প্রতিক্রিয়া। সাংবাদিক মাঠ থেকে ফিরে বলেন, জনতার চোখে যে সংশয়, সেটি গ্রাফে ধরা পড়ে না। গণমাধ্যম গবেষণা দেখায়, আস্থা তৈরি হয় সম্পর্ক থেকে; কেবল তথ্য পরিবেশন নয়, প্রেক্ষাপট বোঝানোর মধ্য দিয়ে।

একটি শিল্পগ্যালারিতে দর্শক দাঁড়িয়ে আছে একটি ক্যানভাসের সামনে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি চিত্রও আজ আন্তর্জাতিক নিলামে বিক্রি হচ্ছে। ২০১৮ সালে এক এআই-সৃষ্ট চিত্র নিউ ইয়র্কে উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়েছিল, যা শিল্পজগতকে বিস্মিত করেছিল। কিন্তু দর্শক যখন ছবির সামনে থেমে যান, তিনি শুধু রঙের বিন্যাস দেখেন না; তিনি নিজের স্মৃতি, ক্ষতি, প্রেম- সবকিছুর সঙ্গে মিল খোঁজেন। নন্দনতত্ত্ববিদরা দীর্ঘদিন ধরে বলেছেন, শিল্পের অর্থ জন্মায় দর্শক ও শিল্পীর অভিজ্ঞতার সংলাপে। মেশিন সেই সংলাপের ভাষা নকল করতে পারে, কিন্তু অভিজ্ঞতার ভেতর বাস করতে পারে না।

বাড়ির ভেতর এক মা সন্তানের পড়ার টেবিল গুছিয়ে দেন। শিশু গণিতের সমস্যা সমাধান করে ট্যাবলেটে, কিন্তু ভুল হলে চোখের কোণে যে অশ্রু জমে, তা মুছিয়ে দেন মানুষই। মনোবিজ্ঞানী জন বোলবির সংযুক্তি তত্ত্ব জানায়, নিরাপদ সম্পর্ক মানসিক বিকাশের ভিত্তি। প্রযুক্তি সহায়ক হতে পারে, কিন্তু সম্পর্কের উষ্ণতা প্রতিস্থাপন করতে পারে না।

বিজ্ঞান গবেষণাগারে সুপারকম্পিউটার বিপুল ডেটা বিশ্লেষণ করে। জলবায়ু পরিবর্তনের পূর্বাভাস, জিনোম সিকোয়েন্সিং, মহাকাশ অনুসন্ধান- সবখানে যন্ত্র অপরিহার্য। তবু থমাস কুন তাঁর বৈজ্ঞানিক বিপ্লব তত্ত্বে দেখিয়েছিলেন, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি কেবল তথ্যের সঞ্চয় নয়; এটি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। সেই পরিবর্তন আসে প্রশ্ন করার সাহস থেকে, কল্পনার ঝুঁকি নেওয়া থেকে। অ্যালগরিদম বিদ্যমান ডেটা থেকে শিখে; মানুষ অজানার দিকে হাঁটে।

নৈতিকতার প্রশ্নও ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। স্বয়ংচালিত গাড়ি দুর্ঘটনা এড়াতে সিদ্ধান্ত নেয় মিলিসেকেন্ডে। কিন্তু কার জীবন অগ্রাধিকার পাবে- এই প্রশ্নে প্রযুক্তিবিদদের সঙ্গে নীতিশাস্ত্রবিদদের আলোচনাই শেষ কথা নয়। দার্শনিক হান্না আরেন্ট মানুষকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন কর্ম ও দায়িত্বের মাধ্যমে। সিদ্ধান্তের নৈতিক ভার বহন করে মানুষ, যন্ত্র নয়।

অর্থনীতিতে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে অটোমেশন প্রয়োজন, তবু আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার প্রতিবেদন মনে করিয়ে দেয়, কর্মসংস্থানের মানে শুধু আয় নয়; মর্যাদা ও সামাজিক পরিচয়ও। কাজ হারানোর ভয় মানুষের আত্মপরিচয়ে আঘাত হানে। অ্যালগরিদম দক্ষতা বাড়ায়, কিন্তু সম্মান দেয় না।

স্নায়ুবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, মানুষের মস্তিষ্কে প্রায় ছিয়াশি বিলিয়ন নিউরন জটিল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। এই নেটওয়ার্কে স্মৃতি, অনুভূতি, ভাষা একে অপরকে প্রভাবিত করে। কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্ক সেই কাঠামোর অনুকরণ, পূর্ণ প্রতিরূপ নয়। ফলে যন্ত্র যতই উন্নত হোক, তার প্রতিক্রিয়া সম্ভাবনার পরিসংখ্যান; মানুষের প্রতিক্রিয়া অভিজ্ঞতার ইতিহাস।

প্রযুক্তি তাই শত্রু নয়, প্রতিদ্বন্দ্বীও নয়। এটি সহযাত্রী, যে পথ দেখাতে পারে, কিন্তু পথের মানে নির্ধারণ করে না। সিলিকন দ্রুত, নির্ভুল, নিরাবেগ। স্নায়ু ধীর, দ্বিধাগ্রস্ত, কিন্তু অর্থপূর্ণ। এই দুইয়ের সংলাপেই ভবিষ্যৎ নির্মিত হবে- যেখানে যন্ত্র গণনা দেবে, আর মানুষ সেই গণনাকে গল্পে রূপ দেবে। অসম পৃথিবীতে এই অসমাপ্ত কথোপকথন চলতেই থাকবে, কারণ মানুষের ভেতরের গল্প থেমে থাকে না কখনও।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0
Khadiza Arushi Aru সখের বশে লেখালেখি শুরু করলেও বর্তমানে তা আর সখ নেই, নেশা হয়ে গেছে। নিজের অনুভূতি, চিন্তাধারা, অভিজ্ঞতাকে অন্যের দ্বারপ্রান্তে সুকৌশলে পৌঁছে দেয়াই হয়তো আমার লিখে যাবার অনুপ্রেরণা! আমার প্রথম সম্পাদিত বই, "নবধারা জল" এবং প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস, "সূর্যপ্রভা"