ভাষাই যখন বাধা: যন্ত্রের জন্য তৈরি ভাষায় মানুষের বন্দিদশা।

ভাষাই যখন বাধা: যন্ত্রের জন্য তৈরি ভাষায় মানুষের বন্দিদশা” লেখাটি দেখায় কীভাবে যন্ত্রের কঠোর ও নিয়মভিত্তিক ভাষা অনেক সময় মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি ও প্রকাশকে আটকে দেয়। কোডের ভাষায় সামান্য ভুলও অগ্রহণযোগ্য, যেখানে মানুষের ভাষা নমনীয় ও অনুভূতিপূর্ণ। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে-আমরা কি যন্ত্রের ভাষায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছি, নাকি প্রযুক্তিকে এমনভাবে গড়ে তুলতে পারব, যাতে তা মানুষের ভাষা ও মানবিকতাকে সম্মান করে? শেষ পর্যন্ত লেখাটি মনে করিয়ে দেয়, ভাষা যেন শিকল না হয়ে মানুষের মুক্তির মাধ্যম হয়।

ফেব্রুয়ারী 21, 2026 - 19:21
ফেব্রুয়ারী 14, 2026 - 18:20
 0  1
ভাষাই যখন বাধা: যন্ত্রের জন্য তৈরি ভাষায় মানুষের বন্দিদশা।

ভাষাই যখন বাধা: যন্ত্রের জন্য তৈরি ভাষায় মানুষের বন্দিদশা

খাদিজা আরুশি আরু

চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার, শুধু একটা স্ক্রিন জ্বলছে। স্ক্রিনের সামনে বসা লোকটা ভাবছে, তার মনের ভেতর কত গল্প, কত স্বপ্ন, কত প্রশ্ন কিলবিল করছে, সেগুলো কি এই কিবোর্ডের গণ্ডি পেরিয়ে বেরোতে পারবে? সেমিকোলনের কাছে এসে তার আঙুল আটকে যায়। একটা ছোট্ট ভুল হলেই তো কম্পিউটার বলবে- ভুল হয়েছে! মনে হয় যেন একটা যন্ত্র বিচারকের আসনে বসে আছে, আর তার সব চিন্তা সেখানে আসামীর মতো দাঁড়িয়ে।

ভাষা তো মানুষের পরিচয়। মানুষ ভাষা দিয়ে কত কি বানিয়েছে-দেশ, নিয়মকানুন, অর্থনীতি। ভাষা না থাকলে আমরা একসাথে কাজ করতে পারতাম না। অথচ এখন আমরা এমন একটা ভাষা ব্যবহার করছি যেটা মানুষের জন্য নয়, তৈরি হয়েছে শুধু যন্ত্রের জন্য। কম্পিউটারের ভাষা একেবারে সোজা, কঠিন, সেখানে ভুল করার জায়গা নেই, কোনো আবেগের দাম নেই। আর এখানেই সমস্যাটা শুরু হয়।

অ্যালান টুরিং নামের এক বিজ্ঞানী ১৯৪০ সালে বলেছিলেন, যদি কোনো যন্ত্র মানুষের মতো উত্তর দিতে পারে, তাহলে সেটা বুদ্ধিমান কিনা সেটা একটা আলোচনার বিষয় হতে পারে। তার সেই পরীক্ষাটা (“টুরিং টেস্ট”) বুদ্ধিমত্তা নিয়ে একটা নতুন চিন্তা শুরু করেছিল। তবে টুরিং নিজেও জানতেন, যন্ত্রের ভাষা আর মানুষের ভাষা এক নয়। যন্ত্র শুধু নিয়ম বোঝে, আর মানুষ বুঝতে পারে আসল মানে। একটা চলে যুক্তি দিয়ে, অন্যটা অনুভূতি দিয়ে।

আমরা প্রতিদিনই এটা টের পাই। ধরুন, একটা সরকারি ওয়েবসাইটে কিছু জমা দিতে গিয়ে দেখলেন একটা ঘরও যদি খালি থাকে, তাহলে পুরো ফর্ম বাতিল। একজন কৃষক হয়তো প্রথমবার মোবাইল দিয়ে চেষ্টা করছেন, তিনি বুঝতেই পারছেন না কোন ঘরে কি লিখতে হবে। তার কাছে ভাষাটা কোনো সাহায্যই করলো না, বরং একটা দেয়াল হয়ে দাঁড়ালো। আবার কোনো বৃদ্ধ লোক হয়তো হাসপাতালে অনলাইনে টিকিট কাটতে গিয়ে বার বার ভুল পাসওয়ার্ড দিচ্ছেন। স্ক্রিনে লেখা উঠছে- “ইনভ্যালিড ইনপুট”। অথচ তার কষ্টটা তো সত্যি, তার সময়টা দামি। যন্ত্রের ভাষা সেটা বোঝে না।

কম্পিউটারের ভাষায় অনেক উন্নতি হয়েছে, আগেকার চেয়ে এখনকার ভাষাগুলো অনেক সহজ। যেমন- সি, পাইথন এগুলো আগের চেয়ে অনেক সহজ। কিন্তু সহজ হলেই তো আর মানুষের মতো হয় না। একটু ভুল হলেই সব শেষ। ভাষাবিজ্ঞানী নোয়াম চমস্কি বলেছিলেন, মানুষের ভাষা এমন একটা জিনিস যেখানে অল্প কিছু নিয়ম দিয়ে অনেক নতুন বাক্য তৈরি করা যায়। কম্পিউটারের ভাষাও নিয়ম মেনে চলে, কিন্তু সেটা শুধু যন্ত্রের ভেতরেই সীমাবদ্ধ। মানুষ যখন কথা বলে, তার সাথে অনেক কিছু জুড়ে থাকে-তার আগের ঘটনা, তার অভিজ্ঞতা, তার অনুভূতি। কোড তো আর সেটা জানে না।

এই সমস্যাটা শুধু প্রযুক্তির নয়, এটা সামাজিকও। আজকাল সবাই মনে করে ভালো চাকরি পেতে গেলে প্রোগ্রামিং জানতে হবে। তাই অনেকে কোড শিখছে, কিন্তু নিজের ভাষায় চিন্তা করার অভ্যাসটা হারিয়ে ফেলছে। একটা ক্লাসে দেখলাম, ছাত্ররা কম্পিউটারের ভাষায় প্রোগ্রাম লিখছে, কিন্তু সেটাকে নিজের ভাষায় বোঝাতে পারছে না। ভাষাটা এখানে বন্ধু না হয়ে যেন দুটো দেয়াল তৈরি করে দিয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ভাষা আমাদের চিন্তাভাবনাকে বদলাতে পারে। আমরা যে ভাষায় কথা বলি, সেটা আমাদের চারপাশের জগতকে দেখার চোখ তৈরি করে দেয়। যদি আমাদের চিন্তাগুলো সব সময় যন্ত্রের ভাষায় আটকে থাকে, তাহলে কি আমাদের মনের জোর কমে যাবে? বাচ্চারা যখন প্রথম কোড লিখতে শেখে, তখন কি তারা রূপকথার জগৎ থেকে দূরে সরে যায়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়া সহজ নয়, তবে এগুলো নিয়ে ভাবা দরকার।

তবে হ্যাঁ, প্রযুক্তি কিন্তু একদিকে থেমে নেই। এখন কম্পিউটারও মানুষের ভাষা বোঝার চেষ্টা করছে। যন্ত্র এখন অনুবাদ করতে পারে, লিখতে পারে, প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। কিন্তু এখানেও একটা সীমা আছে। যন্ত্র হয়তো কিছু হিসাব করে একটা মানে বের করে, কিন্তু মানুষের মতো অভিজ্ঞতা দিয়ে তো আর বুঝতে পারে না। একটা কবিতার লাইন যে কষ্ট বোঝায়, সেটা তো যন্ত্র শুধু সংখ্যায় বোঝে। তবে এটা ভালো যে যন্ত্র এখন মানুষের ভাষার দিকে এগোচ্ছে, মানুষকে যন্ত্রের ভাষায় বন্দী হতে হচ্ছে না।

এখন প্রশ্ন হলো, এই ভাষা আমাদের মুক্তি দেবে, নাকি নতুন কোনো শিকল পরাবে? উত্তরটা আমাদের হাতেই। যদি আমরা প্রযুক্তিকে মানুষের মতো করে তৈরি করতে পারি, তাহলে ভাষা আবার বন্ধু হয়ে উঠবে। আর যদি শুধু যন্ত্রের সুবিধা দেখি, মানুষের অনুভূতিকে ভুলে যাই, তাহলে এই কিবোর্ডই আমাদের জন্য জেলখানা হয়ে যাবে।

স্ক্রিনের আলো যখন নিভে যায়, তখন মানুষ আবার তার নিজের ভাষায় কথা বলে। বাচ্চার সাথে গল্প করে, মায়ের কাছে গল্প শোনে, বন্ধুর কাছে মন খুলে কথা বলে। সেই ভাষায় ভুল হলে কেউ বিচার করে না, সবাই বোঝার চেষ্টা করে। প্রযুক্তির ভবিষ্যৎটাও এই বোঝাপড়ার ওপরই দাঁড়িয়ে আছে। ভাষা যখন শিকল হয়ে যায়, তখন তাকে আবার ফিরিয়ে আনতে হয়-মানুষের জন্য, মানুষের ভাষায়।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0
Khadiza Arushi Aru সখের বশে লেখালেখি শুরু করলেও বর্তমানে তা আর সখ নেই, নেশা হয়ে গেছে। নিজের অনুভূতি, চিন্তাধারা, অভিজ্ঞতাকে অন্যের দ্বারপ্রান্তে সুকৌশলে পৌঁছে দেয়াই হয়তো আমার লিখে যাবার অনুপ্রেরণা! আমার প্রথম সম্পাদিত বই, "নবধারা জল" এবং প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস, "সূর্যপ্রভা"