যে চলে যায়, আর যে চুপ করে থাকে: ভালোবাসা, হারানোর কষ্ট, আর না বলা কথাগুলোর বোঝা (পর্ব-০৫)

চলে যাওয়া আর চুপ থাকা: এই গল্পটা ভালোবাসার গভীর দিকগুলো নিয়ে, যেখানে হারানোর বেদনা আর না বলা কথাগুলো মিশে আছে। ভালোবাসা শুধু কাছে থাকা নয়, বরং দূরে থাকার দীর্ঘশ্বাসও। দুজনে যেন দুই ছবি-একজন হাঁটে, অন্যজন চুপ। যে যায়, সে খারাপ না-ও হতে পারে, হয়তো ভয় পায়, ক্লান্ত হয়, বা চায় নিজেকে বাঁচাতে। দূরে গেলে কষ্ট কমবে ভেবে সে সরে যায়, কিন্তু এতে অন্য মনে দাগ পড়ে। অন্যদিকে, যে চুপ থাকে, সে যোদ্ধা। অভিযোগ না করে, সে শুধু অপেক্ষায় থাকে। তার নীরব ভালোবাসা গভীর, সে হয়তো ভাবে একদিন সব ঠিক হবে। কিন্তু চুপ থেকে তার কষ্ট বাড়ে, জমে থাকা কথাগুলো কষ্টের নদী গড়ে তোলে। এই গল্প আমাদের দেখায়, ভালোবাসা শুধু কাছে থাকা নয়-ভয়, ভাবনা, আর সম্মানের হিসাব। কেউ ভালোবাসে তাই দূরে যায়, কেউ বা ভালোবাসে তাই অপেক্ষা করে। এতে তৈরি হয় ভুল বোঝাবুঝি, দূরত্ব, আর না বলা কথার চাপ। সবশেষে, চুপ করে থাকাই ভালোবাসার আসল শত্রু। কথা না বললে, অনুভূতি চেপে রাখলে সম্পর্ক ভাঙে। তাই ভালোবাসা বাঁচাতে সাহস লাগে-পালিয়ে নয়, থেকে গিয়ে সত্যিটা বলতে হয়।

ফেব্রুয়ারী 18, 2026 - 17:44
 0  3
যে চলে যায়, আর যে চুপ করে থাকে: ভালোবাসা, হারানোর কষ্ট, আর না বলা কথাগুলোর বোঝা (পর্ব-০৫)

পর্ব ০৫: অহংকার, সম্মান, আর চাপা কান্না: কিছু সম্পর্ক কেন কথা না বলেই শেষ হয়ে যায়?

খাদিজা আরুশি আরু

এমন কিছু দুঃখ আছে, যা নীরবে সয়ে যেতে হয়। তুমি দেখছো, ভালোবাসার মানুষটি ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে, অথচ তোমার মুখ বাঁধা, হাত স্থির। হৃদয় ভেঙে যাচ্ছে, তবু তোমার আত্মসম্মান অটুট। হয়তো হাত বাড়ালেই সম্পর্কটা বাঁচানো যেত, কিন্তু ভালোবাসার চেয়েও শক্তিশালী কিছু তোমাকে আটকে রেখেছে-তোমার গর্ব, তোমার অহংকার, আর সেই সঙ্গে করুণ দেখানোর ভয়।

মনের ভেতর তোলপাড় করা অনুভূতিগুলো ১৭ বার ধরে মেসেজ লেখার চেষ্টা করে, আবার ১৭ বারই মুছে দেয়। খুব সাধারণ কয়েকটা শব্দ-’তোমাকে মিস করি, একটু কথা বলতে পারি?’-লিখতে গিয়েও যেন তা পাঠানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। স্ক্রিনের ওপর বুড়ো আঙুলটা কেবল ভেসে বেড়ায়। কল্পনায় ভেসে ওঠে তার উত্তর-করুণা, কিংবা তার চেয়েও খারাপ কিছু, হয়তো স্বস্তি যে অবশেষে কেউ একজন প্রথম ভেঙেছে। সেই মেসেজটা পাঠালে নিজের তৈরি করা পরিচিতিটাই যে ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। তাই শেষমেশ লেখাটা মুছে ফেলে, গলায় আটকে থাকা শব্দগুলো যেন ভাঙা কাঁচের মতো বিঁধতে থাকে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় তার হাসিখুশি ছবিগুলো ভেসে ওঠে। বন্ধুদের সঙ্গে প্রাণখোলা হাসি, যা দেখে মনে হয় সে বেশ ভালো আছে। ইচ্ছে করে একটা ছোট্ট মন্তব্য করতে, কিন্তু যদি সে উত্তর না দেয়? অথবা উত্তর দিলেও যদি সেটা হয় শুধু ভদ্রতা রক্ষার খাতিরে? হাত বাড়ালেই মুখ থুবড়ে পড়ার ভয়-নিজেকে অভাবী, করুণ দেখানোর ভয়। পুনর্মিলনের সামান্য সম্ভাবনাও যেন অপমানের ভয়ে চাপা পড়ে যায়। তাই স্ক্রল করে পরের ছবিতে চলে যেতে হয়।

একদিন একটি লোকের সাথে কথা হয়, যে তার বাবার সাথে আট বছর ধরে কোনো কথা বলেনি। সামান্য একটা বিষয় নিয়ে ঝগড়া হয়েছিল, যা এখন আর মনেও নেই। তার বাবা এখন ৭৪ বছর বয়সে। প্রতি সপ্তাহে তিনি ফোন করেন, কিন্তু সে কখনো বাবাকে ফোন করে না। কারণ প্রথম ফোন করা মানেই নিজের ভুল স্বীকার করা। অথবা এই স্বীকারোক্তি যে, বাবার প্রতি তার বেশি টান রয়েছে। এখানে কোনো নাটকীয়তা নেই, শুধু দিনের পর দিন জমে থাকা নীরবতা। ধীরে ধীরে গর্বটাকেই বেছে নেওয়া, সম্পর্কের চেয়ে বেশি মূল্যবান মনে করা। আর এভাবেই দিনগুলো বছর হয়ে যায়, এবং এক সময় সেই মানুষটি চিরতরে হারিয়ে যায়, যাকে তুমি ফোন করতে দ্বিধা বোধ করছিলে।

একদিন কফিশপে দেখা হয়ে যায় সেই মানুষটির সাথে। মুহূর্তের জন্য হৃদস্পন্দন থেমে যায়। সে কাউন্টারে অর্ডার করছে, এখনও তাকে দেখেনি। চাইলে এড়িয়ে যাওয়া যায়, কিন্তু পা যেন মাটির সাথে আটকে গেছে। যখন সে ঘুরলো, চোখাচোখি। মাত্র তিন সেকেন্ডের জন্য তাদের সম্পর্কের পুরো ইতিহাসটা যেন চোখের সামনে ভেসে উঠলো। তারপর সে মাথা নেড়ে সৌজন্য দেখায়, কিন্তু দূরত্ব বজায় রাখে। তাদের মধ্যে দূরত্ব ছিল হয়তো কয়েক সেন্টিমিটারের মতো। চাইলে কিছু বলা যেত, যেকোনো কিছু। কিন্তু নীরবতাই যেন তখন একমাত্র পথ।

কিছু না বলা কথা, না করা অভিযোগ, জমা থাকা অভিমান-সব যেন চিঠির পাতায় ভর করে। ক্ষমা, অজুহাত, আর কতটা কষ্ট হয়-সবকিছু লিখে ড্রয়ারে লুকিয়ে রাখে, যেন এটা এমন কোনো অপরাধের প্রমাণ, যা কেউ দেখেনি। গোপনে নিজের ভেতরের দ্বন্দ্বের সাথে লড়াই করে, সেই অনুভূতিগুলোর মোকাবিলা করে, যেগুলো তাকে আহত করতে পারে। কিন্তু গোপনে মোকাবিলা করা অনুভূতিগুলো গোপনই থেকে যায়, কিছুই মেরামত করে না।

এমন একজন নারীর কথাও জানে, যার প্রিয় বান্ধবী কোনো কারণ ছাড়াই তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। দশ বছরের বন্ধুত্ব, আর হঠাৎ একদিন নিস্তব্ধতা। চাইলে সে তার বান্ধবীর বাড়িতে যেতে পারত, কিন্তু নিজেকে বুঝিয়েছিল যে বান্ধবী কথা বলতে চাইলে ঠিকই খুঁজে নেবে। মনোবিজ্ঞানী হ্যারিয়েট লার্নারের মতে, গর্ব প্রায়ই নীতিবোধের ছদ্মবেশ ধারণ করে। আমরা হাত না বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে আত্মসম্মান হিসেবে জাহির করি, যদিও এর পেছনে কাজ করে প্রত্যাখ্যানের ভয়।

জানে, তার ভাই খুব কষ্টে আছে। তার ফোন করা উচিত। সে ফোন করতেও চায়, কিন্তু একটা ঝগড়ার পর তারা মাসের পর মাস কথা বলেনি, আর এখন ফোন করা মানেই নিজের ভুল স্বীকার করা। যত দেরি হচ্ছে, পরিস্থিতি ততই কঠিন হয়ে যাচ্ছে। নীরবতা যেন সুদের মতো বাড়তে থাকে। প্রথমে ছোট ফাটল মনে হলেও, পরে তা বিশাল খাদে পরিণত হয়।

ছোট্ট একটা অপারেশনের জন্য হাসপাতালে। সল্প-জ্ঞান সল্প-চেতন অবস্থায় নার্সকে তার ভাইয়ের ফোন নম্বর দিয়ে বলে, তাকে যেন ফোন করা হয়। জানায়, সে তার জরুরি কন্টাক্ট। যদিও তারা এক বছর ধরে কথা বলেনি। কিন্তু ওষুধের প্রভাবে তৈরি হওয়া দুর্বলতা ভেদ করে আসল সত্যটা বেরিয়ে আসে-সে চায় তার ভাই পাশে থাকুক। যখন জ্ঞান ফেরে, তখন সে লজ্জিত। তার আত্মসম্মান অটুট থাকে, কিন্তু সেই সঙ্গে তার নিঃসঙ্গতাও।

ট্র্যাজেডি শুধু বিদায়ে নয়, বরং বিদায়ে নীরবতার যে দেয়াল তৈরি হয়, সেটাই আসল কষ্ট। সেই কথাগুলো, যা বলা যেত, কিন্তু বলা হয়নি। সেই হাতটা, যা বাড়িয়ে ধরা যেত, কিন্তু মুঠোবন্দী থেকে গেছে। সেই ভালোবাসা, যা এখনও বেঁচে আছে, কিন্তু অহংকার আর বোকা হওয়ার ভয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। তারা হয়তো এখনো কথা বলছে, তবে আলাদা ঘরে, আলাদা জীবনে, নিজেদের তৈরি করা কারাগারে। সেই কারাগারের চাবি তাদের হাতেই আছে। দরজা খোলা, শুধু খুললেই স্বীকার করতে হবে যে তাদের এমন কিছুর প্রয়োজন, যা তারা প্রয়োজন নেই বলে ভান করছে। তাই তারা ভেতরেই বন্দী থেকে যায়, নিজেদের বোঝায় যে আত্মসম্মান ভালোবাসার চেয়েও বেশি মূল্যবান, আর গর্ব সংযোগের বিকল্প হতে পারে। তারা বিশ্বাস করতে চায়, পুরো বিদায়টা গিলে ফেলাটাই ছিল সাহসের কাজ, যদিও আসলে সেটা ছিল শুধু নিরাপদ একটা অজুহাত।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0
Khadiza Arushi Aru সখের বশে লেখালেখি শুরু করলেও বর্তমানে তা আর সখ নেই, নেশা হয়ে গেছে। নিজের অনুভূতি, চিন্তাধারা, অভিজ্ঞতাকে অন্যের দ্বারপ্রান্তে সুকৌশলে পৌঁছে দেয়াই হয়তো আমার লিখে যাবার অনুপ্রেরণা! আমার প্রথম সম্পাদিত বই, "নবধারা জল" এবং প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস, "সূর্যপ্রভা"