সেমিকোলনের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া গল্প: কোডিং যখন সৃজনশীলতা নয়, শুধুই টাইপিং
এই লেখায় বলা হয়েছে, প্রোগ্রামিং শেখার সময় অতিরিক্ত সিনট্যাক্স ও নিয়মের চাপ অনেক সময় সৃজনশীলতাকে চাপা দেয়। আইডিয়া বা সমস্যার সমাধানের ইচ্ছা থাকলেও মানুষ সেমিকোলন, ব্র্যাকেট আর টিউটোরিয়ালের জঙ্গলে হারিয়ে যায়। গবেষণায় দেখা যায়, অধিকাংশ শিক্ষার্থী টিউটোরিয়াল নির্ভর হয়ে পড়ে এবং নিজের মতো করে কিছু তৈরি করতে পারে না। যদিও MIT-এর গবেষণা ও Scratch-এর মতো প্ল্যাটফর্ম সৃজনশীল শিক্ষার পথ দেখিয়েছে এবং AI কোডিং সহজ করছে, তবুও প্রশ্ন থেকে যায়—সিনট্যাক্সের বাধা পুরো সরিয়ে দিলে কি সত্যিকারের গভীরতা ও সৃষ্টিশীলতা বজায় থাকবে?
সেমিকোলনের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া গল্প: কোডিং যখন সৃজনশীলতা নয়, শুধুই টাইপিং
খাদিজা আরুশি আরু
একটা সুর ছিল, এক শিল্পী পিয়ানোতে সেটা তুলতেই বসলেন। কিন্তু গুরুমশাই ধমকে উঠলেন, আগে স্বরলিপি মুখস্থ করো, কোন আঙুল কোথায় বসবে, তাল-লয় সব রপ্ত করো। মাসের পর মাস ধরে নিয়ম ঘঁষতে ঘঁষতে সুরটা কোথায় যেন হারিয়ে গেল। একদিন সকালে উঠেই দেখলেন, পিয়ানোর সামনে বসলেই আর সেই অনুভূতিটা নেই। শুধু নিয়ম আর হিসাবের বোঝা। সুরটা হয়তো ভেতরেই কোথাও মরে গেল।
প্রোগ্রামিংও অনেকটা তাই। ধরুন, কেউ একজন একটা অ্যাপ বানাতে চান, যেটা তার বুড়ো মাকে রোজ ওষুধের কথা মনে করিয়ে দেবে। আইডিয়াটা সহজ, সুন্দর। পুরো ব্যাপারটা তার মাথায় পরিষ্কার—সকাল আটটায় একটা নোটিফিকেশন আসবে, মা দেখবেন, ওষুধ খাবেন। কিন্তু এই স্বপ্নটাকে সত্যি করতে গেলেই শিখতে হবে—ভেরিয়েবল, ডেটা টাইপ, কন্ডিশনাল স্টেটমেন্ট, লুপ, ফাংশন, আরও কত কী! আর তার সঙ্গে সেমিকোলন, ব্র্যাকেট, ইন্ডেন্টেশন তো আছেই। একটা ছোট্ট কাজ করতে গিয়েই মানুষটা হারিয়ে যান জটিলতার গোলকধাঁধায়।
আসলে আইডিয়াটা হয়তো মরে যায় না, কিন্তু সেমিকোলনের জঙ্গলে চাপা পড়ে যায়।
কম্পিউটার সায়েন্সে এই সমস্যাটা নতুন নয়। আশির দশকে সি’মোর পেপার্ট নামে এমআইটির এক অধ্যাপক বলেছিলেন, মানুষ সবচেয়ে ভালো শেখে নিজে কিছু বানিয়ে। শুধু পড়া বা শোনা নয়, হাতেকলমে কিছু গড়েই জ্ঞান বাড়ে। তিনি শিশুদের জন্য লোগো নামে একটা প্রোগ্রামিং ভাষা বানিয়েছিলেন। সেখানে একটা কচ্ছপকে কমান্ড দিয়ে ছবি আঁকা যেত। কচ্ছপ, পঞ্চাশ পা সামনে হাঁটো, বাঁ দিকে ঘোরো। দারুণ একটা ব্যাপার—প্রযুক্তিকে মানুষের হাতের মুঠোয় আনা, মানুষকে প্রযুক্তির দাসে পরিণত করা নয়। কিন্তু এখনকার প্রোগ্রামিং শিক্ষা অন্য পথে হাঁটে। বাজারের চাহিদা, শিল্পের প্রয়োজন, এইসবের অজুহাতে শিক্ষাব্যবস্থা সেই পুরনো নিয়ম-কানুনের বেড়াজালে আটকে গেছে।
এই তো ২০২৩ সালে হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউয়ের একটা গবেষণায় দেখা গেছে, প্রোগ্রামিং শেখার প্রথম তিন মাসে প্রায় ৬৫% স্টুডেন্ট টিউটোরিয়াল হেল-এ আটকে যায়। মানে, তারা শুধু টিউটোরিয়াল দেখে আর কোড মুখস্থ করে, কিন্তু নিজে থেকে কিছু বানানোর ক্ষমতা পায় না। তারা কোড টাইপিস্ট হয়ে যায়, প্রোগ্রামার আর হতে পারে না। ইউটিউবে একের পর এক ভিডিও, ইউডেমি-তে কোর্স—নোটবুক ভরে যায়, কিন্তু যেই নিজে কিছু বানাতে যায়, দেখে সামনে বিশাল এক শূন্যতা। টিউটোরিয়ালের কোড লেখা আর নিজের সমস্যার সমাধান করা—দুটো আলাদা জিনিস। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা গুলিয়ে ফেলে।
টাইপিং আর সৃষ্টি এক নয়। একজন ক্যালিগ্রাফার সুন্দর অক্ষর লিখতে পারেন, কিন্তু তিনি তো আর কবি নন। একজন রাঁধুনি রেসিপি দেখে দারুণ রান্না করতে পারেন, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তিনি নতুন কোনও পদ আবিষ্কার করতে পারবেন। তেমনই, একজন প্রোগ্রামার যদি শুধু সিনট্যাক্স মেনেই কোড লেখেন, তাহলে তিনি সমস্যার সমাধান করতে পারবেন না। সিনট্যাক্স হল একটা হাতিয়ার, আসল উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় হাতিয়ারটাই আসল হয়ে দাঁড়ায়।
এমআইটির গবেষক শেরি টারকেল ১৯৯৫ সালে লাইফ অন দ্য স্ক্রিন বইতে একটা কথা বলেছিলেন—ডিজিটাল যুগে মানুষ প্রায়ই নিয়মের দাসে পরিণত হয়, নিয়মের মালিক নয়। প্রোগ্রামিংয়ের জটিল সিনট্যাক্সগুলো মানুষকে সেই দশা দেয়। নিয়ম মানলেই যেন সব হল, নিয়ম ভেঙে নতুন কিছু করার সাহসটাই হারিয়ে যায়। যে মানুষটা একদিন পৃথিবী বদলে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে কম্পিউটারের সামনে বসেছিলেন, কয়েক মাস পর তিনি শুধু ভাবেন—লুপটা ঠিক হল তো? ব্র্যাকেটটা বন্ধ করলাম তো?
এর একটা সামাজিক দিকও আছে। বাংলাদেশ, ভারত, আফ্রিকার কত ছেলে-মেয়ে প্রযুক্তি দিয়ে সমাজের নানান সমস্যার সমাধান করতে চায়। কৃষির সমস্যা, স্বাস্থ্য পরিষেবার অভাব, শিক্ষার দৈন্য—কত কী তাদের মাথায় ঘুরছে। কিন্তু প্রোগ্রামিংয়ের এই বাঁধা-ধরা নিয়ম তাদের আটকে দিচ্ছে। একটা মহাদেশের স্বপ্ন একটা সেমিকোলনের কাছে হেরে যাচ্ছে। এই ক্ষতির হিসেব কোনও জিডিপি-তে ধরা পড়ে না।
তবে, বদল আসছে। স্ক্র্যাচ, ব্লকলি, এমআইটি অ্যাপ ইনভেন্টর—এই প্ল্যাটফর্মগুলো সেমিকোলনকে ব্লকে বদলে দিয়েছে। ড্র্যাগ অ্যান্ড ড্রপ করেই কোড লেখা যাচ্ছে। বাচ্চারা গেম বানাচ্ছে, অ্যানিমেশন করছে—কোনও ভয় নেই। তারা প্রোগ্রামিং শিখছে না, তারা সমস্যা সমাধান করতে শিখছে, নতুন কিছু তৈরি করার আনন্দ পাচ্ছে। আর এখন তো এআই এসে গেছে, শুধু মুখে বললেই কোড তৈরি। সেই পিয়ানোবাদক হয়তো এখন সুরটা সরাসরি বাজাতে পারবেন, নিয়ম না শিখেও।
তবুও একটা প্রশ্ন থেকেই যায়—যদি কেউ কখনও সিনট্যাক্সের সঙ্গে লড়তেই না হয়, যদি সব বাধা এআই সরিয়ে দেয়, তাহলে কি সে সত্যিকারের কিছু বানাতে পারবে? নাকি সে শুধু একজন ভালো টাইপিস্ট হয়েই থেকে যাবে—যে এআই-কে হুকুম করে, কিন্তু নিজে কিছু করে না? নতুন কিছু তৈরি করতে গেলে একটু তো ঝামেলা পোহাতে হয়, সেইটুকু বাদ দিলে হয়তো শুধু সুবিধাই থাকে, গভীরতা আর থাকে না।
গল্পটা হারায়নি। শুধু খুঁজে নিতে হবে—কমা-সেমিকোলনের জঙ্গল সরিয়ে, যন্ত্রপাতির বোঝা নামিয়ে, সেই আসল উদ্দেশ্যটার দিকে তাকিয়ে। সেই পিয়ানোবাদকের মাথায় সুরটা আজও আছে—শুধু দরকার এমন একটা পিয়ানো, যেটা বাজাতে শেখার আগে সুর তুলতে দেয়।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0