অন্তরের কদরের ডাক
রমজানের শেষ দশকের এক আধ্যাত্মিক গল্প।এক তরুণ সত্যের সন্ধানে এক দরবেশের কাছে গিয়ে কদরের রাতের গভীর রহস্য ও অন্তরের জাগরণ উপলব্ধি করে।
1.
রমজানের শেষ দশক । গ্রামের আকাশে তখন এক অদ্ভুত নীরবতা । চারিদিকে যেন এক অচেনা প্রশান্তি ছড়িয়ে আছে ।মসজিদের মাইকে তারাবির সুর দূর থেকে ভেসে আসছে ।আনিচ সেই রাতে ঘুমাতে পারছিল না । ছোটবেলা থেকেই সে সূফি সাধকদের বিশ্বাস করতো এবং তাদের ভালোবাসাতো । তার মনে সব সময় একটা বিশ্বাস ছিল -আল্লাহকে শুধু নিয়মের ভেতর নয়, হৃদয়ের ভেতর দিয়েও খুঁজে পাওয়া যায় ।
সে মারিফতের পথের কথা অল্প অল্প জানত । কিন্তু তার মনে একটা প্রশ্ন সব সময় ঘুরপাক খেত -"কেন কদরের রাত এত মহান ? শুধু ইবাদত করলেই কি এর রহস্য ধরা যায় ?"সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই সে গভীর রাতে গ্রামের এক বৃদ্ধ দরবেশের কাছে গেল।লোকটা নদীর ধারের পুরানো বটগাছের নিচে বসে থাকত। গ্রামের মানুষ তাকে "ফকির বাবা" বলেই ডাকত ।আনিচ গিয়ে সালাম করতেই বৃদ্ধ ধীরে হাসলেন।
-"কী খুঁজছো বাবা ?"
আনিচ একটু লজ্জা পেয়ে বলল ,"হুজুর ,সবাই কদরের রাতের কথা বলে । কিন্তু আমি জানতে চাই-এর ভেতরের রহস্যটা কী ?"বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন ।তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন ,-"কদর মানে শুধু তাকদির নয় ।কদর মানে নিজের মূল্য খুঁজে পাওয়া ।"আনিচ বিস্মিত হয়ে শুনছিল । বৃদ্ধ আবার বললেন ,
-"মানুষ যতক্ষণ নিজেকে শুধু মাটির দেহ মনে করে , ততক্ষন সে 'বে -কদর' । কিন্তু যখন তার হৃদয়ের অন্ধকার ঘরে খোদার নূরের এক ঝিলিক পড়ে , তখন সে নিজের আসল মূল্য বুঝতে পারে ।সেই মূহুর্তটাই তার ব্যক্তিগত লাইলাতুল কদর ।"আনিচের মনে হলো যেন বুকের ভেতর কোনো দরজা ধীরে ধীরে খুলছে ।
কিছুক্ষণ নীরব থেকে সে বলল ,
-"হুজুর, একটা কথা বলি ? ছোটবেলা থেকে আমি সূফিদের কথা শুনে বড় হয়েছি ।তারা বলে মানুষকে জোর করে কোনো কিছু করানো ঠিক নয় । কোরআনও তো বলে -ধর্মের ব্যাপারে জবরদস্তি নেই । আবার এটাও বলে -কেউ কারো পাপের বোঝা বহন করবে না।"সে একটু থেমে আবার বলল ,-"তবু অনেক মোল্লা মানুষকে ভয় দেখিয়ে বা চাপ দিয়ে ধর্ম মানাতে চায় । আমি তো মনে করি , মানুষ যদি বুঝে শুনে কিছু করে ,তবেই তো সেটা সত্যিকারের ইবাদত হয় ।"
বৃদ্ধ দরবেশ মৃদু হেসে বললেন,-"তুমি ভুল বলছো না ,বাবা ।শরিয়ত মানুষকে পথ দেখায়, কিন্তু সেই পথের আসল রহস্য বুঝতে হলে হৃদয়ের দরজাও খুলতে হয় । জোর করে চাপিয়ে দিলে ভয় জন্মায় , কিন্তু সত্যিকারের ঈমান জন্মায় ভালোবাসা আর উপলব্ধি থেকে।"
তিনি আবারো বললেন ,-"মানুষের ভেতরে আছে অনেক স্তর ।সাধকেরা একে বলে 'লতিফা' । যখন হৃদয় পরিষ্কার হয়,তখন আকাশের নূর নাজিল শুরু করে -ঠিক যেমন কোরআন নাজিল হয়েছিল আকাশ থেকে।"চারিদিকে তখন রাত আরও গভীর হয়ে উঠেছে । দূরে কোথাও শিয়াল ডাকছে। বৃদ্ধ ধীরে বললেন -
"একসময় মানুষের এমন এক অবস্থা আসে , যখন সে বুঝতে পারে -সে আর আলাদা কিছু নয় ।ঠিক যেমন সমুদ্রের ঢেউ শেষ পর্যন্ত সমুদ্রেই মিশে যায় ।"আনিচ বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করল-
"তাহলে মানুষ কি খোদার সাথে এক হয়ে যায়?"বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন ।"এই কথাটাই মানুষ ভাষায় পুরো বলতে পারে না। তাই যারা সত্যটা ছুঁয়ে ফেলে,তারা চুপ হয়ে যায়।"কিছুক্ষণ নীরবতা । বাতাসে কাশফুল দুলছে । বৃদ্ধ আবার বললেন -
-"সাধকের হৃদয়ে একসময় খুলে যায় একটা 'গোপন কুঠুরি'। সেখানে না আলো আছে ,না অন্ধকার-শুধু এক বিশাল শূন্যতা।"আনিচ কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল -"সেখানে গেলে কী দেখা যায় ?" বৃদ্ধ বললেন-
-"সেখানে একটা আয়না আছে । কিন্তু সেই আয়নায় নিজের মুখ দেখা যায় না ;দেখা যায় পুরো সৃষ্টিজগত ।"আনিচ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল । বৃদ্ধ ধীরে বললেন -
-"কারণ তখন মানুষ বুঝতে পারে -সে নিজেই সেই আয়না ।সে যা খুঁজছিল, তা তার ভেতরেই ছিল ।"আনিচ কিছুক্ষণ নীরব থেকে আবার বলল-
-"হুজুর , একটা কথা বুঝলাম -এই রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। কিন্তু সাধারণ মানুষ তো বলে ,এই রাতে যা চাওয়া হয় তাই পাওয়া যায় ।"বৃদ্ধ দরবেশ মৃদু হেসে বললেন-
-"মানুষের চাওয়া আর খোদার দেওয়া সব সময় এক জিনিস হয় না ,বাবা । অধিকাংশ মানুষ কদরের রাতে দোয়া করে ধন-সম্পদ বা দুনিয়ার সুখের জন্য। কিন্তু যারা সত্যের পথের যাত্রী ,তারা কিছু চায় না -তারা শুধু তাকেই চায় ।"
তিনি একটু থেমে আবার বললেন -
-"কেউ কূপের পানি চায় , কেউ নদী চায় , কেউ সমুদ্র। কিন্তু যখন কেউ সত্যিই সমুদ্রকে পেয়ে যায় ,তখন আর আলাদা করে পানি চাইতে হয় না ।"ঠিক তখনই মসজিদের মিনার থেকে ফজরের আজান ভেসে এলো -"আল্লাহু আকবর..."
বৃদ্ধ চোখ খুললেন। -"দেখো , ফজর মানে শুধু ভোর নয় ।এটা অজ্ঞতার অন্ধকার ভেঙে জ্ঞানের সূর্য ওঠা।"আনিচ আকাশের দিকে তাকাল । পূর্ব দিগন্তে তখন সূর্যের প্রথম আলো উঠেছে ।তার মনে হলো -আজ সে শুধু একটি রাতের রহস্য নয় , নিজের ভেতরের এক গোপন কুঠুরির দরজাও দেখতে পেয়েছে ।আর সেই কুঠুরির গভীর থেকে যেন নিঃশব্দে ভেসে আসছে এক অদ্ভুত ধ্বনি -"আল্লাহু..."যেন মহাসত্যের এক অনন্ত ডাক।
What's Your Reaction?
Like
3
Dislike
0
Love
3
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
3