যদি যন্ত্র অর্থ বুঝতে পারত: লুপ ও লজিকের বাইরে মানুষের গল্প

মানুষ অর্থ বোঝে কেবল সংখ্যার মাধ্যমে নয়; এতে থাকে আবেগ, অভিজ্ঞতা, ইতিহাস ও গল্পের সংমিশ্রণ। একজন বৃদ্ধা বাজারে চাল কিনতে গিয়ে তার জীবন, আশা ও ভয় বোঝে, একজন শিশু সঞ্চয় ভাঙার আনন্দ অনুভব করে, একজন শিক্ষক ছাত্রের বোঝাপড়া ও আবেগকে বিবেচনা করে। ব্যবসায়ী, কৃষক, চিকিৎসক, শিল্পী—প্রতিটি মানুষ তার কাজের মধ্যে মানবিক অর্থ খুঁজে পায়। AI হিসাব, বিশ্লেষণ বা ফলাফল দেখাতে পারলেও মানুষের অন্তর্দৃষ্টি, আবেগ ও গল্প বোঝে না। মানুষের এই মানবিক অর্থবোধ সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে, যন্ত্রের তুলনায় মানুষকে মানুষের মতো করে তোলে।

ফেব্রুয়ারী 25, 2026 - 18:02
ফেব্রুয়ারী 14, 2026 - 18:21
 0  1
যদি যন্ত্র অর্থ বুঝতে পারত: লুপ ও লজিকের বাইরে মানুষের গল্প
মানুষ অর্থ বোঝে কেবল সংখ্যার মাধ্যমে নয়; এতে থাকে আবেগ, অভিজ্ঞতা, ইতিহাস ও গল্পের সংমিশ্রণ। একজন বৃদ্ধা বাজারে চাল কিনতে গিয়ে তার জীবন, আশা ও ভয় বোঝে, একজন শিশু সঞ্চয় ভাঙার আনন্দ অনুভব করে, একজন শিক্ষক ছাত্রের বোঝাপড়া ও আবেগকে বিবেচনা করে। ব্যবসায়ী, কৃষক, চিকিৎসক, শিল্পী—প্রতিটি মানুষ তার কাজের মধ্যে মানবিক অর্থ খুঁজে পায়। AI হিসাব, বিশ্লেষণ বা ফলাফল দেখাতে পারলেও মানুষের অন্তর্দৃষ্টি, আবেগ ও গল্প বোঝে না। মানুষের এই মানবিক অর্থবোধ সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে, যন্ত্রের তুলনায় মানুষকে মানুষের মতো ক

যদি যন্ত্র অর্থ বুঝতে পারত: লুপ ও লজিকের বাইরে মানুষের গল্প
খাদিজা আরুশি আরু

মানুষ প্রতিদিন অর্থ বোঝে, কিন্তু সেই অর্থ কখনোই কেবল সংখ্যার ভেতর বন্দি থাকে না। বাজারের দাম, ব্যাংকের হিসাব বা ডিজিটাল লেনদেন- এসব তার একটি ক্ষুদ্র অংশমাত্র। মানুষের কাছে অর্থ মানে অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, প্রত্যাশা, ভয়, ভালোবাসা এবং ভবিষ্যতের কল্পনা। অর্থ এখানে কেবল গণিত নয়; এটি জীবনের ভাষা। আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই ভাষাকে ভাঙতে পারে সংখ্যায়, কিন্তু এর অর্থ ধরতে পারে না অনুভবে।

সকালের বাজারে একজন মানুষ চালের বস্তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। তার হাতে তালিকা নেই, আছে অভ্যাস। সে জানে কোন দোকানদার ওজন কম দেয় না, কোনটায় চাল একটু পুরনো হলেও দাম সহনীয়। এই সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো অ্যালগরিদম নেই, আছে বহু বছরের অভিজ্ঞতা। অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ বাজারকে যুক্তির ক্ষেত্র বললেও, বাস্তব বাজারে মানুষের সিদ্ধান্ত আবেগ ও অভ্যাসে গড়া- এ কথা আধুনিক বিহেভিয়ারাল ইকোনমিক্স বহুবার প্রমাণ করেছে।

একটি শিশুর সঞ্চয় ভাঙার মুহূর্তে অর্থের সংজ্ঞা বদলে যায়। কয়েনগুলো সেখানে কেবল ধাতু নয়; সেখানে জমে থাকে অপেক্ষা, ত্যাগ আর ছোট ছোট স্বপ্ন। মনোবিজ্ঞানী জঁ পিয়াজে দেখিয়েছেন, শিশুরা অর্থ বোঝে প্রতীকের মাধ্যমে, সংখ্যার মাধ্যমে নয়। এই প্রতীকী অর্থবোধ কোনো যন্ত্রের জন্য ধরাছোঁয়ার বাইরে।

অফিসের ঘরে বসে একজন মানুষ হিসাবের খাতায় তাকিয়ে থাকে। সংখ্যাগুলো ঠিকই আছে, তবু মন ভারী। কারণ এই সংখ্যার ভেতর লুকিয়ে আছে এক বছরের পরিশ্রম, ভুল সিদ্ধান্ত, হারানো সুযোগ। ড্যানিয়েল কাহ্নম্যান ও আমোস টভার্স্কির গবেষণা দেখিয়েছে, মানুষ ক্ষতির অনুভূতিকে লাভের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। এই মানসিক ওজন কোনো সফটওয়্যারের কলামে ধরা পড়ে না।

একজন কৃষক আকাশের দিকে তাকিয়ে ফসলের হিসাব করে। সে জানে কোন মেঘ বৃষ্টি আনে, কোন বাতাস ঝড়ের ইঙ্গিত দেয়। আবহাওয়ার ডেটা বিশ্লেষণ করতে যন্ত্র পারে, কিন্তু মাঠের গন্ধ, মাটির রং, আগের বছরের স্মৃতি মিলিয়ে যে সিদ্ধান্ত তৈরি হয়, সেটি মানবিক। ইতিহাস বলে, কৃষিভিত্তিক সভ্যতা গড়ে উঠেছে এই অন্তর্দৃষ্টির উপর, ক্যালকুলেশনের উপর নয়।

হাসপাতালের করিডরে একজন চিকিৎসক রিপোর্ট হাতে দাঁড়িয়ে থাকে। রিপোর্টে সংখ্যা আছে, কিন্তু চোখ যায় রোগীর মুখে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণা বলে, রোগ নিরাময়ে রোগীর মানসিক অবস্থা বড় ভূমিকা রাখে। প্লাসিবো এফেক্ট তার প্রমাণ। যন্ত্র রোগ শনাক্ত করতে পারে, কিন্তু আশার ভাষা জানে না।

শ্রেণিকক্ষে একজন শিক্ষক খাতার বাইরে তাকিয়ে থাকে। নম্বরের পাশে সে দেখে চোখের ক্লান্তি, আগ্রহের ঘাটতি, সম্ভাবনার ইঙ্গিত। শিক্ষাবিদ জন ডিউই বলেছিলেন, শিক্ষা কেবল তথ্য নয়, অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতাভিত্তিক মূল্যায়ন কোনো অটোমেটেড সিস্টেম পুরোপুরি ধরতে পারে না।

একজন প্রকৌশলী প্রকল্পের বাজেট দেখার সময় কেবল ব্যয় নয়, দায়িত্বও দেখে। একটি সেতু মানে শুধু কংক্রিট নয়; মানুষের যাতায়াত, শহরের ভবিষ্যৎ, পরিবেশের ভারসাম্য। টেকসই উন্নয়ন ধারণা এসেছে এই মানবিক বিশ্লেষণ থেকেই, কাঁচা হিসাব থেকে নয়।

নির্বাচনের মৌসুমে একজন সাংবাদিক সংখ্যার বাইরে তাকিয়ে থাকে। ভোটের শতাংশের আড়ালে সে শোনে মানুষের কথা, ক্ষোভ, আশা। ইতিহাস দেখিয়েছে, বড় সামাজিক পরিবর্তন কখনোই কেবল পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝা যায় না; ফরাসি বিপ্লব হোক বা ভাষা আন্দোলন, আবেগ ছিল চালিকাশক্তি।

ডিজিটাল যুগে একজন উদ্যোক্তা অনলাইন মন্তব্য পড়ে। সেখানে শুধু রিচ বা এনগেজমেন্ট নয়, সে খোঁজে বিশ্বাস। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার দেখিয়েছেন, বিশ্বাস সামাজিক আচরণের মূল চালক। এই বিশ্বাস কোনো মেশিন স্কোরে পুরোপুরি ধরা পড়ে না।

একজন বাবা সন্তানের সাফল্য দেখার সময় লাভ-ক্ষতির হিসাব করে না। সেখানে অর্থ মানে গর্ব, নিরাপত্তা, ভবিষ্যৎ। পারিবারিক অর্থনীতিতে এই আবেগই সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে- যা বহু সমাজবিজ্ঞানী নথিভুক্ত করেছেন।

এক শিল্পী শহরের দৃশ্য দেখে ক্যানভাসে তোলে। সেখানে আলো, ছায়া, মানুষের ভঙ্গি মিলিয়ে অর্থ তৈরি হয়। নৃতত্ত্ব বলছে, শিল্প মানব অভিজ্ঞতার দলিল। যন্ত্র নকল করতে পারে, কিন্তু অভিজ্ঞতা ধারণ করতে পারে না।

বিজ্ঞানী ল্যাবে ডেটা দেখে, কিন্তু প্রশ্ন করে কৌতূহল থেকে। বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির ইতিহাস দেখায়, বড় আবিষ্কার এসেছে প্রশ্ন থেকে, গণনা থেকে নয়।

এক বৃদ্ধ মানুষ গল্প বলে স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখে। মৌখিক ইতিহাস প্রজন্মের পর প্রজন্ম জ্ঞান বহন করেছে। যন্ত্র তথ্য সংরক্ষণ করে, মানুষ অর্থ সংরক্ষণ করে।

মানুষের অর্থবোধ তাই লুপ ও লজিকের বাইরে। শব্দ, স্মৃতি ও অনুভূতির এই জটিল মিশ্রণই সভ্যতার চালিকাশক্তি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিখুঁত হতে পারে, কিন্তু মানবিক অর্থবোধহীন। এই সীমারেখাই মানুষকে যন্ত্র থেকে আলাদা করে, এবং ভবিষ্যতেও করবে।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0
Khadiza Arushi Aru সখের বশে লেখালেখি শুরু করলেও বর্তমানে তা আর সখ নেই, নেশা হয়ে গেছে। নিজের অনুভূতি, চিন্তাধারা, অভিজ্ঞতাকে অন্যের দ্বারপ্রান্তে সুকৌশলে পৌঁছে দেয়াই হয়তো আমার লিখে যাবার অনুপ্রেরণা! আমার প্রথম সম্পাদিত বই, "নবধারা জল" এবং প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস, "সূর্যপ্রভা"