মানুষ গল্পে ভাবে, যন্ত্র চলে শর্তে : দুই মেরুর চিরন্তন ফারাক
মানব মস্তিষ্ক ও ভাষার সংযোগ মানুষের আবেগ, চিন্তা ও সৃষ্টিশীলতার মূল। মানুষ গল্পের মাধ্যমে শেখে, অনুভব করে, অন্যের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে এবং সমাজকে গড়ে তোলে। AI বা যন্ত্র কেবল তথ্য বা শর্ত পূরণ করতে পারে, কিন্তু মানুষের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি এবং গল্পকে অনুভব করতে পারে না। প্রতিদিনের জীবন- from শিশুর খেলা থেকে শিক্ষকের ক্লাস, কৃষকের মাঠ থেকে ব্যবসায়ীর অফিস- প্রতিটি মুহূর্তে মানুষের গল্পের শক্তি ফুটে ওঠে। ভাষা, শব্দ এবং গল্পের এই মানবিক সংযোগই সভ্যতার চাকা সচল রাখে।
মানুষ গল্পে ভাবে, যন্ত্র চলে শর্তে : দুই মেরুর চিরন্তন ফারাক
খাদিজা আরুশি আরু
মানুষ ভাবে গল্পে, আর যন্ত্র চলে শর্তে। এই ভিন্নতার শুরু হয় প্রতিদিনের সকাল থেকে। কেউ যখন ঘুম থেকে জেগে ওঠে, তার প্রথম কাজ- একটি ভাবকে শব্দে রূপ দেওয়া। হয়তো নিজের মনে ভাবছে, হয়তো কারও সঙ্গে কথা বলছে, আবার হয়তো চুপচাপ চোখের ভেতর অনুভূতির ঢেউ জমিয়ে রাখছে।
এই শব্দ আর অনুভবের খেলাকে কোনো কম্পিউটার বোঝে না। একটি AI বা যন্ত্র শুধু প্রোগ্রামের নিয়মে কাজ করে- শর্ত পূরণ করে ফলাফল দেয়। কিন্তু মানুষ তার চারপাশের অনিশ্চয়তা, আবেগ, ভুল, বিশ্বাস আর গল্পের মধ্য দিয়ে নিজেকে গড়ে তোলে।
গবেষকরা বলেন, আজ থেকে প্রায় সত্তর হাজার বছর আগে আফ্রিকার একদল হোমো স্যাপিয়েন্স প্রথম উচ্চারণ করেছিল শব্দ। সেই শব্দ ছিল না কেবল চাহিদার প্রকাশ; ছিল সংযোগ, বিশ্বাস আর বোঝাপড়ার হাতিয়ার। আহত সঙ্গীকে সেবা দেওয়ার পাশাপাশি তার ভয়-আশার গল্পও ওই শব্দে ধরা পড়ত। নিউরোসায়েন্টিস্ট স্টিভেন পিঙ্কার দেখিয়েছেন, ভাষা শুধুই তথ্যের মাধ্যম নয়, এটি মানুষের মস্তিষ্কে আবেগ ও সমাজ গড়ে তোলার উপকরণ।
একটি শিশু যখন বাগানে দৌড়ায়, সে শুধু খেলছে না- নিজের গল্প বানিয়ে নিচ্ছে। পাথর, গাছ, বৃষ্টির শব্দ- সব মিলেই তার কল্পনা জেগে ওঠে। যখন শিশু জিজ্ঞেস করে, “এটা কেন হয়?”, তখন তার মস্তিষ্কের চিন্তার কেন্দ্র সক্রিয় হয়- যেখানে জন্ম নেয় যুক্তি, প্রশ্ন আর নতুন গল্প। এই অদৃশ্য সৃষ্টিশীল প্রক্রিয়ায় এখনো পৌঁছাতে পারেনি কোনো AI।
একজন শিক্ষক ক্লাসে কেবল তথ্যই জানান না, গল্প বলেন। ছাত্ররা শুনে কল্পনা করে, আবেগ অনুভব করে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা বলছে, গল্পের মাধ্যমে শেখার সময় শিশুদের মস্তিষ্কের যে অংশ স্মৃতি আর অনুভূতিতে কাজ করে, সেটিও সক্রিয় হয়। ফলে শেখাটা হয় গভীর ও স্থায়ী। AI যতই তথ্য দিক, গল্পের এই অনুভূতি পৌঁছে দিতে পারে না।
এক বৃদ্ধা হাসপাতালের করিডরে দাঁড়িয়ে ছেলের সঙ্গে কথা বলছেন। তাঁর প্রতিটি বাক্যে আছে ভয়, আশা আর মমতা। ডাক্তার এই গল্পের ছায়ায় বুঝে ফেলেন রোগীর বাস্তব অবস্থা। এই মানবিক সংযোগই চিকিৎসা ও সহানুভূতির মূল সেতু।
এক শিল্পী গভীর রাতে ক্যানভাসে রঙ ছুঁড়ে দেন। প্রতিটি রঙে মিশে থাকে গল্প- হয়তো ভালোবাসা, হয়তো হাহাকার। পাশে থাকা কেউ সেই ছবিতে নিজের অনুভূতি খুঁজে পায়। AI হয়তো নিখুঁত ছবি আঁকতে পারে, কিন্তু রঙের ভেতরের কণ্ঠস্বর শুনতে জানে না।
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে এক যুবক দেখে ফেলে এক শিশুর কান্না, এক বৃদ্ধের আত্মবিশ্বাস। এই সামান্য দৃশ্যগুলো তাকে গল্প বলে। সে অন্যের জীবনের মধ্যে নিজের ছায়া খুঁজে পায়। এই অভিজ্ঞতাই তাকে ‘মানুষ’ করে তোলে।
প্রাচীনকালের লিপি ছিল শুধু হিসাব রাখার জন্য নয়- ছিল সভ্যতার গল্প রাখার মাধ্যম। মেসোপটেমিয়ার মাটির ফলকে যেমন জন্ম নিয়েছিল ভালোবাসা, যুদ্ধ আর বিশ্বাসের ইতিহাস। হোমারের “ইলিয়াড” কেবল যুদ্ধের বিবরণ নয়; সেখানে একসঙ্গে বেঁধে রয়েছে সাহস, ভয়, প্রেম আর আশা। কোনো যন্ত্র সেই অনুভব বুঝবে না, অনুভব করতে পারবে না।
ভোরের আলোয় একটি কৃষক কাজ শুরু করে। সে ফসলের পাশে গন্ধ, বাতাস, পাখির ডাক- সব মিলিয়ে বুঝে নেয় পৃথিবীর মেজাজ। এই ছোট ছোট অভিজ্ঞতায় তৈরি হয় তার সিদ্ধান্ত। AI ফলাফল বিশ্লেষণ করতে পারে, কিন্তু সেই মাটির গন্ধ অনুভব করতে পারে না।
এক ব্যবসায়ী অফিসে বসে শুধু লাভ-ক্ষতি হিসাব করেন না। তিনি দলের মনোভাব, বাজারের অনিশ্চয়তা, মানুষের অনুভূতি একসঙ্গে মেলান। সেই সমন্বয় কেবল গণনা নয়, মানবিক বোধের ফল।
এক শিক্ষার্থী রাতে আলো জ্বেলে বই পড়ে। সে শুধু তথ্য শিখছে না, গল্পের মধ্যে প্রবেশ করছে- চরিত্রের সঙ্গে আনন্দ পাচ্ছে, কাঁদছে, প্রশ্ন করছে। তার মস্তিষ্কের প্রতিটি স্নায়ু তখন ভাবছে, অনুভব করছে, সৃষ্টি করছে। AI এই অনুভবের ধারেও নেই।
শিশুদের শেখানোর সময় এক নারী ডাক্তার গল্প বলেন। গল্পের ভেতর দিয়ে শিশু শেখে, হাসে, মনোযোগী হয়। সেই শিক্ষণ হয় স্থায়ী, কারণ তাতে থাকে আবেগের যোগফল।
এক সৈনিক শুধু আদেশ মানে না- সহযোদ্ধার ভয়, আশা, সাহস অনুভব করে। সেই অভিজ্ঞতাই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে গল্প হয়ে বেঁচে থাকে। যন্ত্র হয়তো যুদ্ধের ফলাফল বিশ্লেষণ করবে, কিন্তু সৈনিকের ভেতরের কণ্ঠ শুনবে না।
এক সন্ধ্যায় দাদী উঠোনে বসে নাতি-নাতনিদের গল্প শোনান। প্রতিটি গল্পে তিনি জড়ান হাসি, সতর্কতা আর জীবনের শিক্ষা। শিশুরা শুধু শুনে না- গল্পের ভেতর দিয়ে বাঁচে। AI পারে না সেই উষ্ণ মানবিক স্পর্শ দিতে।
এক সাংবাদিক সমাজের গল্প সংগ্রহ করেন- আনন্দ, সংগ্রাম, ক্ষতি, আশা। পাঠক তাঁর ভাষায় নিজের গল্পের ছায়া খুঁজে পায়। AI সংবাদ লিখতে পারে, কিন্তু সংবেদনশীলতা ছুঁতে পারে না।
এক বৃদ্ধ কবি সন্ধ্যায় স্মৃতির পাশে বসে থাকে। সারাদিনের গল্পগুলো মনে ঘোরে- ভালোবাসা, হারানো সময়, অতৃপ্ত কোনো স্বপ্ন। সেই অনুভবই রূপ নেয় কবিতায়, যা অন্যের হৃদয়ে আঘাত করে। AI শব্দ সাজাতে পারে, কিন্তু কবির মর্ম বোঝে না।
মানুষ রাস্তায়, আকাশের নিচে, ভিড়ের মধ্যে অন্যের চোখের গল্প পড়ে। এই দেখা, বোঝা, ভালোবাসা- এই পথেই সে মানুষ হয়।
প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, মানুষের গল্প থাকবে চিরকাল। কারণ শব্দ, অনুভূতি আর সংযোগ- এই তিনেই মানুষ টিকে থাকে।
AI ভাবতে পারে, কিন্তু মানুষ অনুভব করে।
AI ফল দেয়, মানুষ গল্প জন্মায়।
আর সেই গল্পই ঘোরাতে থাকে সভ্যতার চাকা।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0