ম্যাজিস্ট্রেটের মা

মার্চ 17, 2026 - 12:23
 0  3
ম্যাজিস্ট্রেটের মা

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি‌ । গ্রামের পথঘাট কুয়াশায় ঢাকা । দূরে বাঁশঝাড়ের ফাঁক দিয়ে মোরগ ডাকার শব্দ ভেসে আসছে । ঘরের টিনের ছাদের ওপর ফোঁটা ফোঁটা শিশির জমেছে । মাঝেমধ্যে ঘুঘু পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে । রহিমা বেগম উঠোনে বসে চুলায় আগুন ধরাচ্ছিলেন । আগুনের লালচে আলো তার মুখে পড়ে যেন জীবনের ক্লান্তির গল্প বলছিল । ঘরের ভেতরে তার ছেলে রাকিব ঘুমিয়ে আছে।আজ তার চাকরির পরীক্ষার দিন ।

রহিমা বেগমের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক দুশ্চিন্তা কাজ করছিল ।ছেলেটা যদি ভালো একটা চাকরি পায় !যদি একদিন বড় মানুষ হতে পারে !এই স্বপ্নটাই তো তাকে এত বছর ধরে বাঁচিয়ে রেখেছে । চুলায় ভাত বসিয়ে তিনি ঘরের দিকে তাকালেন । রাকিবকে দেখলে তার নিজের জীবনের সব কষ্ট যেন ভুলে যায় । রাকিব যখন ছোট ছিল , তখন‌ই তার বাবা মারা যায় । সংসারের সব দায়িত্ব এসে পড়ে রহিমা বেগমের কাঁধে।

তিনি ইটভাটায় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে ছেলেকে পড়াশোনা করিয়েছেন ।ছেলেটা পড়াশোনায় খুব মেধাবী হলেও তাকে সবসময় পুষ্টিকর খাবার খাওয়াতে পারতেন না । অনেক সময় নিজের মাথায় দেওয়ার জন্য সামান্য নারিকেল তেল‌ও জোটেনি । তবুও রহিমা বেগম কখনো নিজের জন্য বা ছেলের জন্য কারো কাছে সাহায্যের জন্য হাত বাড়াননি । কিন্তু ছেলের থালা কখনো খালি রাখেননি । হঠাৎ ঘরের ভেতরে নড়াচড়ার শব্দ হলো । রাকিব উঠে বসেছে ।

-"মা , সকাল হয়ে গেছে ?" -আধো ঘুমের চোখে জিজ্ঞেস করল সে । রহিমা বেগম মৃদু হেসে বললেন ,-"হ্যাঁ বাবা ।তোর তো আজ চাকরির পরীক্ষা । তাড়াতাড়ি হাত -মুখ ধুয়ে আয় ।"রাকিব উঠোনে এসে মুখ ধুতে লাগল ।কুয়াশাভেজা সকালে তার মনে অদ্ভুত এক অনুভূতি হলো ।আজ যেন জীবনের একটা বড় পথের শুরু । খেতে বসে সে দেখল তার থালায় ডিম ভাজি আর গরম ভাত ।সে অবাক হয়ে বলল ,-"মা তুমি খাবে না ?"

রহিমা বেগম একটু হেসে বললেন ,-" আমি পরে খাব ।আগে তুই একটু খেয়ে নে।"রাকিব জানে এই 'পরে 'খাব কথাটার মানে কী ।সংসারে সব সময় কিছু থাকে না ।মা নিজের অংশটা লুকিয়ে তার থালায় তুলে দেন ।তার বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল । খাওয়া শেষ করে ব্যাগ কাঁধে নিল রাকিব । বের হ‌ওয়ার আগে রহিমা বেগম দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন ।তার চোখে এক নীরব প্রার্থনা ।

-"বাবা ," ধীরে বললেন , ভালো করে পরীক্ষা দিস । আল্লাহ তোর মঙ্গল করুক ।"রাকিব মায়ের পায়ে হাত রাখল । তার মনে হলো, এই পায়ের ধুলোর ভেতরেই তার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি লুকিয়ে আছে । রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে একবার পিছন ফিরে তাকাল । দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মা এখনো তাকিয়ে আছেন ।তার মনে পড়ে গেল ছোটবেলার অনেক কথা-ঝড়ের রাতে মায়ের বুকের কাছে ঘুমানো , স্কুলে যাওয়ার আগে মায়ের হাতের ভাত , পরীক্ষার আগের রাতে মায়ের নীরব দোয়া ।

আজ সে বুঝতে পারছে , একজন মায়ের ভালোবাসা কত নিঃশব্দ আর গভীর । দিনটা কেটে গেল । পরীক্ষা দিয়ে বিকেলে বাড়ি ফিরল রাকিব । দরজার সামনে রহিমা বেগম বসে আছেন ।তার চোখে সারাদিনের অপেক্ষার ক্লান্তি । রাকিবকে দেখেই তিনি উঠে দাঁড়ালেন ।-"কেমন হয়েছে পরীক্ষা?" রাকিব একটু হাসল ।-"ভালো হয়েছে মা।"রহিমা বেগমের মুখে যেন হঠাৎই আলো ফুটে উঠল ।তার চোখে পানি চলে এলো , কিন্তু তিনি তা লুকিয়ে ফেললেন ।

রাতে খেতে বসে রাকিব হঠাৎ বলল ,-"মা , একদিন আমি বড় মানুষ হবো।" রহিমা বেগম অবাক হয়ে তাকালেন।-"কেন?"রাকিব ধীরে বলল ,-"যেন তোমাকে আর কোনদিন কষ্ট করতে না হয় ।"রহিমা বেগম কিছু বললেন না । শুধু ছেলের মাথায় হাত রেখে চুপ করে বসে র‌ইলেন । বাইরে তখন রাত নেমেছে । দূরে ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে । ছোট্ট সেই ঘরের ভেতরে এক মা আর এক ছেলের নীরব ভালোবাসা যেন পৃথিবীর সব আলোকে হার মানাচ্ছিল । কয়েকদিন পরে এক দুপুরে ডাকপিয়ন এসে দরজায় ডাক দিল ।

-"রাকিব ! চিঠি আছে ।"রাকিব খামটা হাতে নিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল । সরকারি সিলমোহর দেওয়া চিঠি ।বুক ধড়ফড় করতে লাগল ।কাঁপা হাতে খামটা খুলল সে।চিঠিটা পড়তে পড়তে "তার চোখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।"সে ধীরে ধীরে খামটা ছিঁড়ে কাগজটা বের করল । কয়েক সেকেন্ডের জন্য তার চোখ শব্দগুলো চিনতেই পারল না । এরপর যখন লাইনটা স্পষ্ট হলো ,তার নিঃশ্বাস যেন আটকে গেল । সেখানে লেখা -ম্যাজিস্ট্রেট পদে নির্বাচিত হয়েছে ।

মুহূর্তের মধ্যে তার মনে যেন ঝড় বয়ে গেল । এতদিনের স্বপ্ন,এত বছরের -কষ্ট সবকিছুর ফল আজ তার হাতে এসে ধরা দিয়েছে ।সে ছুটে ঘরের ভেতরে গেল ।-"মা, আমি ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছি !"রহিমা বেগম প্রথমে কিছু বুঝতে পারলেন না । তারপর যখন কথাটা তার কানে পুরোপুরি পৌঁছাল ,তার চোখ ভিজে উঠল ।সে ছেলের মুখে হাত বুলিয়ে বললেন -

"-আল্লাহ আমার দোয়া কবুল করেছে ,বাবা!" কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস ! রাকিব ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার কয়েকদিন পর থেকেই রহিমা বেগমের শরীর দূর্বল হয়ে পড়তে লাগল‌ । প্রথমে হালকা জ্বর , শরীর -ব্যথা এসব দেখে তিনি গুরুত্ব দিলেন না। রাকিব বলল ,-"মা তোমার শরীরটা কি খারাপ লাগছে?"রহিমা বেগম হেসে বললেন ,-"কিছু না বাবা , একটু ক্লান্তি । এতদিন কাজ করেছি তো।"

কিন্তু দুইদিন পর জ্বরটা বাড়তে লাগল ।শরীরে ছোট ছোট ফুসকুড়ি উঠল ।গা খুব ব্যথা করছিল । রাকিব ভয় পেয়ে গেল।সে তাড়াতাড়ি একজন ডাক্তার নিয়ে এল। ডাক্তার তাকে দেখে বললেন,-"চিন্তার কিছু নেই । চিকেন পক্স হয়েছে । বিশ্রাম আর ঔষধ লাগবে ।" রাকিব মায়ের পাশে বসে সারাক্ষণ খেয়াল রাখতে লাগল ।নিজ হাতে ঔষধ খাইয়ে দিত ,পানি এনে দিত, মাথায় ভেজা কাপড় রাত । রহিমা বেগম মাঝে মাঝে ছেলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসতেন । মনে মনে ভাবতেন -এই ছেলেটার জন্য‌ই তো এত বছর লড়াই করেছেন তিনি ।

কয়েকদিন কেটে গেল ।সেই বিকেলে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। তিনি ঘুমের ভেতর অদ্ভুত এক স্বপ্ন দেখলেন । তিনি দেখলেন,বহু বছর আগে মারা যাওয়া তার স্বামী হাট থেকে ফিরছে।হাতে একটা সাদা শাড়ি আর ছোট্ট একটা আতরের শিশি ।হেসে বলছে -

-"রহিমা, তোমার জন্য নিয়ে এলাম ।"স্বপ্নটা দেখে রহিমা বেগমের বুকের ভেতর কেমন যেন হাহাকার করে উঠল ।তার মনে হলো -সময় বুঝি ফুরিয়ে এসেছে। ধীরে ধীরে উঠে তিনি তার পুরানো ট্রাঙ্কটা খুললেন ।ভেতর থেকে কিছু টাকা বের করলেন। তারপর আস্তে আস্তে খাটে গিয়ে শুয়ে পড়লেন।-"মা ! তোমার কি হয়েছে ?"রহিমা  বেগম কাঁপা হাতে সেই টাকাগুলো রাকিবের দিকে বাড়িয়ে দিলেন ।-"বাবা ...এই নে টাকা ..."

রাকিবের চোখ ভিজে উঠল ।সে মায়ের হাত শক্ত করে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,-"মা , আমাকে একা ফেলে যেও না...আমি তো সবকিছু তোমার জন্য‌ই করতে চেয়েছিলাম..."রহিমা বেগম কিছু বললেন না । শুধু শেষবারের মতো ছেলের মুখের দিকে তাকালেন ।তার চোখে তখন অদ্ভুত এক শান্তি। মনে হচ্ছিল -এই পৃথিবীর সব দায়িত্ব তিনি শেষ করে ফেলেছেন ।

ধীরে ধীরে তার ঠোঁটে একফোঁটা মৃদু হাসি ফুটে উঠল । তারপর তার হাত আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে গেল। ঘরের ভেতর হঠাৎ এক গভীর নীরবতা নেমে এলো ।তার চোখে তখন শান্তির এক অদ্ভুত আলো । বাইরে তখন সন্ধ্যা নেমেছে ।আকাশে ধীরে ধীরে তারা ফুটেছে ।আর ছোট্ট সেই ঘরের ভেতরে, একজন মায়ের নিঃশব্দ ভালোবাসা চিরদিনের মতো আকাশের দিকে উড়ে গেল । রাকিব মায়ের হাত ধরে বসে র‌ইল ।তার চোখের জল থামছিল না ।

রাকিব চিৎকার করে বলছিল ,-"আমি তোমার এমন‌ই হতভাগা ছেলে... তোমাকে কখনো সুখ দিতে পারলাম না। তোমার জন্য বড় চাকরি পেলাম । কিন্তু চাকরির টাকায় তোমার জন্য কিছু আনতে পারলাম না মা ..."

বাইরে দূরের মসজিদ থেকে মাগরিবের আজানের ধ্বনি ভেসে আসছিল। রাকিবের মনে হচ্ছিল,পৃথিবীটা হঠাৎ শূন্য হয়ে গেছে।যে মানুষটা সারাজীবন তাকে আগলে রেখেছিল, নিজের সুখ-দুঃখ বিসর্জন দিয়ে তাকে মানুষ করেছে -আজ সে নেই। পরদিন গ্রামের মানুষজন এসে রহিমা বেগমের জানাযা সম্পন্ন করল। রাকিব নিজ হাতে মায়ের কাফনের কাপড় কিনল -সেই টাকাতেই ,যেটা মা তার হাতে তুলে দিয়েছিলেন।জানাজার নামাজের সময় তার চোখ দিয়ে শুধু পানি ঝরছিল । তারমনে হচ্ছিল, এই পৃথিবীতে সে যেন একাবারে একা হয়ে গেছে ।

কয়েকদিন পরে রাকিব চাকরিতে যোগ দিতে শহরে চলে গেল। কিন্তু যাওয়ার আগে সে মায়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে র‌ইল । তারপর ধীরে ধীরে বলল,-"মা, তুমি দেখো...আমি মানুষের জন্য কাজ করব। তোমার কষ্ট যেন কোনো মায়ের জীবনে না আসে।"হালকা বাতাসে কবরের পাশের কাশফুলগুলো দুলে উঠল। রাকিবের মনে হলো-মা যেন দূর থেকে তাকে দোয়া করে দিচ্ছে।

সময় কেটে গেল। রাকিব একজন সৎ ও ন্যায়পরায়ণ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে মানুষের ভালোবাসা অর্জন করল। কিন্তু জীবনের সব অর্জনের মাঝেও তার মনে একটাই আক্ষেপ রয়ে গেল -যে মানুষটার জন্য সে সব করতে চেয়েছিল,সে মানুষটা তার সাফল্য দেখার আগেই চলে গেছে। রাতের গভীরে কখনো কখনো সে আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে -

-"মা, আমি আজও তোমার দোয়ার ওপরই বেঁচে আছি..."আর আকাশের অসংখ্য তারার মাঝে যেন এক নীরব মায়ের ভালোবাসা চিরকাল জ্বলতে থাকে।

What's Your Reaction?

Like Like 3
Dislike Dislike 0
Love Love 3
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 3
@zerin609 Zerin Jahan Disha Disha